এমন আনন্দবিধুর সময়ে হঠাত এক ”এমন মধুর সন্ধ্যায়”, বস ডেকে বললেন, ‘কি হে, শুধু মেট্রো শহরগুলোতে ট্যুরে গেলেই হবে? একটু অন্য জায়গাটায়গাগুলোও দেখতে হবে তো বাবা। পরশু ম্যাঙ্গালোর যাও তো একটু, মার্কেটটাও দেখে এসো, একটা স্যাম্পল ডিস্ট্রিবিউটর সার্ভেও করে এসো। এই নিয়ে কাজ আছে তারপর’।
শাস্ত্রে স্পষ্ট লেখা আছে যে ”বসহি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতাঃ”। অতএব দুদিন বাদে ম্যাঙ্গালোর এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সি ধরে ডেরাডাণ্ডা বাঁধলুম যে হোটেলে, তার নাম পার্বতী রেসিডেন্সি। সাধারণ ছিমছাম হোটেল। জায়গাটার নাম ছিল উরওয়া।
সারাদিন ধরে মার্কেট ভিজিট চলল। বিকেলে দু চারটে ডিস্ট্রিবিউটরদের সংগে দেখা করে, ভারী গলায় নানাবিধ সদুপদেশ দিয়ে, সন্ধেবেলা জমিয়ে বসলাম এরিয়া ম্যানেজারটির সংগে। সে ভারি চৌখস ছেলে। মার্কেট থেকে হোটেল ঢুকেই বলল ”স্যার, কেয়া লাউঁ আপকে লিয়ে? ব্লেন্ডার্স চলেগা?”। বলা বাহুল্য, এরপর খুশি না হয়ে আর পারা যায় না!
সেদিন কিছু হুইস্কি টেনেছিলুম বটে, এখনো স্পষ্ট মনে আছে। দুজনে মিলে একটা ফুল বটল শেষ করা চাট্টিখানি কথা নয়। খাওয়া হচ্ছিল আমার রুমে বসেই।
এইখানে আমার রুমটার বর্ণনা দেওয়াটা একটু জরুরী। রুমটা ছিল জ্র শেপের। এল এর ছোট হাতটার মাথায় দরজা, সাইডে টয়লেটের দরজা। অন্য বড় হাতটার দিকে খাটপালং, ড্রেসিংটেবিল ইত্যাদি।
আমরা আড্ডা মারছিলাম দরজার কাছে। টুংটাং গ্লাসের আওয়াজ, চমৎকার চিকেন পকোড়া, জমাটি আড্ডা, সবমিলিয়ে নেশাটি যখন পূর্ণমাত্রায় মধ্যগগনে, সে ছোকরা বলল, ‘স্যার, লেটস কল ইট আ ডে।’
এই বলে সে টলতে টলতে নিজের রুমের দিকে রওনা দিল। আমিও টলতে টলতে ”গুড নাইট, সুইট ড্রিমস” ইত্যাদি বলে লাইটের সুইচ নিভিয়ে, এসি টা বাড়িয়ে, একটা চাদর টেনে নিয়ে লম্বা হলাম।
সেদিন নেশাটা বেশ গাঢ় হয়েছিল। অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিশেষ কোন সাড় ছিল না। মাথাও ঘুরছিল একটু একটু, যেটা সচরাচর আমার হয় না। মাথাটা আলতো করে বালিশে নামিয়ে রেখে, ধীরে ধীরে নানান কথা ভাবতে ভাবতে তলিয়ে যেতে থাকলাম ….
কটা বাজে খেয়াল ছিল না, কিন্তু তখন বেশ রাত হবে, একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ঘুমটা খানিকটা চটকে গেলো। কি হচ্ছে বুঝতে পারছি না, কিন্তু চেষ্টা করলেও চোখটা পুরোপুরি বোজাতে পারছি না। মানে মনে হচ্ছে ইন্দ্রিয়গুলোর ওপর আমার কোন কন্ট্রোল নেই। নেশাটি কিন্তু তখনো তুঙ্গে।
হঠাত করে শুনি চুড়ির রিনিরিনি শব্দ। কাছেই, ড্রেসিংটেবিল ঘেঁষেই। এখন আমার গিন্নি মাঝেসাঝে রাতবিরেতে উঠলে তেনার হাতের চুড়িতে এই শব্দটা হয়। এক্কেবারে সেই শব্দ। মুহূর্তেকের জন্যে একটা ক্ষণিক নিশ্চিন্ততার ভাব হল, যাগগে, চেনা আওয়াজ।আমি শালা বেকারই ভেবে মরছি। এপাশে কাত হয়ে, কম্বলটাকে টেনে আরেকপ্রস্থ ঘুমোবার উদ্যোগ করছি, ঘুমটা আসি আসি করছে,
এমন সময়, নেশার অঘোরমত্ততার মধ্যেই, কেউ যেন কয়েকটা কথা মাথার পেছনে পেরেকের মতন সজোরে গেঁথে দিল,
বউ এখন কলকাতায়।
আমি ম্যাঙ্গালোরে।
হোটেলে।
একা।
এর পর উঠে বসতেই হয়। শব্দটা নেশার ঘোরেও শুনে থাকতে পারি, সেই সম্ভাবনাই বেশি। তবুও দেখে রাখতে দোষ কি? লাইট জ্বালাতেই চোখটা প্রথমে কুঁচকে গেলো। তারপর দৃষ্টিটা একটু সয়ে এলে বিছানা থেকে নেমে এদিকওদিক দেখলাম। কোত্থাও তেমন কিছু নেই।ভারী পর্দা সরিয়ে দেখলুম, জানলার শার্সি যেমন কে তেমন বন্ধ।
এল এর বাঁকটা ঘুরেও দেখে এলাম। সব কিছু ঠিকই। ঘুমোতে যাবার আগে রুম সার্ভিস ডেকে সমস্ত ভুক্তাবশিষ্ট ফেলে দিতে বলেছিলাম। ফলে পরিষ্কার ঘর। বাথরুম চেক করলাম। একদম ওক্কে। কোথাও কিছু নেই। আবার পেছন ফিরে এল এর বাঁক পেরিয়ে বিছানার কাছে এসে উঠতে যাবো, এমন সময় ড্রেসিংটেবিলে তিনটে জিনিস দেখে আপনা থেকেই থমকে গেলাম।
কিছু জট ছাড়ানো চুল, মেয়েরা চুল আঁচড়ে জট ছাড়ালে যেমন কুন্ডুলিটাইপ একটা গোছ হয়, তেমন,
একটা কালো রঙের চুলের কাঁটা,
আর একটা শুকনো জবাফুল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে সিঁদুর লেগে আছে গায়ে। আরো কিছু একটা লেগে আছে ফুলটার গায়ে, শুকনো কালচে টাইপের। সেটা ভালো করে দেখবো বলে এগিয়েছি,
মেঝের দিকে চোখ গেলো।
একটা মুরগীর পায়ের হাড় পড়ে।
শুকনো।
এটা কোনভাবেই আমাদের চিকেন পকোড়ার হাড় হতে পারে না। এক, আমরা এদিকে একবারও আসিনি,
এবং দুই, হাড়টা যে কাঁচা, সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। এবং তার ওপরেও সিঁদুর লেগে আছে!
স্বাভাবিকভাবেই ভ্রূ কুঁচকে গেলো। এতক্ষণ ধরে রুমে আছি, এসব নোংরা আমার চোখ এড়ায় কি করে? আগে দেখতে পেলে রুম সার্ভিসকে ডেকে পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া যেতো। ঘড়িতে দেখি রাত তিনটে। এখন কি আর কাউকে পাবো? থাক। কাল সকালেই না হয়…
বলতে বলতেই চোখ পড়লো ব্লেন্ডার্সের বোতলটার ওপর। কম করে তিন পেগ তো রয়েই গেছে। আজকে বেশিই হয়ে গেছে সেটা নিজেও বুঝতে পারছি। আর কি খাওয়া উচিৎ হবে? ইত্যাদি দোনোমনা করে ভাবতে ভাবতেই বোতলটা টেনে একটা নীট লার্জ পেগ গলায় চালান করে দিলাম।
দামি হুইস্কি। নিভে আসা নেশাটা তড়াক করে ধরে নিলো। আমেজটা থাকতে থাকতেই লাইট নিভিয়ে,গায়ে ভারী চাদরটা টেনে ফের ঘুমসাধনায় প্রবৃত্ত হলাম।
