প্রায় সারা সন্ধ্যে ধরে সাত ঘন্টার জার্নির পর যখন ভাড়া করা এসইউভিটি বেতিয়া ঢুকলো, তখন রাত দশটা।
তখন সারা বেতিয়া টাউনে একটাই হোটেল ছিলো, তার ”স্যুইট রুম” বুক করা ছিলো আমার নামে।
স্যুইট রুমের সুইট বন্ননা দিয়ে আপনাদের ঈর্ষা উদ্রেক করবো না। এসি দূরস্থান। সাদামাটা ঘরে একটা ক্ষীণজীবী বালব আর একটি দুর্গমগিরিকান্তারমরু রিকেটি পাখা ঝুলছে। জল চাইলে নিচের টিউবওয়েলে ক্যাঁচক্যাঁচ করে আওয়াজ তুলে জল তুলে দিয়ে যায়, খাওয়া, স্নান, আর ইয়ে, মানে বাকি সবকিছু ওতেই!!
তবে হ্যাঁ, দারুর বন্দোবস্ত যবরদস্ত। ইলেকশনের আগের টাইম। তৎকালীন আরজেডির ”এম্লেসাহিব” উদারহস্তে টাকাদারুমাংস বিলোচ্ছেন। আমার হোটেলওয়ালা এসে এক বোতল ব্ল্যাক ডগ, দেহাতিস্টাইলে ভাজা ঝাল ঝাল দেশি মুরগির মাংস ভাজা আর স্টিলের বাটিতে বরফের টুকরো দিয়ে গেলেন। সেই সব খেয়ে, তারপর দুর্ধর্ষ ভালো চিকেন কলেজা (মেটে)র ঝাল তরকারি, উরৎকা দাল (অড়হর ডাল) আর ফুলকা রোটি খেয়ে ”হোগা উব্বুত কইর্যা” ডীপস্লিপ নিদ্রাযাপন।
পরের দিন সকালে সোজা মার্কেট।
সাদামাটা মার্কেট। নবীন সেলসকিশোরটিও দেখলাম ভুবনডাঙার মাঠে খেলুড়ে পাবলিক। ফলে বিশেষ কিছুই শেখাবার নেই। চৌখস ছেলে।
দিনের শেষে জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁ রে হিমাংশু, কাছেপিঠে কোন অপকান্ট্রি মার্কেট আছে?
ছেলে খানিকক্ষণ গোঁজ হয়ে রইলো। তারপর বলল, হ্যায় এক, হরণাটাঁড় বলে, তবে সেখানে কি আমার না গেলেই নয়?
সে কি রে পাগলা? শেয়ালকে তাও ভাঙা বেড়া দেখানো যায়, বাঙালকে তো একদম না! একবার যখন সন্দেহপ্রকাশ করেছিস, তাহলে তো যেতেই হচ্ছে!!
অত্যন্ত অনিচ্ছাসহকারে সে বলে গেলো, ”ঠিক হ্যায়, চলিয়ে”।
পরের দিন সকালে স্নান করে, খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে ডোবানো লিট্টি আর চোখা খেয়ে, পার্ফেক্ট স্যুটেডবুটেড বাবুটি হয়ে রেডি, এমন সময় হিমাংশু এসে আমাকে দেখেই বলল, উঁহু, এসব চলবে না।
কি চলবে না?
এই সাহেবি ড্রেস।
কেনো?
বলবো না। কিন্তু প্লিজ এসব ধড়াচূড়া ছেড়ে শস্তা দলামোচড়া শার্ট, নোংরা শাল আর হাওয়াই চপ্পল পরে যেতে হবে।
টং করে মাথাটা গরম হয়ে গেলো। তুই জানিস আমি কোত্থেকে এমবিএ করে এসেছি? আই আই এম। নাম শুনেছিস বে? তোর চোদ্দ পুরুষ শুনেছে? আমি তোর বস না তুই আমার বস? কে কার কথা শুনে চলবে র্যা ? আমি এই পরেই যাবো।
সে ছেলে খানিকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইলো। তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, চলুন তবে।
খুব যে দূরে জায়গাটা তা নয়, চল্লিশ কিলোমিটার মতন, কিন্তু রাস্তা বলে কিছু না থাকলে তো আর তার জন্যে গাড়িকে দোষ দেওয়া যায় না। ফলে ঘন্টা দুয়েক বাদে যখন হরণাটাঁড় পৌঁছে মাটিতে পা রাখলাম, তখন নিজেকে অমিতাভ বচ্চন কম, কাঞ্চন মল্লিক মনে হচ্ছিল বেশি!
আধা জঙ্গুলে আধা মফস্বল হরণাটাঁড়ে আমাদের বড় ডিলার একজনই। তার কাছে বসে ঘন্টাখানেক কথা বলে পরের জনের কাছে যাবো, রাস্তায় একটা দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছি, এমন সময় লক্ষ্য করলাম দুই মাঝবয়েসী মক্কেল আমার পাশে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে খৈনি টিপছে, আর মৃদুস্বরে আলোচনা করছে ‘এ হে সেঠওয়া হ কা, হোরা চিট্টা, নয়া নয়া কাপড়া জুতা পহনল বা। বৈঠও একরা কে। পাঁচ দস লাখ কে কাম এয়সেহি হো যাই’। অস্যার্থ, এই কি শেঠ নাকি রে ভাই, দিব্যি ফুলবাবুটি, লতুন লতুন জামা জুতো চড়িয়ে এসেছে। ধরে বসিয়ে রাখ মালটাকে, পাঁচ দশ লাখ তো এমনিতেই এসে যাবে!
শোনামাত্র আমার ঘাড়ের সমস্ত রোঁয়া দাঁড়িয়ে গেলো। বলে কি?
আড়চোখে তাকিয়ে দেখি দুটি প্রায় চল্লিশ ছোঁয়া মুশকো টাইপের লোক, সাদা ফতুয়া আর খাটো ধুতি পরা, মাথায় গামছা বাঁধা, খৈনিটা দু আঙুলে তুলে, বাঁ হাতে নিচের ঠেঁটটা একটু টেনে খৈনিটা দাঁত আর ঠেঁটের মাঝে চালান করে হাত দুটো ঝাড়তে ঝাড়তে এদিকে এগিয়ে আসছে।
দূরে দেখি আমার গাড়ির পাশে অলরেডি একটা জটলা, মানে দৌড়ে পালাবার পথও বন্ধ।
সেই দুটি খৈনিপুরুষ কাছে এসে ভারী বিগলিত হেসে বলল ‘রাম রাম সেঠজি, কঁহা সে আয়েল বানি? পটনা সে?’
জীবনের সেই সংকটতম মুহুর্তে প্রথম বুঝলাম ঈশ্বর কখন কি রূপ ধরে কোন ক্যাবলাকাত্তিককে কেন কৃপা করেন তা বোঝা সত্যিই দায়।
আরও বুঝলাম, সেলস হয়তো অনেককেই ট্রেইনিং দিয়ে শেখানো যায়, কিন্তু জাত সেলসম্যান জন্মায়, তৈরি করা যায় না।
তড়িৎগতিতে হিমাংশু এগিয়ে এসে খ্যাঁক করে হেসে বলল ‘আরে নাহি নাহি চাচা, ই তো নয়া সেলসম্যানওয়া হামার। বহাল ভ্যইল বানি আজ সে। ই লইকা নয়া বা। বংগাল সে আয়িল রহল। আভি তো ই হারামি টেরনিংওয়া লেত বা’।
তৎক্ষণাৎ তাদের একজন দ্রুত ঘুরে ধূর্ত কুটিলস্বরে জিজ্ঞেস করলো ‘তোহার বাপু কা কর লেতানি?’
আবারও সংকটত্রাতা শ্রীমধুসূদন। হিমাংশু গভীর আক্ষেপের সংগে মাথা নেড়ে বলল ‘ই কা বাবুজি তো কিসানি করেলান। নোকরি ভ্যয়ল হ তো একঠো কাপড়া সিলওয়া দেলান হ’।
তবুও জগাই মাধাইয়ের সন্দেহ যায় না, ‘তোহার কিতনা তংখা মিলেলা হ?’
সর্বক্ষণ নোয়া নিজেই নৌকার হাল ধরে অবোধ অপোগণ্ডগুলিকে এই ক্ষুরস্য ধারা, নিশিত দুরত্ময়া পার করাবেন, এ আশা অত্যন্ত অনুচিত। তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিংএর চারটি বছর স্রেফ নাটক আর নাট্যচর্চা করেই কাটিয়েছি, সে কথাটাও টক করে মনে পড়ে গেলো। ফলে অত্যন্ত করুন কাঁদোকাঁদো স্বরে বললাম ‘মাহিনা সাড়ে চার হাজার, অউর রোজ কি খোরাকি শ” রূপেয়া তক মিল যাতা হ্যায়। আজ তো আভি তক কুছ নেহি খায়া’।
