আমি আর সেই বাৎসরিক পাঁচ কোটি টাকার ব্যবসা দেওয়া ডিলার মহোদয় দুজনেই স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম এই মহাপুরুষপপ্রবরটির দিকে!
এই ঘটনার প্রায় ছয়বছর পরে গ্যাঙস অফ ওয়াসেপুর নামক অসামান্য চলচ্চিত্রটিতে এমনই একটা ডায়ালগ শুনে সেদিনের সেই মহাপুরুষবাণীর প্রকৃত নিহিতার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হই!
যাক কথায় কথায় অনেকটাই বলে ফেললাম। এবার তৃতীয় গল্প।
আগেই বলে রাখি যে গল্পটা আমার শোনা, আমার প্রত্যক্ষ করা নয়। ফলে কাহিনীটা যিনি বলেছেন তাঁর জবানীতেই শোনা যাক।
‘সেবার আমাদের অ্যানুয়াল কনফারেন্স রাখা হয়েছে আইটিসি সোনার বাংলাতে। সে বছর ইস্ট রিজিওন ভালো ব্যবসা দিয়েছে। ফলে কম্পানীও খুব খুশি, ঢালাও দারুমুর্গী চলছে। শেষে যখন টয়লেটে হিসি করতে গিয়ে দেখলাম আমাদের রিজিওনাল ম্যানেজার আট পেগ মাল চড়িয়ে খুবই নিবিষ্টচিত্তে দেওয়ালের আয়নার গায়ে তোড়ে হিসি করছেন, তখন মনে হলো এবার বাড়ি যাওয়াটা সত্যিই প্রয়োজন।
আমার বাড়ি, তুমি তো জানই, সল্টলেকে। সেদিন আমার পাঁচশো সিসির এনফিল্ডটা নিয়ে এসেছিলাম। আমার এই একশো কুড়ি কিলো ওজনের জন্যে ওই বাইকই ঠিক, দিব্যি মানিয়ে যায়। তা বাইরে এসে একটা সিগারেট খেয়ে বাইক বার করেছি, এমন সময় দেখি আমার টীমের মদনগোপাল, ওরফে মগাই গৌরাঙ্গের মত দুহাত তুলে দৌড়তে দৌড়তে আসছে। আমি তো বাইকে স্টার্ট দিয়ে দাঁড়ালাম। মদনা টলতে টলতে এসে বললো, ‘গুরু, উল্টোডাঙ্গা অবধি নামিয়ে দেবে প্লিজ?’
আমার কেমন যেন বড় মায়া হলো। ছোকরার তিন কূলে কেউ নেই, একাই থাকে। তার ওপর বড় প্রেমপ্রেম বাই আছে, মেয়ে দেখামাত্র প্রপোজ করে, কিন্তু কেউ পাত্তা দেয় না। ওজনে বড়জোর চল্লিশ কিলো, খ্যাংরাকাঠির মতো চুল, বড় বড় গোরুচোরের মত চোখ। বাড়ি বাঙ্গুরে। আমি বললাম ‘আচ্ছা বোস, তোকে বাঙুর অবধি পৌঁছে দিচ্ছি।’
তারপর তাকে নিয়ে তো চলছি। ফাঁকা শুনশান রাস্তাঘাট। এপ্রিল মাস, একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে, ঠাণ্ডা মিঠে ফুরফুরে হাওয়া। ছোকরা বাইকে বসেই আমার পিঠে মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি অবশ্য কিছু মাইণ্ড করিনি। বাইপাসের পাশের ওই পুকুরটার ওপারে মস্ত চাঁদ উঠেছে, তার ওপরে বাতাসে শিরশিরানি ভাব। নেশাটা দিব্যি জমে উঠেছে, চিংড়িহাটার মোড়ে পৌঁছেছি, এমন সময় অচানক রেড সিগন্যাল। যেই জোরে ব্রেক কষেছি, অমনি মদনবাবু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে টুক পেছন থেকে উলটে রাস্তায় পড়লেন এবং তৎক্ষণাৎ রাস্তায় শুয়ে থাকা একটা নেড়িকে জড়িয়ে ধরে ‘ওহ স্যুইটি, ইউ আর সো সফট’ বলে ঘুমিয়ে পড়লেন।’
আজ থেকে প্রায় বছর দশেক আগে আমি একটি মশামারা কম্পানির মাছিমারা এরিয়া ম্যানেজার ছিলুম। মানে আমাদের ব্যবসা ছিলো মশা মারার কয়েল, মেশিন, লিক্যুইড রিফিল, আরশোলা মারার স্প্রে ইত্যাদি বিক্রি করা। ব্র্যাণ্ডের নাম? গুডনাইট আর হিট।
আমি যখন জয়েন করি তখন কম্পানির বৃহস্পতি তুঙ্গে। তিন বছরের মধ্যে টার্নওভার ডাবল, বিদেশভ্রমন ( মল্লিখিত ”প্যারিসে নিশিবাসরে” পড়ার দুর্ভাগ্য হয়েছে কি? ওই, তখনই যাওয়া আর কি), ইত্যাদি তো ছিলই, আর পেয়েছিলাম রেকর্ড পরিমাণ ইন্সেনটিভ, যা এখনও চঞ্চঙ্খও ইন্ডাস্ট্রিতে অবিশ্বাস্য বলে ধরা হয়।
তা এমনই এক সময়ে মার্কেটিং এর এক কর্তাব্যক্তির মাথায় এলো ওডোমসের সঙ্গে সমানে টক্কর দেনেওয়ালা প্রডাক্ট বার করার কথা। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, হা রে রে রে করে , ঢাকঢোল পিটিয়ে আমরা বাজারে আনলুম হার্বাল বডিক্রিম, মশাও মারবে সলমান খানের মতন দাবাংবিক্রমে, আর ত্বকও হবে ক্যাটরিনা কইফের মতন মখমলি, এই ছিলো প্রডাক্টের গুণাবলীর নির্যাস। কুলোকে অবশ্য বলতো মশা মারে কেষ্ট মুখার্জির মতন আর ত্বকের টেক্সচার প্রায় ওম পুরীর কাছাকাছি পৌঁছয়, তবে সেসব হিংসুটেদের কথা পাত্তা দেওয়ার কথাও নয়, আমরা দিইও নি।
আমাদের ব্র্যা ণ্ডের ট্যাগলাইন ছিলো, ”মচ্ছরোঁ সে করে ওয়ার, ত্বচা সে করে পেয়ার”। বলা বাহুল্য, হিন্দিতে ওর থেকে ভালো ট্যাগলাইন আর হয়না। এদিকে আবার যেহেতু সেবছর কলকাতা ডিপো সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করে (করবে নাই বা কেন শুনি? এরিয়া ম্যানেজার কে সেটা একবার দেখবেন না মহাই? বিদ্যায়, বুদ্ধিতে, পৌরুষে, সাহসে,চরিত্রে, রূপেরঙেগন্ধেবর্ণেস্পর্শে অমন ”সেকেন্ড টু নান এরিয়া ম্যানেজার আর কটা দেখেছেন মশাই খুলে বলুন দিকিনি, হুঁ হুঁ), ফলে কলকেতা শহরের যন্যি বিশেষ মার্কেটিং প্ল্যান বানানো হচ্ছে, এবং বাংলা ভাষায় লিখিত পোস্টারে পোস্টারে চারিদিক ছয়লাপ করে দেওয়া হবে।
সাধু উদ্যোগ। আমরা তো মশাই সেলসম্যান এবং মার্চেন্ডাইজার বাহিনী নিয়ে রেডি, এমন সময় মার্কেটিং হেডের ফোন, ‘তুঝে বাংলা পঢ়া আতা হ্যায় কেয়া?’
মানে? খাজা কাঁঠাল নাকি ব্যাটা? আতা হ্যায় কি রে, আম হ্যায়, জাম হ্যায়, জামরুল হ্যায়, কাঁঠালি কলা ভি হ্যায়। তোর দরকারটা কি সেইটে খুলে বল দিকিন।
‘পোস্টার কা বাংলা ভার্শান আয়া হ্যায়, পঢ়কে বাতা, সব ঠিকঠাক হ্যায় ইয়া নেহি।’
আচ্ছা, পাঠাও।
এলো, মানে তিনি এলেন। আর সে কি আসা! আমরা তো মশাই সেই হিন্দি ক্যাচলাইনের বাংলা অনুবাদ পড়ে হেসে কুটিপাটি! মাইরি! সে অনুবাদ শুনলে কলকাতা ইউনিভার্সিটি যে আমাদের ডালকুত্তো দিয়ে খাওয়াতো তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই! চাইকি ‘গুডনাইটের ফাঁসি চাই, দিতে হবে, দিয়ে দাও’ বলে কলেজ স্কোয়ারে চাট্টি মিছিল বেরোলেও আশ্চয্যি হতাম না!
