পরের দুটো অভিযোগ আকারে প্রকারে ও ওজনে কিঞ্চিৎ গভীর ও সিরিয়াস। প্রতিটি সেলসজীবিকেই পেটের ধান্দায় মাসের অনেকটা সময় ঘরের বাইরে বাইরে কাটাতে হয়। দিনের বেলাটা না হয় মার্কেটে মার্কেটে কেটে যায়, সন্ধ্যেবেলায় হোটেলে ফিরে মানুষটার আর করে কী? এখানে থেকেই অনেকে ধান্যেশ্বরীর কৃপাপাত্র হয়ে পড়েন। তদুপরি মানুষের শরীর বলে কথা, অনেকেরই ইদিকউদিকের প্রলোভনে মতিচ্ছন্ন হতে আর কতদূর? প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কখন কে ধরা পড়ে কে জানে? তবে তার জন্যে অনেকেরই সংসার কেরিয়ার সব ছারেখারে যেতে দেখেছি। কথিত আছে একটি বিখ্যাত কম্পানীর রিজিওনাল ম্যানেজার একবার শিলং এর হোটেলে এক স্থানীয় বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে কিঞ্চিৎ আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়েছিলেন। যদিও ভদ্রলোক উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতাকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে ওঁরা বৌদ্ধতন্ত্রে ফার্মা”স লাস্ট থিওরেমের প্রয়োগ অথবা ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর ওপরে জাপানের আপেলের সাইজের প্রভাব এইরকম বিষয়ের ওপর খুবই মনোজ্ঞ আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন, অশিক্ষিত ইতর জনতা সে কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। ওই শীতের রাতে, শিলং এর রাস্তায় ভদ্রলোককে টাই পরিয়ে রাস্তায় হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
আপনারা বোধহয় কথাটা ঠিক বোঝেননি, ভদ্রলোককে শুধুমাত্র টাই পরিয়েই থানায় নিয়ে যাওয়া হয়!
এই লাইনে আরও অনেক অম্লমধুরতিক্তকষায় গল্প এই কলমচি”র জানা আছে, কিন্তু প্রকাশ করতে সবিশেষ ভয় পাচ্ছি বলাই বাহুল্য। একে দিনকাল খারাপ, তার ওপরে কুশীলবরা অনেকেই ফেসবুকে বহাল তবিয়তে বিরাজমান। কোত্থেকে কোথায় কে একটা চিরকুট ছেড়ে দেবে, তারপর সেটা পত্রবোমা হয়ে আমার ইয়েতে আছড়ে পড়ুক, অমন চাইবার মত আহাম্মক আমি নই বাওয়া।
বরং মদ্যপান নিয়ে চারটে ছোট্টখাট্টো গপ্প বলে আপনাদের মনোরঞ্জন করি, ক্যামন? এমনিতেই জাত বেচুবাবু, কাস্টমারের মনোরথগতিতে মলয় সুপবন সাপ্লাই করা ছাড়া আর কিই বা বিশেষ কাজ থাকে বলুন?
ঘটনা এক। পাত্র সদ্য বিয়ে করেছে, চোখে তার রঙিন মধুচন্দ্রিমার রঙ তখনও ফিকে হয়নি, তাহার চোখে তো সকলই নবীন, সকলই বিমল সকলই শ্যামল… এমন সময় সুহাসিনী, সুমধুরভাষিণী, রম্যকপর্দিনী নববধূর কথায় তার মনোজগতে ধেয়ে এলো সে কোন সর্বনাশী ভূমিকম্পের আভাষ? এ কোন সকাল? এ যে ড্রাই ডে”র চেয়েও অন্ধকার..
বিয়ের সবে একমাস হয়েছে, ছুটির দুপুরে দ্বিপ্রাহরিক আহারান্তে দুইজনে কিঞ্চিৎ বুলাদি”র হাডুডু খেলে ক্লান্ত, পরের রাউন্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছেন , এমন সময় সেই সুতনুকার পদ্মডাঁটার মতো হাতখানি আমাদের নাটকের হিরোর বুকে উঠে এলো, ‘তুমি মদ খাও? বাবা বললো যে! ছিঃ। ‘
পাত্রের তো হাতে এলইডি! আর কোথায় কি সেটা বললাম না, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পড়ছে, রামোঃ।
পাত্র কিছু বলার আগেই সেই পদ্মপলাশলোচনা মহিলাটি তাঁর বিপুল আঁখিদুটি পাত্রের মুখের ওপর এনে বললেন, ‘কথা দাও, এক পেগের বেশি খাবে না। আমার ফ্রেণ্ড শকুন্তলা বলেছে যে দিনে এক পেগের বেশি খেলে মানুষ মরে যায়। তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না? বলো, বলো, বলো যে তুমি এক পেগই খাবে এবার থেকে।’
পাত্রটি চ্যাম্পিয়ন সেলসমহারথী, গাঢ় গলায় উত্তর দিলো, ‘হ্যাঁ প্রিয়ে, এবার থেকে আমি এক পেগই কিনবো, এক পেগই খাবো। ত্বমসি মম জীবং ত্বমসি মম… ‘ ইত্যাদি প্রভৃতি…
এইভাবেই চলছিলো, মহিলাও খুশি ছিলেন, আমাদের গল্পের হিরোও তদ্রূপ। কিন্তু একদিন সব পাখি ঘরে আসে, সব সুখের শেষ হয়। আমাদের হিরো একদিন লওওম্বা ট্যুর শেষে ট্রা লা লা লা টিং টং গাইতে গাইতে ঘরে ঢুকে দেখেন যে গিন্নিমা কালবৈশাখীর মত মুখ করে সোফায় বসে।
ততদিনে বিয়ের চার কি পাঁচ বছর হয়ে গেছে। ষোড়শী ত্রিপুরসুন্দরী এখন ভৈরবীরূপেন অধিষ্ঠিতা। গিন্নির মুখ দেখেই কর্তা মনে মনে প্রমাদ গণলেন, মুখে যদিও মধুহাসিটি অমলিন, ‘কি খবর প্রিয়ে?’
শান্ত গলায় ইস্পাতের ছুরির মত ঠাণ্ডা ধারালো প্রশ্ন ভেসে এলো, ‘কত মিলিলিটারে এক পেগ হয়?’
পাত্র বুঝিলেন যে অদ্যই শেষ রজনী। দাবার বোর্ডে আজ তিনি অভিমন্যুসম একাকী , চারিদিকে প্রতিপক্ষের গজ নৌকো ঘোড়া মিলে সপ্তরথীর অক্ষ্মৌহিনী কমপ্লিট। কিন্তু তিনিও উচ্চঘর, সেলসোরাজার বংশধর। তিনি কি ডরান সখা বিবাহিত বৌয়ে? মসৃণভাবে উচ্চাঙ্গের হাসি বিলিয়ে তিনি বললেন ‘আজ হঠাৎ এ প্রশ্ন?’
চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তর এলো, ‘শকুন্তলা ইউ এস থেকে ফিরেছে, আজ দুপুরে বাড়িতে এসেছিল। আমাকে বলে গেছে যে সিক্সটি মিলিলিটারে এক পেগ হয়। আর তুমি…..’ বলে অপরিসীম ঘৃণা সহ একটি নিঃশেষিত পাঁইটের বোতল বিজিতের ছিন্নকন্থাটির ন্যায় তুলে ধরে বললেন, ‘আর তুমি আজ অবধি যে আমাকে বুঝিয়ে এলে এটাই এক পেগ?’
সেই সেলসকুলমার্তণ্ডের খবর জেনে আপনাদের আর লাভ নেই। সে ছোকরা এখন বিলকুল শুধরে গেছে। লেকটাউনের কাছাকাছি কোথাও বউ আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তার সুখের সোমসার। এসব কথা যেন খবদ্দার তাদের কান অব্ধি না পৌঁছয়, এই বলে দিলাম, হুঁ!
দ্বিতীয় গল্প, এটা আমার স্বচক্ষে দেখা। তখন আমি একটি প্রসাধনী-সামগ্রী বিক্রেতা কম্পানীর রিজিওনাল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। প্রথম বছর অকথ্য পরিশ্রমের পর দ্বিতীয় বছরে কিছু ভালো ব্যবসার মুখ দেখেছি। কানাঘুষোয় শুনছি যে সে বছর বেস্ট রিজিওনের অ্যাওয়ার্ড আমাদের কপালে ড্যান্সরত। ফলে ঢাকঢোল পিটিয়ে সেই বছর ইস্টের সেলস কনফারেন্স ফেলেছি রায়চক র্যানডিসন ফোর্টে। আহা, অ্যাওয়ার্ড সেরিমনিটাও ত্যামন জমকালো হওয়া চাই কি না?
