২) যেটা খটকা লাগলো সেটা হল দুজনের উচ্চারণ। শহুরে কলকাত্তাইয়া মার্জিত বাঙলা আর গ্রাম্য মিষ্টি বাঙলার মধ্যে অনেক পার্থক্য, যেটা শুনেই বুঝতে পারছিলাম। তাছাড়া সেলসের কাজে গত দশ বছর বিবিধ জায়গা পরিভ্রমণের ফলে অন্তত পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু ডায়ালেক্ট চিনতে শিখেছি। সেই জ্ঞানে বুঝনু যে স্থূলাঙ্গী মহিলাটি অবাঙালী, খুব সম্ভবত বিহার বা ইউপির এবং দীর্ঘাঙ্গী মহিলাটি দক্ষিণবঙ্গের সীমান্ত এলাকার। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বাংলাদেশ সংলগ্ন এলাকাতেই এই ডায়ালেক্ট বা কথ্য ভাষার টান শোনা যায়।
এই উচ্চারণের কোন বঙ্গললনা বেঙ্গালুরুতে সফটওয়্যারে কাজ করলে আমি সত্যি খুব খুশি হতাম, সোশাল আপলিফটমেন্টের জাগ্রত নমুনা দেখে, কিন্তু আমার ষষ্ঠ ঈন্দ্রিয় বলছিল ডাল মে সামথিং প্রচন্ডরকমের ব্ল্যাক তো হ্যায়! তাছাড়া এনাদের হাহাহিহি ঠিক আমার চেনাশুনা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুনিদের হাসিঠাট্টার সংগে মিলছিল না, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তো নয়ই।
সে যাই হোক, প্রথম পেগটা এসে পড়াতে আমি হাল্কা চুমু দিয়ে ফেসবুক দেখছি, এমন সময় দীর্ঘাঙ্গী কন্যেটি হাল্কা হাস্কি স্বরে আমাকে উদ্দেশ্য করেই বললেন, ‘থোড়া ইধর ভি দেখিয়ে জনাব, মোবাইলমে কেয়া রাকখা হ্যায়?’, সংগে একটি বিলোলমদির মক্ষীরানি মার্কা হাসি।
আমি প্রথম রাতেই বিল্লি মারতে অভ্যস্ত, ঘুরে দাঁত কেলিয়ে বললাম, ‘আরে, আপনারা বাঙালি নাকি? বাহ বাহ’।
দুইজনেই একটু থমকে গেলেন, স্থূলাঙ্গীটি একটু কাষ্ঠ হেসে হিন্দি ঘেঁষা বাংলায় বললেন, ‘আপনিও আমাদের মতুন বংগালি নাকি?’
আমি দাদা, সেলসের লোক, দরকার থাকলে যে কোন পাবলিককে নিজের পছন্দসই দূরত্বে রেখে বা কাছে টেনে আলাপ জমানোটা আমার পেশাগত দক্ষতার মধ্যেই পড়ে। আমি ভারি উৎসাহ ভরে ওদিকে ঘুরে কান এঁটো করা হাসি দিয়ে বলি ‘আলবাত। আপনারা কোথায় থাকেন? কি করেন?’
দুজনেই সন্ধিগ্ধভাবে একে অন্যকে দেখে নেন। তারপর আমাকে ঠিক একই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
আমি সত্যি কথাই বলি। আমি কে, কি, কেন, হোয়াই ব্যাঙ্গালোরে টুডে, সওব।
দুজনেই একটু আড়ষ্টতা কাটিয়ে সহজ হবার চেষ্টা করেন। দীর্ঘাঙ্গী কৃষ্ণা রমণীটি একটু ভেবে বলেন, ওনার নাম নেহা। স্থূলাঙ্গীটি জানান যে ”হামার নাম পূজা আছে”।
দুটো নামের গা দিয়েই পাক্কা মিথ্যে মিথ্যে গন্ধ বেরচ্ছিল। কিন্তু কিছু বললাম না। সহজ সুরে জিজ্ঞাসা করলাম ‘আপনাদের বাড়ি কোথায়?’
‘আপনার?’ – নেহা
‘আমার বাড়ি দমদমে’
‘আপুনি কি কাজ করেন?’- পূজা
‘সেলসএ আছি ম্যাডাম। সারা দেশ ঘুরতে হয়’।
লক্ষ্য করলাম ”ম্যাডাম” শব্দটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও একটা ম্যাজিক ঘটে গেলো, দুজনেই একটু প্রীতিসহকারে সহজ হলেন।
‘আমার বাড়ি নৈহাটিতে’ – নেহা
‘হামি…উমমম, পার্ক সার্কাসে থাকি’। – পূজা
এটাও মিথ্যে পাক্কা, কিন্তু ততক্ষণে আমার ভেতরের ফেলুদাটি হাসিমুখে বলছেন ‘ধৈর্যং রহু’।
আমি অযাচিতভাবেই একটু বাগাড়ম্বর করি। নিজের চাকরি সংক্রান্ত ঝামেলার কথা বলি, মেয়েকে নিয়ে নাজেহাল হবার গল্প। আমার দওশ হাজার টাকা দিয়ে একটা ”ফালতু” মোবাইল কিনে ঠকে যাবার গল্প।
এনারাও কিছু সহজ হতে শুরু করেন। তখন আমিও জিজ্ঞাসা শুরু করি,
‘আপনারা কি করেন এখানে?’
পূজা জবাব দেয় ”হামরা এখানে বিউটি পার্লারে কাজ করি”।
আমি মুখে হাসিটা টেনে রেখেই সটান জিজ্ঞেস করি, ‘তা এখানে সন্ধ্যেবেলা কি করছেন দুজনে? রোজই কি আসেন? টেবিল তো পুরো খালি দেখছি’।
নেহা ফাজিল হেসে বলে ‘ধুর, ও মিথ্যে বলছে। জানেন আমরা কি করি? পেছনের দিকে তাকান’
তখন অল্প আলোতেই দৃষ্টি চোখসই হয়ে এসেছে।
এর আগে ওদিকে, মানে বারের একদম পেছন দিকে, যাকে বলে আলো আঁধারির সীমানা ছাড়ায়ে, কিছু যুবকযুবতীর কলোচ্ছল হাসিতরঙ্গ ভেসে আসছিল বটে, এবার ওদিকে তাকিয়ে কারণটা সুস্পষ্ট দিবালোকের মতনই প্রত্যক্ষ হয়ে উঠলো।
প্রতি টেবিলে একেকজন পুরুষ একেকজন নারী নিয়ে ব্যস্ত। সেই সব নারীদের চেহারাছবিও এই আমার সমীপবর্তিনী দুই মহীয়সীর মতনই!!
আর ”ব্যস্ততার” কি বর্ণনা দেবো? হে শেয়ানা পাঠক/ পাঠিকা, সময়কালে কি আপনারা নিজ নিজ নিষ্পাপ মহিলা/ পুরুষ বন্ধুদের সহিত, সেই যৌবনতাড়িত দিনে, সবচেয়ে খাজা সিনেমাগুলির মর্নিং শো”তে সর্বোচ্চ সারির একদম কোণার দিকের সীটগুলি বুক করে ঘনিষ্ঠতম আদিম আকাঙ্ক্ষা গুলির খবর নেননি??
পার্থক্য এই যে, এখানে এই আদিম প্রবৃত্তির প্রকাশ বড় ঘৃণ্য। বছর ষোলর রাহুল বছর পনেরোর সালমা র বুকে থরথরকম্পিত হাত রেখে ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে ইলেক্ট্রিক শকসম একটি চুম্বন করিলেন, সে বড় ভালো।
কিন্তু এখানে বছরপঞ্চাশের একটি পারভার্ট আধবুড়ো একজন বছর কুড়ির মেয়েকে হিংস্র বুভুক্ষু দানবের মতন চটকাচ্ছেন, আরও অস্থানে কুস্থানে হাত ঢোকাচ্ছেন , সেটা হজম করা একটু ইয়ে লাগে প্রথম দর্শনে।
চোখ সরিয়ে এদিকে আনলাম। দ্বিতীয় পেগে চুমুক মেরে ভাবছি কেসটা কোনদিকে যাবে, এমন সময়ে নেহা বললেন, ‘আপনার পাশে বসবো নাকি? দশ মিনিটে পাঁচশো টাকা নিয়ে থাকি। আপনি দেশের লোক, না হয় পনেরো মিনিটই থাকবো, হি হি হি।’
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলাম। কত কি যে করে যেতে হয়, পেটে খিদে পেলে।
মৃদু বললাম ‘না না ম্যাডাম, আমার ওসবের শখ নেই, আমি শুধু মদ খেতেই এসেছি’।
