তা সেই ফাংশন শেষ, আমরা বেস্ট রিজিওনের অ্যাওয়ার্ড পেয়ে নেচেকুঁদে একশা। আমি নিজেও অত্যন্ত প্রীতিভরে কোমর দুলিয়ে আমার দুর্দান্ত নৃত্যশৈলী প্রদর্শন করে আবেগের একশো আট নম্বর মেঘে ভাসছি, এমন সময় দেখি আমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলের এরিয়া ম্যানেজার নেই! মানে অমন মন মাতানো হুল্লোড়ের মধ্যে তিনি জাস্ট গায়েব।
চার পেগ গলাধঃকরণ করেও চিন্তায় পড়ে গেলুম। সে ছোকরাকে আপনারা অনেকেই চেনেন, ”পাটায়াতে পটলকুমার”এর সৌজন্যে। অমন চৌখস ছেলে চট করে আজকাল পাওয়াই যায় না। এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে বউ হারালে বউ পাওয়া যায় রে পাগলা, এরিয়া ম্যানেজার হারালে এরিয়া ম্যানেজার পাওয়া যায় না। আমার চার পেগের নেশা টুক করে নেমে গেলো, আমি টর্চ জ্বালিয়ে ছোঁড়াকে খুঁজতে বেরোলুম।
অবশ্য বেশীদূর যেতে হলো না, রাস্তাতেই তার সঙ্গে আমার মোলাকাত। ছেলের চোখ উস্কোখুস্কো, মাথার চুল খাড়া হয়ে গেছে। ছোকরাকে দেখেই বুক থেকে পাষাণভার নেমে গেসলো, আমি স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘কি রে ভাই, খুব টেনশনে আছিস নাকি? এই যে বেস্ট এরিয়া ম্যানেজারের অ্যাওয়ার্ড পেলি, তাতেও এই অবস্থা কেন? মাল খাবি ভাই? আয় দেখি, আমার রুমে এখনও হাপ্পবোতল… ‘
সে ছেলে আর্তনাদ করে উঠলো, ‘না বস, তুমি জানো না কি হয়েছে। ঈশান আর হরিকে পাওয়া যাচ্ছে না!’
খানিকটা আশ্চর্যই হলুম, দুজনেই বেঙ্গল টিমের চ্যাম্পিয়ন সেলস অফিসার, ‘তারা মালফাল খেয়ে ইয়ে উলটে পড়ে আছে কোথাও, তাতে তুই এত চিন্তিত হচ্ছিস কেন?’
‘বস, তুমি ওদের চেনো না। দুটোই সকালে বিয়ার দিয়ে দাঁত মাজে, হুইস্কি দিয়ে রাত্রে মুখ ধোয়। মদ খেলে দুটোরই কোনও হুঁশ থাকে না। সারা তল্লাট খুঁজে খুঁজে পেলাম না, মালদুটো যদি গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে থাকে?’
‘মানে?’ এবার আমারই মাথার চুল খাড়াখাড়া হয়ে যায়, ‘খামোখা ওরা মাল খেয়ে গঙ্গায় ঝাঁপাতে যাবেই বা কেন? হোয়াই? আন্সার মি’।
‘আরে বস, তুমি জানো না, দুটো পগেয়ামার্কা পাজির পাঝাড়া, প্পুরো বিষ মাল। গতবার দোলের সময় তো তুমি ট্যুরে গেসলে। আমরা নিজেদের মতো করে অফিসে দোল খেলছি, এমন সময় হঠাৎ দেখি দুটোতেই হা রে রে রে করে তেড়ে গিয়ে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া এক মাড়োয়াড়ি মহিলাকে রংফং মাখিয়ে… উফ সে কী হুজ্জোতি.. তোমাকে তো বলিনি। তারপর মহিলার কাছে হাতেপায়ে ধরে ক্ষমাটমা চেয়ে কোনওমতে সেট তো করলাম। ও মা, তারপর দেখি দুজনেই একটা রোগাভোগা বেওয়ারিশ বলদ পাকড়েছে, আর তারপর তার পিঠে চড়ার সে কী মরণপণ চেষ্টা! পিছলে পিছলে পড়ে যাচ্ছে, আর রাস্তায় গড়িয়ে পড়েই বলছে জ্জ্যায় সিয়ারাম। তারপর…’
আর তারপর শোনার অবস্থায় আর ছিলাম না। ধরা গলায় বললাম, ‘হ্যাঁ রে, এসব তো আগে বলিসনি। তা তারা কোথায় যেতে পারে বলে তোর মনে হয়?’
চোখমুখ লাল করে সে ছোকরা বললো, ‘বলা যায় না। মালমূল খেয়ে ফোর্টের সাইড থেকে গঙ্গায় ঝাঁপালেই বা আটকাচ্ছে কে? আশিস ঝা বললো ও না কি স্বকর্ণে শুনেছে যে আজ দুজনের মধ্যে বাজি ধরাধরি হয়েছে, রাতে মাল খেয়ে গঙ্গায় নেমে সাঁতরে যে ওপারে উঠে, কোলাঘাটের থার্মাল পাওয়ার স্টেশনের চিমনির মাথায় নিজের জাঙিয়া টাঙিয়ে আসতে পারবে, তাকেই অন্যজন মর্দ বলে মেনে নেবে।’
শুনে, আমারই শুকিয়ে গেলো। মানে বুক। সেলস কনফারেন্সে এসে টীমের ছেলে গঙ্গায় ডুবে গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটলে কী পরিমাণ স্ক্যান্ডাল ছড়াবে ভেবেই আমার নেশার অবস্থা চমকে চোদ্দ। চমকে চমচম বললেও চলে। আমি কাতর কণ্ঠে বললুম, ‘চল ভাই, আমিও খুঁজি।’
যাঁরা কখনও রায়চক র্যাআডিসন ফোর্টে গেছেন তাঁরা জানেন যে মেন বিল্ডিঙের পেছনে একটা নরম ঘাসে ছাওয়া একটি বিস্তীর্ণ মাঠ আছে। তার মাঝখান দিয়ে ছোট্ট একটি নালা বয়ে গেছে, তার ওপরে একটি রূপকথা সাইজের সাঁকো। রাতের বেলা জায়গাটি ভারী মনোরম দেখায়। আমরা দুইজনে ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর স্কীমে আহিড়ি পিহিড়ি করে এসে দূউউর থেইক্যা দেহি ঘাসের উপর শুয়্যা আছে কেডা রে?
আর কে? দুই মক্কেল দেখি হাসি হাসি মুখে চিৎপাত হয়ে শুয়ে নির্মল আকাশ অবলোকন করছেন। সুজন, বেঙ্গলের এএসএম গিয়ে আগেই ডান পা তুললো কোনও একটার গলায় তুলে দেবে বলে। তারপর কি মনে হতে পা”টা নামিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বললো, ‘কি বে *তু* রা, এখানে শুয়ে শুয়ে কি আকাশের তারা গুণছিস নাকি বে?’
দুই স্যাঙাতের কোনও একজন ঠেঁটে একটা শেয়ানা মার্কা হাসি ঝুলিয়ে বললো, ‘ গুউউ, আকাস্টাম্মাইরি হেবিব্লু দেকাচ্চে, তুমিওসুয়ে পড়ো..মেয়াজটা একদমসরিফ হয়ে যাবে।’
শুনে আমিই ওদের কারো একটার কোথাও পা তুলে দিতে যাচ্ছিলাম। তার অবশ্য দরকার হলো না, সুজন নীচু হয়ে দুটোকেই নড়া ধরে দাঁড় করালো, তারপর দুটো ক্যাঁৎ করে লাথি মেরে বললো ‘চুপচাপ ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়বি। যদি বেগড়বাঁই দেখেছি, কাল সকালে দুটোকেই কান ধরে তুলে গড়িয়াহাটে মার্কেট ভিজিটে পাঠাবো, মনে থাকে যেন।’
তারপর সেই চাঁদনি রাতে দুটোয় যখন টলমল করতে করতে একে অন্যকে জড়িয়ে হাডা মাল্লে, দেখে মনে হলো দুটো রোগাসোগা গরিলাই যেন মহুয়া খেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।
তারপর সেইখানে দাঁড়িয়ে মিনিট দশেক ধরে আমি আর সুজন আধুনিক যুবসমাজের ওপর মদ্যপানের কুফল এবং তজ্জনিত কারণে সমাজের সার্বিক অবক্ষয় সংক্রান্ত একটা ছোটখাটো সেমিনার সেরে নিলাম। সুজন পকেটে করে একটা বিপি”র পাঁইট এনেছিল, সেইটে খেতে খেতে! তারপর বোতলটা ছুঁড়ে দিয়ে দুজনেই হোটেল বিল্ডিং এর দিকে রওনা দিলুম।
