আপনি যখন ফোর্থ ইয়ারে একটি রসালো চাগরি বাগিয়ে, ‘আমি কি ডরাই সখি ভিখারি সিজিপিয়ে’ আউড়ে, ওল্ড মঙ্ক, হিউম্যান ডাইজেস্ট, গাঁজা, সানি লিওনি ইত্যাদি প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন সাব্যস্ত করেছেন, তখনই এই অনাছিষ্টির ডাক। অত্যন্ত সংগত কারনে আমরা এর উল্লেখ র’ফলা য’ফলা বাদ দিয়েই করতাম।
ইহা কি? রসিকা পাঠিকা, ঘাবড়াইবেন না। ইহা তেমন বিশেষ কিছুই নহে।
ধরুন কোন এক বসন্তের সোনাঝরা সন্ধ্যায় আপনার ডিপার্টমেন্টে এগারোজন প্রফেসর আপনাকে ঘিরে বসেছেন। অন্ধকার ঘর, পুরো জঙ্গলের পরিবেশ, চারিদিকে জ্বলন্ত চোখ আর খিকখিক করে অত্যন্ত অপমানজনক হাসি। সেই আতঙ্কের হাড়হিম করা পরিবেশে আপনার দিকে ইন্টারন্যাশনাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতন উড়ে আসছে অসভ্য টাইপের কোশ্চেন, আপনি লাস্ট চার বছর কি কি শিখেছেন তার সব কিছুর ওপর। মানে চার বছরে আপনার যা যা শেখবার কতা ছিল, না না উটকো ফালতু ঝামেলায় শিখে উঠতে পারেন নি, পূজ্যপাদ প্রফেসরেরর দল সেই সব হিসেব আজ কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেবেন।
পাঞ্চালীর বস্ত্রহরণ বোধহয় একটু বেশি মানবিক ও সিমপ্যাথেটিক ছিলো এর থেকে।
নিজের কতা কইতে নজ্জা নাগে। শুধু এটুকু মনে আছে, ঘন্টা দুয়েকের পর ওরা যখন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে জিগাইলেন ‘সরকার বাবু, আপনি তো দেখছি সেরেফ ইয়েমস্তি করে কাটিয়েছেন চার বচ্ছর। আপনাকে তো ডিগ্রীখানি পেরাণে ধরে দিতে পারচি না, গার্জিয়ান কল করতে লাগে। বাবার নাম খানি বলুন ত মশায়’। আমি পাক্কা আড়াই মিনিট চুপ থেকে বলেছিলুম ‘আরেকটু সময় দিন স্যার, মনে করার চেষ্টা করছি’।
কিন্তু মহাত্মা অ্যালেক্স হেইলি মহাগ্রন্থ ‘রুটস’ এর লাস্ট লাইনে বলেই গেছেন, মাঝে মাঝে পরাজিতের লিখিত ইতিহাসও মহত্তর হয়ে ওঠে। আমাদের গপ্প সেই নিয়েই। ওই এক বারই, জাস্ট একবারই ঘুঘুতে আর ধান খেয়ে যেতে পারেনি পুরোপুরি, সেইটাই আপনাদের কমু”অনে।
আমাদের মেকানিকালের শ্রীমান ক্যাবলা, বুইলেন কিনা, চেষ্টাচরিত্তির করে আই আই টি তে ঢুকে পরার পর মা সরস্বতীকে আর বিশেষ ডিস্টার্ব করেন নি। উনি ওঁর মত ছিলেন, ইনি নিজের মতন। কিন্তু ভাইগ্যের লিখন খন্ডাবে কে? এক বর্ষণক্লান্ত সন্ধ্যায় বিরহী যক্ষের পত্রখানির মতই সেই নিয়তির ডাক আসিয়া পৌঁছাইল।
১৯৯৮ এর সেই শীতার্ত বিকেলে মেকানিকাল ডিপার্টমেন্টের ল্যাবে শ্রীমান ক্যাবলা যখন গ্র্যান্ড ভাইভাতে অ্যাপিয়ার হন, তখনো অপেক্ষমান উল্লসিত আটজন প্রফেসর আন্দাজ করে উঠতে পারেননি ঠিক কি ঘটতে চলেছে।
ক্যাবলা সেই আয়রন থ্রোনে অধিষ্ঠিত হতেই সমস্বরে ‘হাউ ইউ আর ফীলিং টুডে ক্যাবলা?’ গোছের প্রশ্ন উড়ে আসে। জবাবে ক্যাবলাসুন্দর ফেঁস করে একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন, যার মর্মার্থ ‘সখি, কি পুছসি অনুভব মোয়?’
এরপর ওনাকে একাদিক্রমে বাইশটি প্রশ্ন করা হয়। আঠারোটির উত্তরে উনি বলেন ‘আই ডোন্ট নো’। বাকি চারটির উত্তরে বলেন ‘আই ক্যান্ট রিকল নাউ’।
এর পর সমবেত খ্যাঁক খ্যাঁক খোউয়া খোউয়া র মধ্যে,
-‘বাপু, তোমার সিজিপিএ কতো এখন?’
-‘ফোর পয়েন্ট এইট আউট অফ টেন স্যার’।
-‘চাকরি পেয়েছ?’
-‘না স্যার’
-‘ক্যাট দিয়েছিলে? পারসেন্টাইল কতো? ‘
-‘সিক্সটি টু, স্যার’
(নেপথ্যে আবার সেই খ্যাঁক খ্যাঁক…)
-‘জি আর ই দিয়েছিলে নাকি? স্কোর কত?’
-‘১১০০ আউট অফ ২৪০০ স্যার’
সমবেত কুরুচিপূর্ণ হাস্যরোলের মধ্যে একজন জিগালেন, ‘সন্টিমন্টি, এই তো তোমার নেকাপড়ার অবস্তা। জীবনে কি করবে কিচু ঠিক করেচ?
-‘হ্যা স্যার, ভাবছি আই আই টি র প্রফেসর হব’।
এর পরের ঘটনার বিশদ বর্ণনা দেওয়াটা বাহুল্য। তবে এটা ঘটনা কে শ্রীমান ক্যাবলা শুধু মাত্র তাঁর নিজের ইচ্ছায় ডিগ্রীখানি পরের বছর গ্রহণ করেন। এখন হীন চরিত্রের কেউ যদি ওই ভাইভাকে এর কারণ হিসেবে দেখাতে চান, তাহলে আমি নেহাতই নাচার।
তবে ক্যাবলার কাহিনী এখানেই শেষ নয়!
শ্রীমান ক্যাবলার বাবা নিতান্ত নিরীহ বাঙালী ভদ্রলোক হলেও মা ছিলেন অত্যন্ত দাপুটে ভাটিন্ডা কি শিখণী। ভবানিপুরে কোনোদিন বাঘ বেরোয়নি, কিন্তু বেরলে যে ওনার দাপটে স্থানীয় গরুদের সংগে একই ঘাটে জল খেতো সে নিয়ে কারও মনেই কোনো সন্দেহ ছিল না। এহেন ভদ্রমহিলার ক্ষেত্রে স্নেহ নিম্নগামী হবার প্রশ্নই ওঠে না। আর তাছাড়া ভাটিন্ডা আর ইতালি পাশাপাশিও নয়।
ফলে ছেলের সংগে প্রফেসরদের মুলাকাতের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেয়েই, কোকিলের কুহুমুখরিত এক বসন্তের বিকেলে উনি নিরীহ হাসব্যান্ড ভদ্রলোকটিকে চুরণীতে বেঁধে, হোস্টেলে এসে হাজির।
শ্রীমান তখন হিউম্যান ডাইজেস্ট নামক একটি অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের ম্যাগাজিন থেকে রস আহরণে কিঞ্চিৎ বিজি ছিলেন। ফলত সঙ্গত কারণেই এই অনৈসর্গিক আক্রমণের জন্যে উনি প্রস্তুত ছিলেন না। ক্ষণকালের মধ্যেই একটি হাড়হিম করা আর্তচিৎকারে আমাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারপর ক্যাবলার রুম থেকে কিছু কাঠের স্কেল ভাঙার শব্দ উড়ে আসে, এবং অনতিবিলম্বে কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হইয়া ক্যাবলার নিজের উইং থেকে অন্য উইংএ দৌড়, অবধারিত ভাবে কার্ল লুইসের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।
এর ফলশ্রুতি হিসেবে অনেকটা বাধ্য হয়েই ক্যাবলাকে পরের বছর মা সরস্বতীর সংগে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তিতে আসতে হয়। ভদ্রমহোদয়াও এবার আর সম্পূর্ণ নিরাশ করেননি। টুকটুক করে, কখনো হামাগুড়ি নিয়ে, কখনো লাফিয়ে,নানান ধরনের ‘টেন্স, বাট আন্ডার কন্ট্রোল’ সিচুয়েশনের মধ্যে দিয়ে ক্যাবলাকে লাস্ট সেমেস্টারের গেরো পেরিয়ে ক্যাবলা ফের এসে পড়ল সেই কালান্তক গ্র্যান্ড ভাইভার সামনে!
