যথারীতি হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে মার্কেটিং ম্যানেজারকে শুধোলাম, ‘কৌনসা চু** ইয়ে বানায়া হ্যায় ভাউ’ (মারাঠিতে ভাউ মানে সম্মানীয় বড়দা)।
তিনি রোষকষায়িত লোচনে (মানে টেলিফোনে যতটা লোচন বোঝা যায় আর কি!) ‘ঠিক হ্যায় বে, ফির তু হি বানা!’
বাঙালকে চ্যালেঞ্জ করে কেউ পার পায়নি একথা সর্ববাঙালবিদিত। ফলে সেই ”মচ্ছরোঁ সে করে ওয়ার, ত্বচা সে করে পেয়ার” নিয়ে বসতে হলো। শেষে দমদম পার্কের নাইট ক্যুইন ডান্সবারে চার পেগ মাল চড়িয়ে, লাভলির ডান্স দেখতে টক করে বাংলাটা মাথায় চলে এলো, ‘মশার জন্যে সর্বনাশা, ত্বকের প্রতি ভালোবাসা’।
সেইদিন লাভলি ওরফে পাকিজাকে পাঁচশো টাকার বকশিশ দিয়েছিলুম,স্পষ্ট মনে আছে! সেদিন আমার অনারে স্পেশাল ‘কাজরা রে’ নেচেছিলো, আহা, সে অসামান্য নাচ এখনও চোখে লেগে আছে।
এত কথা বলার কারনটা হলো যে আজ সকালের আনন্দবাজারে এয়ারটেলের একটি অকথ্য এবং অশ্রাব্য বাংলায় লেখা অ্যাড বেরোয় বলে শুনেছি। আমার বাড়িতে গত দশ বছর ধরে আনন্দবাজার ঢোকে না। ফলে এহেন কীর্তিটির খোঁজ পাই ফেসবুকে। আর তারপর সেই স্টেটাস সুনামি।
এখানে একটি কথা খুবই সাহস টাহস করে অতি সন্তর্পণে অভিজ্ঞজনের চরণে পেশ করি। তেরো বছর হয়ে গেলো কর্পোরেট লাইনে আছি। মার্কেটিংএর অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও কিছু আছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যে এতে আনন্দবাজারের কিছু মাত্র দোষ লেই কো! কম্পানির মিডিয়া এজেন্সি আর মিডিয়া হাউসের মধ্যে এই চুক্তিই হয় যে এজেন্সি হাতি ঘোড়া গু গোবর যা ছাপাবে, মিডিয়া তাই ছাপতে বাধ্য। একটি অক্ষর ইদিকউদিক করার কথা, বা কালার টোন সামান্য বদলে দেওয়ার কথা ভাবাই যায় না! পরে যদি এজেন্সি এসে তেড়েমেড়ে বলে যে ‘ওইটেই আমাদের ক্লায়েন্ট চেয়েছিলেন, আপনি ফোঁপরদালালি করার কে মশাই? এই যে মূমুর্শুর বানান বদলে মুমূর্ষু করে দিলেন, জানেন এতে করে আমার ক্লায়েন্টের আড়াই জন কাস্টমার কমে গেছে, ফলে উহাদিগের সতেরো নয়া পয়সা প্রফিট ক্ষতি হইয়াছে, এ ক্ষতিপূরণ কে করবে? আপনি?’ তাহলে মিডিয়ার কুচ্ছু করার থাকে না। ফলে তিনি যা পান, অম্লানবদনে তাই ছেপে দেন। শুধুমাত্র দেশের ক্ষতি হয়, বা দাঙ্গায় উস্কানি দেওয়া হয় এমন কপি চোখে পড়লে মিডিয়া ম্যানেজার ওপরওয়ালার মতামত চান। নইলে এসব এয়ারিটেলের ফেয়ারিটেলে পেয়ার কা দুশমন জান কা দুশমন হতে তাঁদের বয়েএএ গ্যাছে!
দোষটা কার? এয়ারটেলের মার্কেটিং এন্ড কমিউনিকেশন ম্যানেজার এবং তাদের মিডিয়া এজেন্সির। সবসময় এসব স্থানীয় ভাষায় লেখা পাবলিক কমিউনিকেশন মার্কেটিং ম্যানেজাররা ব্যক্তিগত ভাবে একবার ক্রস চেক করিয়ে নেন। এক্ষেত্রে এজেন্সিটি যে অপদার্থের একশেষ সে নিয়ে সন্দেহ নেই, মূল অপরাধ তাদেরই। গাদাগুচ্ছের টাকা খিঁচে এই অ্যাড কপি উপহার দেওয়া প্রায় ক্রিমিনাল অফেন্স, তাদের কন্ট্রাক্ট আজ কালের মধ্যে বাতিল না হলে আশ্চর্য হবো। তবে এয়ারটেলের মার্কেটিং ম্যানেজারও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। ওটুকু সতর্কতা বজায় রাখার জন্যেই তেনাকে অত টাকা মাইনে দেওয়া হয়।
আবারও বলছি, আনন্দবাজারের দায়িত্ব এক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। তাদের কিছুই করার ছিলো না।
এই নিয়ে একটা মজার গল্প বলি। এসব কাণ্ডকে ইংরেজিতে বলে ফ ‘পা’ ( faux pas)। এরকম মার্কেটিং ফ ‘পা’ র গল্প আপনি মার্কেটিং বা অ্যাড এজেন্সির লোকেদের কাছে গাদাগাদা শুনতে পাবেন। তারই মধ্যে থেকে এক উমদা পিস পেশ করি।
উত্তরভারতখ্যাত একটি ব্যথা বেদনা উপশমকারী মলম প্রস্তুতকারক কম্পানি ঠিক করলেন তাঁরা দক্ষিণ ভারতে ব্যবসা বাড়াবেন। দক্ষিণ ভারত অম্রুতাঞ্জনের দুর্গ বললেই চলে। এঁরা সেখানে তেমন কিছু সুবিধা করে উঠতে পারেননি। সেখানে কিছু করতে গেলে সোজা সদর দফতরে কামান দাগাই শ্রেয়। ফলে অনেক ব্রেইনস্টর্মিং এর পর, দু-দুটি অ্যাড এজেন্সি পেশ করলো তাদের ক্রিয়েটিভ জ্যুইস নিংড়োনো সেই অসামান্য কপি, দেখা যাচ্ছে যে মলমের টিউব থেকে একটু মলম বেরিয়ে আছে, নিচে লেখা your own soothepaste। মানে আপনার ব্যথা বেদনায় আরাম দেয় বা সুদিং করে এমন পেস্ট। সঙ্গে টুথপেস্টের সঙ্গে অ্যালিটারেশন।
চমৎকার না?
অফ কোর্স চমৎকার! মার্কেটিং ম্যানেজার আর দুবার ভাবলেন না। কম্বুর্ন্টে বললেন গো অ্যাহেড গাইজ। ক্র্যা ক দ্য মার্কেট!
তা হইহই করে একদিন রাতের বেলা সেই হোর্ডিং এ মুড়ে ফেলা হলো সমস্ত চেন্নাই! অ্যাড এজেন্সি, মিডিয়া এজেন্সি আর মার্কেটিং ম্যানেজার সোল্লাসে গলা অবধি মাল টেনে ঘুমোতে গেলেন।
পরদিন সক্কালে সেই কম্পানির ডিরেক্টরের কাছে তামিলনাড়ুর গভর্নমেন্ট থেকে ফোন। ওপারের লোকটি যাবতীয় শ কারান্ত ব কারান্ত (শেষ হলে ম ও চ কারান্ত) গালি দিয়ে জানালো যে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ এক্ষুণি যেন সমস্ত হোর্ডিং নামিয়ে ফেলা হয়। নইলে মেরিনা বিচে মে মাসে দুপুরে দাঁড় করিয়ে শুকনো ইডলি খাইয়ে এবং তদন্তে জল না দিয়ে সব কটাকে কোতল করা হবে!
যথারীতি কম্পানির সক্কলে না রাম না গঙ্গা! মার্কেটিং ম্যানেজার তখন মহাবলীপুরমের রিসর্টে তাঁর তামিল গার্লফ্রেণ্ডের সঙ্গে বোধহয় ইকিড়মিকিড় চামচিকির খেলতে গেছিলেন। বড়কর্তার ধমক খেয়ে প্যান্টটা পরেই দৌড়!
