আমারও নেশা তখন তীব্র হয়ে উঠেছে। তবুও ওয়েটারকে আরেকটা স্মল পেগ অন রক্স দিয়ে যেতে বললাম
মাঝবয়সী পুরুষটি যেভাবে জড়িয়ে, চটকে, জামার নিচে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ভোগ করা শুরু করলো, তার একটাই তুলনা মাথায় আসে, হরিণীর মাংসখন্ড পেয়ে হিংস্র হায়েনার ভোজনউল্লাস!
আপনা মাংসে হরিণী বৈরী? সত্যি? কাহ্নপা ভুষুকপা এনারা কি শিকারি শ্বাপদ দেখেননি?
সব দোষ শুধু ক্ষুধার্ত হরিণীরই?
তখন নেশার তীব্র বিষে আমার শরীর বেপথু ও চেতনা উন্মার্গগামী। সামনে বসা নেহার হালকা হাসিমুখটুকু অবধি মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়ে আসছে। সমস্ত ঘর জুড়ে জেগে উঠেছে মাদকতাময় মায়াবী আলোর বিভ্রম, লাউডে মিউজিকে বাজছে নেশালু গান, ‘জানু, আজ রাত কা সীন বানা দে’
এমন সময় দুটেবিল পরে পূজার চোখে চোখ পড়লো।
আমার দিকেই আবছা হাসি দিয়ে চেয়ে আছে সেই মেয়ে, বিহারের কোন অজ্ঞাত গ্রাম থেকে বেঙ্গালুরুতে শরীর বিক্রি করতে আসা সেই মেয়ে, মাথা শক্ত করে তাকিয়ে আছে সে, একটা নোংরা হাত, তার জামার নিচ দিয়ে বুকের ওপর খেলে চলেছে হিংস্র উল্লাসের সংগে , একটা সাপের মতন দীর্ঘ লোলজিহবা গাল আর কান চেটে দেয় তার। হাসি মুখে বিহারের সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা মেয়ে আমার চোখে চোখ রেখে থাকে, সেই হিংস্র জিহ্বা শুষে নেয় আমাকে দাদা বলে ডাকা সমস্ত অসহায়তা টুকু…
পাঁচশো টাকায় দশ মিনিট ভোগ করা যায় জ্যান্ত নারীমাংস! মানুষ এত সস্তা?
অনেক ছোটবেলার বাজারে দেখা একটা দৃশ্য মনে পড়ে গেলো, একটা কচ্ছপকে উল্টো করে শুইয়ে রাখা হয়েছে, সে হাত পা ছুড়ছে, আর একটু একটু করে তার বুক থেকে ধারালো ছুরি দিয়ে মাংস কেটে শালপাতায় খদ্দেরের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কচ্ছপের জান বলে কথা!
মৃতপ্রায় কচ্ছপের বুক কেটে তুলে আনা টাটকা তাজা মাংস, কখনো খেয়েছেন কর্তা?
প্রায় নীট হুইস্কি কাঁচাই গলাধঃকরণ করি। সিগারেটের ধোঁয়ায় আবছা হয়ে আসে নেহার মুখ। স্খলিত স্বরে জিজ্ঞেস করি ‘কেন কর এসব? ভালো লাগে করতে? আর সত্যি করে বলতো তোমাদের কি নাম?’
বিল আসে, ক্রেডিট কার্ড পাঞ্চিং মেশিনও। নেহা চুপ করে থাকে, বুঝি যে জবাব টা আমাকেই দেবে শুধু।
ক্লান্ত নেশাজর্জরিত হাতে পাসওয়ার্ড টাইপ করি মেশিনে,কার্ড ওয়ালেটে রাখি, দরাজ টিপস গুছিয়ে দিই বিলের ভাঁজে।
ওয়াটার স্পষ্টতই খুশি হয়, মাথা নুইয়ে দরজা খুলে ধরে।
চলে আসবো, টেবিলের ওপার থেকে উঠে দাঁড়ায় সেই মেয়ে, আমার কানে এসে ফিসফিস করে বলে, ‘আমার নাম তবাসসুম দাদা, নেহা নয়। আমি বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসেছি’।
টলতে টলতে ভাবলাম একে কি বলবো, এও কি আমার মতনই উদ্বাস্তু?
স্খলিত পায়ে সেই মুঘলাই সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াই। বাংলাদেশ থেকে আসা সেই দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি সাবধানে ধরে ধরে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে আমাকে, ব্রিগেড রোডের উচ্ছল হাসিআলোর মাঝখানে আমাকে ছেড়ে দেয়, সস্নেহে বলে ‘সাবধানে যাবে’।
আমি ঘুরে দাঁড়াই, জিজ্ঞেস করি, ‘এসব কাজ কেন কর বললে না যে?’
‘কি বলবো দাদা, বরের ক্যান্সার আছে, শুনলেই তো। বম্বেতে টাটায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে হবে। অনেক টাকা লাগবে দাদা, তুমি বুঝবে না’।
এই বলে বিষন্ন আলোয় সেই বাংলাদেশ, আমার চেতনার সাড়ে তিনহাত ভূমি, আমার সবটুকু মাড়িয়ে উঠে যায় নতুন খদ্দেরের হাতে নিজেকে সঁপে দিতে।
টলতে টলতে একটা অটো ধরি, সীটে বসে শরীরটা এলিয়ে দিই, শ্রান্ত মগ্নচৈতন্য জুড়ে বাজতে থাকে ”কেন চেয়ে আছো গো মা, মুখপানে..”
