কিন্তু আবার কি স্যার? মোবাইল কিনবেন,আরামসে কিনুন না! অ্যামাজন ফ্লিপকার্ট বাদ দিয়েও আরও একশোটা অ্যাপ আছে সস্তায় মোবাইল কিনবার, হেবি ডিসকাউন্ট, বাবুলালের লেড়কার সাধ্যই নেই ওই প্রাইস অফার করে। দুমিনিটের মামলা কাকা, ঘরে বসেই। আর টিকেটের স্টেটাস জানতে সেই স্টেশন যাবেন?? হ্যা হ্যা হ্যা হাসালেন কর্তা। ইরেইল ডাউনলোড করুন, তাছাড়াও আইআরসিটিসিরও সাইট আছে, বেফিকর আঙুল টিপবেন, দুমিনিটে স্টেটাস জ্বলজ্বল করে আপনার স্ক্রীনে, হেঁ হেঁ…ট্রেন তো বাদই দিন, ফ্লাইট বুক করুন, ট্রেন বুক করুন, ট্যাক্সি বুক করুন, হোটেল বুক করুন…অ্যাপ আছে গন্ডাগুচ্ছের এদিকওদিক… কয়েকমিনিটের ওয়াস্তা, স্মুদলি আপনার সব জরুরত, সব মুশকিল আসান করে দেবে চুটকি মেঁ। আর ইলিট্টিরির বা গ্যাসের বিল জমা দিতে এত কান্ড? খ্যাঁক খ্যাঁক খৌয়া খৌয়া ও হো হো হো, উফফফ হাসালেন দাদা। পেটিএম আছে, মোবিকুইক আছে, তিরিশ সেকেন্ডে পেমেন্ট শেষ। নো হ্যাসলস ডিয়ার স্যার। তার ওপর ক্যাশব্যাক, মাই গুডনেস, ক্যাশব্যাক! মানে হাজার টাকার কথা বলে হাজার টাকার বিল দিলেন, টুক করে দেখলেন একশোটাকা আপনার কাছেই ফিরে এলো, কি মজা, না? আর আপনি চললেন কেঁচড়ে ক্যাশ নিয়ে ছেলের বন্ধুর দোকানে, ছ্যা ছ্যা। আরে অশোকজী, অওর ছোড়ো, আজকাল তো সবজি অবধি ডেলিভার করে দিচ্ছে এই স্টার্টাপ গুলো। ঘরে বসে ডাল, সবজি, দুধ, মাখন…
আমার ওয়াইফের কচি পালং ভালো লাগে, কচি পালং, একটু শক্ত লাল কুমড়ো আর ছোট ভিন্ডি। বড় ভিন্ডি খেলে ওর শরীর খারাপ করে। আপনার অ্যাপওয়ালারা ওসব বেছে নিয়ে আসবে? আমি যেমন করে দেখেশুনে বেছে আনি, আমার গিন্নির জন্যে?
ইয়ে, বোধহয় না। তবে কিনা….
বাবুলাল বহুত আচ্ছা দোস্ত ছিল, গত বছর পারেল যাবার সময় লোকাল থেকে পড়ে যায়। বাচ্চা ছেলে ওর, এখনো গ্র্যাজুয়েশন দেয়নি,দোকান খুলেছে…
হেঁ হেঁ, সে তো বটেই…. তবে কি না,
আর স্টেশনের মাস্টার পারভেজজী অনেক দিন ধরে আছেন, অবরে সবরে হেল্প করেন, বুকিং ফুল থাকলেও একটা সীটের ব্যবস্থা করেই দেন। উনি ফাঁকা থাকলে একটু বসেও আসি। উনি অনেকটা ছোট যদিও আমার থেকে, একটু গল্পগুজবও করি। পারভেজজীর একটাই মেয়ে, শাদির পরে কি হল কে জানে, উও পাগলি গায়ে আগ লাগিয়ে মরে গেছে, বিবিও পাগল হয়ে গেছে, একটু কথা বললে ভালো লাগে, এই আর কি।
আর বন্ধুর ছেলে, আমার ছেলের মতই, ব্রাইট বয়, বাপ মিউনিসিপালিটির গেটকীপার ছিল। খেটে খাচ্ছে, দশটাকা দিলুম না হয়। চাচা চাচা বলে, চা খাওয়ায়, লোকজন আসে, দুটো কথা হয়, হালহকিকত জানতে পারি সব।
আহ, সে তো বুঝলুম, কিন্তু টেকনোলোজির এই দুনিয়াতে….
আমার ভালো লাগে দাদ্দা। দুকানে যাই, মার্কেটে যাই, দরাদরি করি, ঝগড়া করি, আমার ভালো লাগে, সমঝে? লোকজনের সংগে কথা বলি, হাসি মজাক হয়, আমার খুব ভালো লাগে। এত লোকজন, এত আলো, এত হাসি, এত মানুষ। আমার ভীষণ ভালো লাগে। আজকালকার নওজোয়ানদের সবাই দেখি মাথা নিচু করে মোবাইলে টুকটুক করে চলে, পাশের মানুষের সংগে বিলকুল বাতচিত করে না। আমার খারাপ লাগে দাদা। এত কিসের কামকাজ তোদের হামেশা?
আরে অশোকজী, আজকাল টেকনোলোজি এত এগিয়ে গেছে, সব কিছু অ্যাপের দৌলতেই হাতের মুঠোয়, আপনি বেকার বেকার সেন্টিমেন্টাল হচ্ছেন…
আচ্ছা? সব কিছুরই অ্যাপ আছে বলছেন দাদা?
আছেই তো, অলমোস্ট অল। আপনার এখন কিসের অ্যাপ লাগে বলুন, অ্যাঁ?
বৃদ্ধ প্রাজ্ঞ ব্যাবসায়ীটি ছোখ কুঁচকে তাকালেন আমার দিকে, আলতো করে চোখ টিপলেন, আই অ্যাম সেভেন্টি ফাইভ দাদা। যে কোন দিন উপর থেকে বুলাওয়া আসবে, আসবেই। একটা কথা বলুন তো, সেই দিন আমার আরথি ওঠাবার জন্যে চারটে কাঁধ লাগবে। আছে নাকি দাদা এমন কোন অ্যাপ যে আমি মরলেই আশেপাশের থেকে জান পেহচান চারটে কান্ধা জোগাড় করে দেবে?
আমি মূক ও স্থবির!
আছে নাকি দাদা? আমার বউ, আমার ছেলে এরা আমার বডির ওপর কেঁদে পড়লে একটু শান্ত করার অ্যাপ? নেই বাবুমশাই, নেই। আমি বলছি নেই। তাই আমি এদের কাছে যাই। কথা বলি, হাসি মজাক করি, জরুরত পড়লে দেখি। এরাও আমাকে দেখে। এক হপ্তা বাজারে আমাকে না দেখলে আমার খোঁজ করতে আসে। অ্যাপ আসে না দাদা, মানুষ আসে। এখন বলুন, আছে নাকি কোন অ্যাপ, আমার আরথি ওঠাতে চারটে কান্ধা দেবার জন্যে?
বাজে বুড়ো, খচ্চর বুড়ো, নিজেকেই মনে মনে বললাম এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ফেরার সময়। আমাকে তাহলে শুরু করতে হবে নাকি এখন থেকেই? চারটে বন্ধু ফিক্স করে রাখতে হবে?
আমি মরে গেলে চারটে কাঁধের জন্যে???
ও মশাই, আছে নাকি এমন অ্যাপ, মরে গেলে চারটে কাঁধ দেবার জন্যে? কাছের লোকের চোখের জল মোছাবার জন্যে? অ্যাঁ? আছে?
