দু কন্যেই চুপ করে গেলেন। অন্তত বাহ্যিক দিক দিয়ে। নেহা জিজ্ঞেস করলো (আর আপনি আপনি বলতে পারছিলাম না কেউই)
‘তোমার বাড়িতে কে কে আছে?’
‘মা, বাবা, মেয়ে, বউ। তোমার?’
‘মা বাবা, বোন, ছেলে’
ছেলেই শুধু? হাজব্যান্ড নেই? কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ভারি সংকোচ হচ্ছিল।
এমন সময় পূজা খেঁকিয়ে উঠলো,’তোর মর্দের নামটা লিচ্ছিস না যে?’
নেহা কি একটু অপ্রতিভ হল? খানিকক্ষণ চুপ থেকে জানায় যে ওর ”মরদ” ব্লাড ক্যান্সারের রুগি। ঠাকুরপুকুরে আছে দু বছর।
খানিকক্ষণের নৈঃশব্দ।
আমার যা স্বভাব। সুযোগ পেলেই লোকজনের ইনকাম, লাইফস্টাইল, স্পেন্ড প্যাটার্ন, সোশিও ইকনোমিক চয়েস, ডেমোগ্রাফিক প্রোফাইল এসব খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বার করা আমার অভ্যেস। এই স্বভাবের জন্যে সমাজের বিভিন্নস্তরে কিছু চিত্তাকর্ষক রুজির বন্ধু আছে আমার। আমি থার্ড পেগের অর্ডার দিয়ে হাসি মুখে কাজে লেগে পড়ি।
পূজাকে নিয়েই পড়লাম, ‘তুমি কতদিন আছো এখানে?’
‘তিন বোছর হোবে’।
‘বাড়িতে কে কে আছেন?’
‘তাইজি’
মানে? আর কেউ নেই?
নাহ। অসুস্থ জ্যেঠিমা ছাড়া ভদ্রমহোদয়ার তিনকূলে আর কেউ নেই।
এইবার খাপ খুললাম, ‘ইয়ে, তোমাদের কি রকম রোজগারপাতি হয় এই কাজ করে?’
সমস্বরে উত্তর এলো ‘ডিপেন্ড করে’।
আহ। সে তো বুঝনু। কার ওপর কি কতটা ডিপেন্ড করলে কতটাকা হাতে আসে ভাই? অন অ্যান অ্যাভারেজ?
আবার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, পেটে প্রায় বোমা মেরে জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারলুম, রোজগার প্রতি মাসে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা। কোন কোন মাসে স্পেশাল মুর্গি / কাস্টমার পাকড়াও করতে পারলে ওটা সত্তরও হতে পারে। আর যে বুদ্ধু মেয়ে দিওয়ালি আর ”ফাসট জানুয়ারি” মাস দুটোতে কম সে কম দেড় লাখ টাকা কামায় না, তার এ লাইনে থাকা না থাকা সমান।
এবার আড়াই পেগ মেরে দেওয়ার পর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমরা বাড়ি যাও? বছরে কবার?’
‘তা দাদা, বলতে গেলে, উমম (দাদা বলেছে শুনে, সত্যি বলছি, খুউব ফ্রি লাগলো নিজেকে) এক দুবার তো যাইই’।
‘কিসে যাও?’
‘ধরো টেরেনে বেশিরভাগ সময়েই। মাঝেসাঝে ফেলাইটেও যাই’।
‘একাই থাকো? খাবার কোথায় খাও?’ (নিজেকে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার মনে হতে থাকে এর পরে।)
‘তিনচারজন মিলিয়ে থাকি দাদা। ধরো বারো হাজার টাকা ভাড়া দিইই। বাঁধা মাসি আছে, রান্না করে দিয়ে যায়।’
‘উইকেন্ডে কি করো?’
দুই জনেই হেসে গড়িয়ে পড়লো, ‘আমাদের আবার ছুটি কি দাদা, সনিরোব্বারেই তো বেসি কাস্টমার আসে। তখনি তো নগদাপাত্তি কিছু পকেটে ঢোকে দাদা। ছুটি বলতে, ধরো পোনরো আগস, কি গান্দি বাড্ডে, এই আর কি’।
পরের প্রশ্নটা করতে খুবই ইতস্তত করছিলাম বটে, শেষে করেই ফেললাম, ‘তোমাদের, ইয়ে, আর কোন, মানে, ইয়ে আর কোন ইনকামের রাস্তা আছে? মানে, ইয়ে, এইসবের থেকে একটু এগিয়ে?’, জিজ্ঞেস করে একটা বোকা বোকা ক্যালানে মার্কা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখি।
দুজনেই প্রশ্নটার মানে বোঝে, ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে হাসে। স্পষ্ট স্বরে, চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে, ‘সবই তো বোঝ দাদা। ওই ধরো সেখান থেকেও আরও বিস পচ্চিস হাজার হয়। পার শট পাচ নিইই। মাসে চারপাচটার বেসি কাজ করি না’।
এতক্ষণে অনেকটা সহজ হয়ে এসেছি বলে বললাম, ‘কিছু খাবে নাকি?’
শোনা মাত্র শিকারি বিড়ালের ক্ষিপ্রতায় ওয়েটার এগিয়ে আসে, বুঝতে পারি
(১) ইনি বাঙলা বোঝেন (‘জোয়ন্ত দা কিস্ননগরের লোক’), এবং
(২) এই সাকীদের যে খাদ্য পাণীয়ের অর্ডারটা আসে, সেটাও একটা উপার্জনের রাস্তা বারের পক্ষে, হয়ত মত্তাবস্থায় ক্যাবলার অর্ডার করানো একই তন্দুরি চিকেন সংগিনীটির ইশারাতে ডাবল দামে পরিবেশিত হয়।
নেহা আমার দিকে চোখ ফেরায়, ‘তুমি তো বসলেই না। ফ্রিতে আমরা কিন্তু কিছু খাই না।’।
আরে ধুর। কি জ্বালা, ‘না না এমনি বলছি। কিছু খাবে?’
দুইজনে চোখাচোখি করে। তারপর পূজা হেসে বলে, ‘ঠিক আছে, জোয়ন্তদা, দুটো সুইট লাইম সোডা নিয়ে এস। নর্ম্যাল’।
‘নর্ম্যাল মানে’?
দুজনেই দাবড়ে দেয়, ‘তোমাকে বুঝতে হবে না’।
কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করি,
‘এখানে কজন মেয়ে কাজ করে?’
‘তা ধরো পনেরোষোলো জন’
‘এরা কোন কোন স্টেট থেকে আসে?
দুজনেই চুপ।
‘কি হল’
অনেক্ষন পরে জবাব আসে, ‘আর্ধেক আসে বিহার আর কোলকাত্তা থেকে, বাকি আর্ধেক বাংলাদেশ থেকে’।
স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। ইস্ট ইন্ডিয়ার মেয়েরা এতই সস্তা নাকি?
এবার শুষ্কস্বরে জিজ্ঞাসা করি, ‘তোমাদের নাম গুলো ভুল বলেছ, তাই না?’
দুজনেই একটু বোকা বোকা হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, ততক্ষণে এসে যাওয়া স্যুইট লাইম সোডাতে চুমুক দিতে থাকে, এলোমেলো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে থাকে ‘তোমার মেয়ে কত বড়?’ ‘ওলে বাবা’ ‘কোন ক্লাসে পড়ে?’ ‘খাওয়া নিয়ে ফালতু ঝামেলা উমেলা করে না?’
ততক্ষণে আমারও তিন পেগ শেষ, নেশা পুরো টঙএ চড়ে বসেছে।
আলো আরও আঁধার হয়ে এসেছে, উচ্চস্বরে গান বাজছে, ‘হায় হায় জওয়ানি লে ডুবি’, সন্ধ্যে হয়ে উঠেছে আরও মদির মাতাল, আগত রাত্রির পরতে পরতে পাপ বুনে দিচ্ছে তার শোষণের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাসের কালিমা।
অন্ধকার টেবিলের চারিদিকের সাইকোডেলিক আলো আর বেআইনি ধোঁয়াতে দুনিয়াটা পুরো সুররিয়ালিস্টিক হয়ে উঠেছে,
এমন সময় পূজার ডাক এলো, হুমদো বঙ্গভাষী ওয়েটারটি পূজার কানে কানে কিছু বলতেই, কন্যেটি মাথা নামিয়ে দু টেবিলপরে একটি মাঝবয়েসী পুরুষের পাশে কোলঘেঁষে বসে বিনা কারণেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
