তারপর রাস্তায় এক বিদেশিনী সুতনুকাকে দেখে সুজনের আবার স্বভাবজাত আলাপপ্রিয়তা উসকে উঠলো, ছোকরা বেশ রমনীমোহন হাসি ঠেঁটে ঝুলিয়ে, ‘হ্যাল্লো ম্যাডাম,নিউ ইন ইণ্ডিয়া’ বলে খেজুর করতে গেলো। সুতনুকা জাস্ট পাত্তা দিলেন না। ছোকরা বেজার মুখে ফেরত এসে আমাকে আধুনিক বিদেশী সভ্যতার হিংস্র অবক্ষয় নিয়ে নাতিদীর্ঘ নিয়ে ছোটখাটো ভাষণ দিতে দিতে সিঁড়ির কাছে এসে দুজনেই বাক্যিহারা!
এসে দেখি সেখানে সেই দুই মক্কেল যে সতর্কতার সঙ্গে সিঁড়ির রেলিং ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছেন তার সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় মাইনশোভিত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কম্যান্ডোবাহিনীর শঙ্কিত পদচারণা! আর তো আর, দেওয়ালের টিকটিকি গুলো অবধি সেই বিচিত্র কুচকাওয়াজ দেখে হাঁ করে অবলোকয়মান! আর পা যে রেটে টলছে সে আর কহতব্য নয়। সিঁড়ি বেচারার যদি কোনও হুঁশপর্ব থাকতো, সে ব্যাটা পাক্কা উঠে এসে এই দুই মক্কেলের কানের গোড়ায় ঠাটিয়ে দুটো থাপ্পড় মেরে বলতো, ‘বাঁ., গুছিয়ে হাঁটতে পারো না, সিঁড়ি চড়তে এয়েচো?’
কিন্তু আমরা যেটা দেখে সম্পূর্ণ বাকরহিত হয়ে গেলাম সেটা হচ্ছে তাদের প্রত্যেকের বগলে ছলছলায়মান দুটি পাঁইটের বোতল! যাতে সে দুটি পড়ে ভেঙে না যায় তার জন্যেই এত উতরোল, এত সশঙ্ক পদবিক্ষেপ !
আমরা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, এমন সময়ে দুই মক্কেল টুলটুল করে হাঁটতে ফার্স ফ্লোরে পৌঁছলো। ওদের রুমও ওই ফ্লোরেই, ল্যাণ্ডিং এর পাশেই। আমরা দ্রুত সেখানে পৌঁছে দেখি একজন কী কার্ডের বদলে ওয়ালেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বার করে অত্যন্ত মন দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করছে, অপর জন দুবগলে দুটি পাঁইট হস্তে দণ্ডায়মান। তার অষ্টাবক্র দেহবল্লরীতে এক অদ্ভুত প্রসন্নতার আমেজ, মুখে শ্রীচৈতন্য মার্কা এক ভাববিহ্বল হাসি। আমাকে দেখে বিলোল মদির কটাক্ষে খ্যাঁক করে হেসে সে বললে, ‘ গুউউ, কেমন আছেন, খওরটওর সব ভাও?’
চণ্ডীদাস কহে নবপরিচয় কালিয়া বঁধুর সনে!
দুটোকে ওখানেই বলি দেবো নাকি উল্টো করে সারারাত ঝুলিয়ে রাখাটাই ঠিক হবে এসব ভেবে ওঠার মাঝেই দেখি আমার গলা থেকে আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো, ‘ তোরা আবারও খাবি? এর পরেও?’
রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ভুবনমোহিনী হাসি হেসে দুই মক্কেল আমাকে বললো, ‘গুউউ, তুমিইই তো বয়েচিলে, ওয়ান ফদ্দ্যা রোড!’
ঘরের চৌকাঠ থেকে বিছানা অবধি রাস্তার দৈর্ঘ্য কত কিলোমিটার সুপর্ণা? সে রাস্তা কতদূর?
বলতে বলতে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো মিশ্রাজীর কথা। আমার চাকরির প্রথম দিকে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ। ইচ্ছে করেই পিতৃদত্ত আসল পদবীটি চেপে গেলাম, কার মনে কী আছে সে তো বলা যায় না। সে যা হোক, মিশ্রাজী যে অতি ভালো মানুষ ছিলেন, তাতে সন্দেহ নাস্তি। দোষের মধ্যে ভদ্রলোক বড় প্রেম বিলোতে ভালোবাসতেন। সেই প্রথম শতাব্দীতে মানুষকে ভালোবেসে ক্রুশকাঠে আত্মবলিদান দেওয়া মহামানবটি, আর নবদ্বীপের পথে পথে হরিনামে মাতোয়ারা হয়ে আচণ্ডালে কোল দেওয়া যুবকটি ছাড়া এমন সার্বিক প্রেমোন্মাদ মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসে কমই এসেছেন। তবে কিনা মিশ্রাজী ভবভূতির লেখা আদ্ধেকটা বিশ্বাস করতেন, লিমিটেড টাইম আর বসুধা বিপুল, অতএব উনি ব্যাপারটা বেশী ছড়াননি, মহিলামহলের মধ্যেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। মুশকিল হচ্ছে এই প্রেমাকুল ভদ্রলোকটি বিশ্বাস করতেন জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা, প্রেম করতেন প্রায় ফিবোনাচ্চি সিরিজে। কুলোকে বলতো পাটনা শহরে ড্যুরেক্সের ব্যবসার নেট প্রফিটের অনেকটাই মিশ্রাজীর পকেট থেকে আসে। তবে কুলোকে মুক্তকণ্ঠে এও স্বীকার যেতো যে, ড্যুরেক্স নামের আবেগরোধী ব্র্যা।ণ্ডটি না থাকলে মিশ্রাজীর ”কর্মক্ষম সময়ের” মধ্যে বিহারের জনসংখ্যার ওপর যে আশঙ্কাজনক চাপ পড়তো, তা সামলাবার জন্যে সঞ্জয়-গান্ধী ছাড়া পথ ছিলো না! আমি শুধু সত্যের খাতিরে স্বীকার করতে বাধ্য যে এই প্রাচীন অরণ্যের প্রবাদ আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি। কারণ স্বচক্ষে দেখেছি যে মিশ্রাজীর প্রথমা কন্যাটি যখন কলেজে পাঠরতা, তখন মিশ্রাজীর নবতমা বান্ধবীটি প্রথমা কন্যার থেকে মাত্র দুই বছরের বড়!
গোলমাল হলো যেদিন মিশ্রাজীর বড় মেয়েটির গ্র্যা জুয়েশন পাশের উপলক্ষে তাঁদের ভদ্রাসনে ছোট একটি পার্টির আয়োজন করা হয়। মিশ্রাজী তাঁর নৈমিত্তিক অভিসার সেরে, বাবার কেনা ল্যামব্রেটা স্কুটারে চড়ে চিৎকোহরা থেকে কঙ্করবাগস্থ নিজ আলয়ে ফিরছিলেন।ঐতিহাসিকদের মতে সেদিন ছিলো ঘোর অমাবস্যা আর দিনের বেলা পাটনা শহরে ”গোবর বিকাস রেইলি” বা এইজাতীয় কিছু র্যা লী ছিলো। অথবা মিশ্রাজীর মনে স্ফূর্তি কিছু বেশী হয়ে থাকবে, মোটমাট রাস্তায় পড়ে থাকা গোবরে স্কুটারের চাকা স্কিড করে মিশ্রাজী খুবই অনিচ্ছাপূর্বক পাটনা মেডিক্যাল কলেজে নিজের শ্রীচরণদ্বয়ের ধূলো দিতে বাধ্য হলেন!
আর সেইদিনই একটু রাতে খবর পেয়ে মিশ্রাজীর যাবতীয় বান্ধবীরা এবং মিশ্রাজীর অর্ধাঙ্গিনী একইসঙ্গে হাসপাতালে এসে উপস্থিত হন!
খুব সম্ভবত হাউণ্ড অফ বাস্কারভিলসেই শার্লক হোমসের জবানীতে আর্থার কোন্যান ডয়েল বলেছিলেন, যার জন্যে পৃথিবীর একটি নারীও চোখের জল ফেলে না, তার মত দুর্ভাগা আর কেউ নেই। মহামতি ডয়েল এইটে বলে জাননি যে যার জন্যে কম করে জনা তিরিশেক নারী একই সঙ্গে চোখের জল ফেলতে হাজির হন, তার কী অবস্থা হয়! ভূষণ্ডির মাঠের হালহকিকতের খবর রাখা কেমিস্ট্রি বিশেষজ্ঞ ক্ষণজন্মা ভদ্রলোকটি হয়তো জানলেও জানতে পারতেন!
