গলাটা মিষ্টি করে, মানে এই হেঁড়ে গলা যদ্দুর মিষ্টি করা যায় আর কি, বল্লুম ‘এখানে কোথায় থাকো? উইকেন্ডে কি কর?’
(মানে আজই তো উইকেন্ড, ”হ্যালো, ইজ ইট মি ইউ আর লুকিং ফর?”)
‘কোম্পানির একোমোডেশন দেওয়া আছে স্যার। উইকএন্ডে কি আর করবো, এদিক ওদিক ঘুরি’।
‘একাই?’ খুব সন্তর্পণে প্রশ্নটা ভাসিয়ে দিই।
‘উমম, মাঝে মাঝে রুমমেট সংগে থাকে, বেশিরভাগ সময়ে অবশ্য একাই বেরিয়ে পড়ি’।
জয় গুরু। এবার ব্যাপারটা সাবধানে, খুউউব সাবধানে খেলিয়ে খেলিয়ে…
‘আমার কিন্তু স্যার ভীষণ ভালো লাগছে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরে।’
হেঁহেঁ, ভীষণ ভালো যে আমারও লাগচে সে আর বলতে?
‘গুড টু নো দ্যট সুকন্যা (ইংরেজিটাই চলুক নাকি? ইম্প্রেস করতে সুবিধা হবে মনে হয়), কিন্তু তুমি জানলে কি করে যে আমি এখানে উঠছি?’
‘আমাদের ফ্রন্ট ডেস্ক যিনি দেখেন, মুখার্জী বাবু, তিনিই জানালেন যে আপনি আসছেন। আমি তো তখন থেকে স্যার অপেক্ষা করছি আপনার সঙ্গে কথা বলবো বলে’।
নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না মশাই। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আজি এ প্রভাতে রবির কর, আমারই ওপরে পড়বি? পড়।
কপাল ঠুকে বলেই ফেলি নাকি কালকে বিকেলে আমাকে বেনারস ঘুরিয়ে দেখার কথা? পাটনার ট্রেইন টিকেটটা অবশ্য ক্যান্সেল করাতে হবে, পরশুর টিকেটই করাব। নাকি ভলভোতেই চলে যাই? বেনারস টু পাটনা তো জাস্ট ঘন্টা চারেকের রাস্তা।
গলাটা খুব গাঢ় করে বল্লুম ‘কেন বলতো সুকন্যা?’
‘আমি তো আপনাকে ফেসবুকে ফলো করি স্যার। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা পাঠাবার সাহস হচ্ছিল না।’
সে কি রে পাগলা? আমি তো সব্বার ইয়ে এক্সেপ্ট করি, এই তো কালই দুটো এক্সেপ্ট করলুম, একটার নাম ”মিষ্টি নেড়ি”, আরেকটার নাম ”ন্যাংটো গোলাপ”, তোরটায় তো হামলে পড়ে ইয়েস বলবো।
‘আরে পাঠালেই পারতে। এমন আর কি ব্যাপার’।
‘আমি তো স্যার একটু আধটু লেখালেখিও করি,…’
মার দিয়া কেল্লা। গাড়ি লাইনে ঢুকে পড়েচে। এবার আস্তে করে,…
নিশ্চয় আমার লেখা পড়েছে। নইলে এতো আকুলিবিকুলি কিসের? নিজের ওপরেই শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো ঝপ করে। নাহ, এই যে কিছুমিছু লিখিটিখি, পাবলিক একধারসে হুলিয়ে খিস্তিয়ে যায়, দু একজন তো লেখা বন্ধ না করলে মার্ডার করারও হুমকি দিয়েছে ইনবক্সে, সেসব খুব খারাপ নিশ্চই নয়। এই তো সেদিন একজন মেসেজ করলেন ‘লিখে যা পাগলা, বীভৎস বাজে লিখিস বটে, কহতব্য নয়, রোদ্দুর রায়ের রবীন্দ্রসংগীত আর তোর বাংলা লেখা প্রায় একই, কিন্তু চেষ্টা করে যা। কালেক্কে একদিন আমার লেভেলে না পৌঁছলেও কিছু তো অন্তত পারবি। সেটাই বা তোর পক্ষে কম কি?’, এসবের কি কোন দাম নেই?
খুব প্রেম প্রেম গভীর গলায় বল্লুম, ‘ইয়ে, কাল বিকেলে কি করছো?’
‘বিশেষ কিছুই না স্যার’।
ধরা যাক না কাল সারা দিন একসঙ্গে রইলাম দুজনায়।। কাশীর গলির মধ্যে, দশাশ্বমেধ থেকে অসসি ঘাট অবধি ঘুরে বেড়ানো, হা হা হি হি হাসি, একসঙ্গে পানিপুরি বা পাপড়ি চাট? রুমাল দিয়ে গালে লেগে থাকা কিছু মুছিয়ে দেওয়া। সুধীন দত্তের শাশ্বতী কবিতাটা মুখস্ত করে যাই? নাকি শক্তি চাটুজ্জে?
তারপর একসঙ্গে বসে আরতি দেখার সময় আলতো করে আঙুলে আঙুল, কাঁধে মাথা। হয়তো উড়ন্ত চুল আমার মুখে….
ঘপাৎ করে থার্ড পেগটা পুরো নামিয়ে দিলুম। লাফাতে থাকা হৃৎপিন্ডটাকে বাঁ হাতে চাপা দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বল্লুম ‘হোয়াই ডোন্ট ইউ হেল্প মি টু এক্সপ্লোর দিস বিউটিফুল সিটি অফ বেনারস টুমরো? লাঞ্চ ইজ অন মি’।
ধক। ধক। ধক।
‘অফ কোর্স স্যার, দ্যাট উইল বি মাই প্লেজার’।
ওরে কে কোথায় আছিস? শাঁখ বাজা, উলুধ্বনি দে। কালিঘাটে জোড়া পাঁঠা বলি দেবো মা। এতদিনে মুখ তুলে চেয়েছো!
‘তোমার কোন অসুবিধা নেই তো?’
(নাহ, কার্টসি বলে তো একটা বস্তু আছে রে ভাই।)
‘কি বলছেন স্যার? জানেন স্যার আপনার সংগে দেখা করার কবে থেকে ইচ্ছে? সেই জার্নালিজম পড়ার সময় থেকে। আপনার সংগে কিছু সময় কাটানো তো ভাগ্যের ব্যাপার স্যার। কত কিছু শেখার আছে আপনার কাছ থেকে। বাংলার সবচে” বড় সংবাদপত্রের সম্পাদনা কি ছোটখাট ব্যাপার স্যার? তাও এতদিন ধরে? ভাবতেই ভালো লাগছে ছোট্টবেলার স্বপ্ন আজ সত্যি হতে চলেছে ….
ঠক করে ফোনটা নামিয়ে রাখলুম।
লাস্ট পেগটা নীট মারবো। কাল সকালেই চেক আউট।
ইয়ের লাইফ শালা !
