৩. এইটে বলতে সামান্য সংকোচ বোধ করছি। কারণ এটি আমারই, যাকে বলে ”শাসনামলে” ঘটে।
বিশেষ কিছু না। আমারই অফিসের এক ভদ্রলোক ও এক ভদ্রমহিলা একে অন্যের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হয়ে পড়েন। দুজনেই অনেকদিন এক সঙ্গে কাজ করেছেন, খুবই এফিশিয়েন্ট। বন্ধুত্ব আগেও ছিল। হঠাত করে দুই জনেই ”বাঁধন খুলে দাও, দাও দাও দাও” করে প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেলেন। দুইজনেরই ভরভরন্ত সংসার।
তাতে ব্র্যা ঞ্চ হেড হিসেবে আমার কিছু বলার ছিল না। আমি তো আর কারও মর্যাল সায়েন্সের টিচার নই রে ভাই!! কিন্তু ঘটনা ক্রমেই ঘনঘটা হয়ে উঠতে লাগলো। লোকজন এসে কম্পলেইন করতে লাগলো যে ভালোবাসার যা বহিঃপ্রকাশ এদিকওদিক ছিটকে পড়ছে, তাতে অফিসে কাজ করা দায় হয়ে উঠেছে। আমি নিজেই একদিন দেখি মেন’স টয়লেটে দুজনে খুব মন দিয়ে চুমু খাচ্ছেন। আমি তাও কিছু বলিনি। শোনা গেলো অফিস শেষ হবার অনেক পরেও দুজনে থেকে যাচ্ছেন অনেক্ষণ, আমারই কেবিনের দরজা বন্ধ করে নাকি অনেক শিশিরভেজা গল্পগুজব হচ্ছে, তখনও কিছু বলিনি। কিন্তু একদিন যখন অফিসে এসে, আমার কেবিনে রাখা কালো ভেলভেট মোড়া সোফাটির ওপর কিছু সন্দেহজনক সাদা দাগ দেখতে পেলুম, সেদিন তাকে ঠিক শিশিরের ফেঁটা বলতে মন চাইলো না। ফলে নেহাত বাধ্য হয়েই দুজনকে ডেকে বল্লুম, ভাই,ভালোবাসা তোদের হৃদয়ে রহিল গাঁথা, কালেক্কে রোমিও জুলিয়েট, মীনাকুমারি কামাল আমরোহী, দেব শুভশ্রীর পরেই তোদের নাম নেওয়া হবে।কিন্তু এখনকার মতন তোরা আয়।
ভদ্রলোকটি কেটে পড়েন। মহিলাটি থেকে যান। পরের ঘটনা আর বিস্তারিত বলে লাভ নেই।
এইসব খুচখাচ সব জায়গাতেই থাকে। স্কুলের টিচার, প্রফেসর, এদেরও প্রেম ও পরকীয়া করতে দেখেছি। গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে পারসেন্টেজ একটু হাই হতে পারে, তবে লোকে শুধুমাত্র শুয়েই ওপরে উঠছে এমন দাবি করা মূর্খামির পরিচয়। তা হলে এদ্দিনে ইচ্ছে করলে সানি লিওনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, মিয়া খলিফা প্রেসিডেন্ট!!!
সেলসের লোকেদের ব্যাপারে আরও একটা দোষারোপ হলো যে এরা বড় মুখ আলগা, সামান্য বেশিই খিস্তিপ্রবণ। কথাটা যে আদ্যন্ত সত্যি, সে আমি নিজেকে দিয়েই বুঝি। এই খিস্তিপ্রিয়তার সামাজিক তথা মনস্তাত্ত্বিক কারণ আমি জানি না, এসব উঁচু দাগের আলোচনার ঈথারতরঙ্গ আমার মত আদ্যন্ত অশিক্ষিত বেচুবাবুর নলেজ-অ্যান্টেনার অনেক ওপর দিয়ে বয়। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিমতে, সম্ভবত আর্মিসুলভ দলীয় সংবদ্ধতা আর টার্গেট মিট করার মানসিক চাপ এর কারণ, গালাগালি দেওয়াটা প্রেশার কুকারের সিটির কাজ করে। চোদ্দ পনেরো বছর হলো, সেলসের লাইনে আছি, বহু বিচিত্র গালাগালি শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সেইসব সুভাষিতাবলীর মধ্যে মনে গেঁথে আছে জনৈক চক্রবর্তীবাবুর বাঁধা লব্জ। সেলসের টিম মিটিং হোক বা ডিস্ট্রিবিউটদের সঙ্গে নেক্সট ইয়ারের স্ট্র্যা টেজি নির্ধারণ, সামান্য প্ররোচনাতেই তিনি ভারী উত্তেজিত হয়ে উঠতেন। আর তারপরেই পাঁচফুট উচ্চতার, পঞ্চাশ কিলো ওজনের, বাহান্ন বছর বয়সী গৌরবর্ণ ব্রাহ্মণসন্তানটি ক্রোধভরে কাঁপতে কাঁপতে দক্ষিণহস্তের তর্জনী তুলে রাগী দুর্বাসার স্টাইলে বলতেন ‘আমাকে চেনো না বাঁ*, মার্কেটে আমার নাম শুনে নিও, আমি জাস্ট চোখে দেখে প্রেগন্যান্ট করে দিতে পারি, বুয়েচো? জাস্ট চোখ দিয়ে অ্যামন করে দেখবো আর পেট হয়ে যাবে…আমাকে চেনো না বাঁ…’
নেহাত মহারাজ যুবনাশ্বের পর ভারতবর্ষে আর কোনও পুরুষের গর্ভবান হওয়ার ইতিহাস নেই, তাই অমন ব্রহ্মতেজোময় অভিশাপটি বিফলে গেলো। নইলে অমন অন্তঃস্তল, তথা অন্তঃস্তলপেটভেদী দৃষ্টি কজন অনিচ্ছুক ডিলারই যে ”রোধ” করতে পারতেন তা খোদায় মালুম!
এবার আরেক দাদার গল্প। একবার এক ডিলারের সঙ্গে মীট করতে গেছি, তখন আমি কচি এরিয়া ম্যানেজার, দুনিয়ার হালহকিকত সম্পর্কে নিতান্তই নাদান বললে চলে। সঙ্গে আমার আটান্ন বছর বয়সী এক সেলস সুপারভাইজার। পদানুযায়ী তাঁর অবস্থান আমার একধাপ নীচে হলে কি হবে, সেলসাভিজ্ঞতায় ইনি অফিসে ভীষ্মপিতামহসম মর্যাদা পেয়ে থাকেন। অফিসের টিকটিকিগুলো অবধি আরশোলা ধরার আগে নতমস্তকে দাদার পার্মিশন নিয়ে থাকে বলে অফিসে কানাঘুষো আছে।
তা সেই ডিলার কথঞ্চিৎ কারণে খচে পুরো কেষ্টদা হয়ে ছিলেন। দোষটা আমাদেরই, তাই আমিও যারপরনাই ডিফেন্সিভ মোডে ম্রিয়মাণ ছিলাম। তা আলোচনা চলতে চলতে সেই ডিলারের গোলাবাজী চরমে, আমি ডানকার্কে আটক ব্রিটিশবাহিনীর মতই অসহায় বোধ করছি আর আড়ে আড়ে সেই সেলসশাস্ত্রে অধিরথ পণ্ডিতটির দিকে কাতরস্বরে তাকাচ্ছি, এমন সময়ে দেখি ঝিমুনি ছেড়ে তিনি সজাগ হয়ে উঠলেন। ডিলারের দিকে সরু চোখ মেলে তাকিয়ে বললেন, ‘চ্যাচাঁচ্ছিস কেন?’
কিন্তু ডিলারের মেজাজও সেদিন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ভোটের আবহাওয়ার মতই গরমাগরম। তিনিও বাছাবাছা ক”টা কুকথা শুনিয়ে দিলেন। আমাদের সুপারভাইজার দাদা ততক্ষণ ধরে একটা দেশকাঠি নিয়ে নিমীলতনয়নে নিজের কান খোঁচাচ্ছিলেন। ডিলারভদ্রলোক সামান্য চুপ করতেই বললেন ‘দ্যাখো সামন্ত, ইয়ে দুটো (এই বলে দুই হাতে গোলাকার কিছু ধরার মতো ভঙ্গি করলেন) যতই বড় হোক, এইটার (বলে ডানহাতের মধ্যমাঙ্গুলিটি অত্যন্ত কনস্পিক্যুয়াসলি বাগিয়ে ধরলেন) থেকে নীচেই থাকে বুঝেছো? তাই কম্পানীর ওপর বেশী রঙ নিও না, ক্যামন?’
