নির্ঘাত এইই সেই।
ছোকরার ডাইমেনশন দেখে বাক্যি হরে গেলো। খানিক্ষণ বাদে ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
‘তোর নাম কি?’
‘বাবলু মন্ডল স্যার’
‘হাইট কতো?’
‘চার ফুট আট ইঞ্চি স্যার’
‘ওজন?’
‘ঊনচল্লিশ কিলো স্যার’
চমৎকৃত হলাম। এই স্ট্রাকচারে এতো বড় লোড নিচ্ছে, কম বড় কথা নয়!
‘বয়েস কত?’
‘ঊনিশ, স্যার’
‘চল মার্কেটে। কোন মার্কেট আজ?’
‘গোলপার্ক টু প্রিন্স আনোয়ার শা বীটে কাজ আছে স্যার’
‘চল’
‘আমার বাইকে র পেছনে বসুন স্যার’
‘ফেলে দিবি না তো’
‘হি হি। না না স্যার, বসুন না’
‘কবে কিনলি বাইক?’
‘আমার নয় স্যার, স্টকিস রতনদার। আমি চালাই, মাঝে মাঝে মাল ডেলিভারও করি। তাছাড়া রতনদার ছেলেকে স্কুল থেকে এনে দিইই, বউদিকে বাজার এনে দিই….’
বুঝলাম। বাইক চালানোর মূলো দেখিয়ে যতটা নিংড়ে নেওয়া যায় আর কি!
‘বাইক চালাতে ভালো লাগে?’
‘হেবি লাগে স্যার, একদিন তো বুলেট চালালাম। ব্যাপক’।
‘বুলেট চালালি কি রে? বুলেটের ওজন জানিস?’
‘সাইজ দিয়ে কিছু হয় স্যার? ইনজিন কন্ট্রোল করতে জানতে হয়। একবার সাইজ করে ঘাড়ে বসে ব্যলান্স রাখলেই, ব্যাস’
সুজন ঠিকই বলেছিল, ছোকরার চোখেমুখে কথা।
‘হ্যাঁ রে হেলমেট নেই কেন? পুলিশ ধরে কেস দিলে কে বাঁচাবে?’
‘চিন্তা করবেন না একদম স্যার’, ছোকরা দুহাত তুলে অভয়দান করলো ‘আপনি আমার এলাকায় আছেন স্যার। ওসব নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না’
উরিশ্লা, এই দিলতোড় কনফিডেন্স দেখে সন্দেহ হল,
‘হ্যাঁ রে, পার্টি পলিটিক্স করিস নাকি’
‘ওই আর কি স্যার, হেঁ হেঁ’
‘বাড়ি কোথায় তোর?’
‘বারুইপুর স্যার’
মার্কেট করতে করতে চলেছি। আমার চিরকালের অভ্যেস সেলসম্যানদের হাঁড়ির খবর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বার করা, টুকটাক করে সে চেষ্টাও চলছে।
‘হ্যাঁ রে, মাইনে কত পাস?’
‘ছয় মত স্যার, ইন্সেন্টিভ নিয়ে সাত হয়ে যায় ‘
‘বাবা কি করেন?’
‘মারা গেছেন স্যার, মাদ্রাসাতে পড়াতেন’
শুনে একটু খটকা লাগলো,
‘হ্যা রে, তোর নাম কি বললি যেন?’
‘বাবলু’, একটু চোরা ইতস্তত ভঙ্গি।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বুঝল আমার আসল প্রশ্নটা কি।
ফিক করে হেসে বলল, ‘আখতার মন্ডল স্যার। ডাকনাম বাবলু’।
তখনও তাকিয়ে আছি দেখে এবার একটু ম্লান হেসে বলল, ‘একটু এই ধরনের নাম বললে কাজ পেতে সুবিধা হয় স্যার’।
দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ‘চ’ ‘চ’, আরও সতেরোটা দোকান বাকি। বাড়িতে কে কে আছেন?’
‘বোন’
মানে??
‘বুঝলাম না হে। শুধু বোন?’
‘হ্যা স্যার, গেলো বচ্ছর আগস্টে মা মারা গেলো। এখন আমি আর বোন থাকি’।
‘কবে থেকে ঢুকলি সেলসে?’
‘সেপ্টেম্বর থেকে’
‘পড়াশুনা করিস’
‘করতাম স্যার, এগারক্লাসে উঠেছিলাম’
বুঝলাম, সবই ওই ”গেলো বচ্ছর আগস্টে” কেস।
‘বোন কত বড়? কি নাম?’
‘এই তো আট ক্লাসে উঠবে। ওর নাম লক্ষ্মী’, বলেই আমার দিকে ঝটিতি চেয়ে যোগ করল, ‘ভালো নাম শবনম’।
‘বোন লেখাপড়া করে?’
‘কি বলছেন স্যার? লক্ষ্মী তো পত্যেক বছর ফাস্ট বা সেকেন হয়। হেবি ব্রেন স্যার। গেলো অ্যানুয়ালে অঙ্কে একাশি পেয়েছে, আর ম্যাথসে সাতাত্তর’।
বুঝলাম কোথাও গুলিয়ে ফেলেছে, কিন্তু ঠিক করে বোঝাবার আগেই ‘বুলেটগাড়ি খুব ছুটেছে’ ভঙ্গিতে তার বাক্যস্রোত দৌড়তে থাকলো, ‘ওর ইস্কুলের হেডস্যার রণেনবাবু বলেছেন ওর মাথা খুব সাফ স্যার। আমাকে বলেছেন বোন যেন লেখাপড়া বন্ধ না করে, অসুবিধা হলে জানাতে’।
এরপর বকবক চলতেই থাকলো। লক্ষ্মীর বুদ্ধিমত্তা, স্বভাবচরিত্র, শিল্পানুরাগ ইত্যাদির বিবিধ ব্যাখান শুনে আমারও কেমন যেন মনে হতে শুরু করেছে যে হাফ কিলো মারি কুরির সংগে আড়াইসের ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল আর পোয়াটাক লীলা মজুমদার মিশিয়ে এই স্ত্রীরত্নটি ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন, এমন সময় খেয়াল হল,
খিদে পেয়েছে, খুব খিদে পেয়েছে।
সামনেই সাউথ সিটি। টপ ফ্লোরে মেইনল্যান্ড চায়না। কথাটা মনে পড়তেই পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়ি গুলো পাক দিতে লাগল। শ্রীমান বাবলুকে বললাম, ‘হ্যাঁ রে, তোর খিদে পায়নি?’
‘বেশি পায়নি স্যার, সকালে ভাত খেয়ে বেরিয়েছি তো।’
‘আচ্ছা? কি খেলি?’ হাল্কাচ্ছলে জিজ্ঞাসা করলুম।
‘ভাত’
‘ধুর শালা, সে তো শুনলাম। আর কি?’
খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘গরম গরম ফ্যানা ভাত স্যার, নুন, লঙ্কা আর সর্ষের তেল দিয়ে। ব্যাপক লাগে খেতে’।
‘বাহ বাহ, এ তো রাজভোগ রে। চল, আমার খিদে পেয়েছে, একসঙ্গে খাবো’।
ছোকরা তৎক্ষণাৎ ঘ্যাঁচ করে ব্রেক মেরে দাঁড়িয়ে গেলো, ‘না স্যার, আপনি যান’
‘মারবো কানের গোড়ায় দুই থাপ্পড়, চল বলছি’।
সে অনিচ্ছুক ঘোড়াকে টেনেটেনে মেইনল্যান্ড চায়না অবধি তো নিয়ে গেলাম, ঢুকে দেখি বাবুর হাত পা ঠান্ডা, চোখমুখ ফ্যাকাশে, কথায় উড়নতুবড়ি ছোটানো স্মার্টনেস উধাও। জবুথবু হয়ে সীটে প্রায় সিঁটিয়ে আছে। এসব জায়গায় যে আগে আসেনি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
নাহ, ছোকরা কে একটু উৎসাহ দেওয়া দরকার।
একটা ক্যান্টনিজ নুডলস আর চিলি চিকেন অর্ডার দিয়ে ওর দিকে ফিরলাম।
‘তুই আর বোন ছাড়া আর কোন আত্মীয়স্বজন নেই?’
‘চা-ইয়ে এক কাকা আছেন। ‘
‘তিনি কিছু সাহায্য করেন না?’
ম্লান হাসল, ‘বলেছিলাম। চাচী বললো ওদের বাড়ি কি এতিমখানা?’
‘তোদের কি নিজেদের বাড়ি’
‘না স্যার, ভাড়াবাড়ি। একটা ঘর নিয়ে দুইজনে থাকি’
ততক্ষণে খাবার চলে আসায়, বাধ্য হয়েই এই সদালাপ বন্ধ রাখতে হয়।
