তবে আমার আশ্চর্য হওয়ার আরও বাকি ছিলো। মহিলা আরও বলতে লাগলেন, ‘লেকিন সির্ফ জিম করনে সে নেহি হোগা। আপকো ডায়েটিং ওগ্যারাহ ভি করনা পড়েগা। অয়েলি ফুড ইনটেক ইজ দ্য মেইন রিজন ফর অবেসিটি।’
এইবার আর চুপ থাকা গেলো না, গলা খাঁকড়ে বলতে বাধ্য হলুম, ‘কথাটা কিন্তু উনি খারাপ বলেননি বাবলু, স্পেশ্যালি ওই ওবেসিটির ব্যাপারটা। কথাটা উনি যখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছেন তখন এ বিষয়ে….’
বলেই থমকে যাই। মানে থমকাতে বাধ্য হই বললেই চলে!
বাপ রে! সে কী অগ্নিবর্ষী দৃষ্টি, সে কী ভয়াল কুটিল চাউনি! মনে হচ্ছে আমাকে জ্যান্ত রোস্ট করা হবে নাকি কুচিয়ে ভর্তা করা হবে সে নিয়েই ভদ্রমহিলা সামান্য দ্বিধায় রয়েছেন। নইলে নরকের যে আঁচে আমার ইন্তেকাম হওয়া উচিত, সেখান থেকে একটা জ্বলন্ত নুড়ো এনে এক্ষুনি আমার মুখে গুঁজে দিলে ব্যাপারটা বেশ খোলতাই হতো বলে ওঁর ধারণা। একটু আগেই যাকে হেলেন অফ ট্রয় মনে হচ্ছিলো, এখন তাকে গডেস অফ ভয় বলেই বেশী ঠাহর হতে থাকে।
এতক্ষণে বাবলুকুমারের টনক নড়ে। দু’মিনিটে ফটাফট দেড়শো গ্রাম পনীর ওজন করে, আমার হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে, পেমেন্ট নিয়ে চাপা, খুনী স্বরে দুটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করে, ‘দাদা, ফুটুন।’
আমিও ফুল হয়ে ফুটে যাই। এপ্রিল ফুল হয়ে, এই ঘোর বসন্তেই। প্রেম যে এত হিংস্র আর অসহিষ্ণুহতে পারে তা এদের না দেখলে জানতেই পারতুম না! হায়, এ মৃত্যুউপত্যকা আমার দেশ না…
এই ভাবতে ভাবতে কাউন্টার ছেড়ে চলে আসছি, এমন সময় সেই বাবলুকুমারীর শেষের কথা গুলো শুনে পা’দুটো ভারখয়ানস্কের তুষারাবৃত উপত্যকার বুকে নাছোড় আইস অ্যাক্সের মতই আটকে গেলো।
স্বকর্ণে শুনলাম সেই মোহিনী আমাদের নধরকান্তি নদের নিমাইকে স্বাস্থ্যসম্বন্ধিত সৎপরামর্শ দিচ্ছেন, ‘ব্রেকফাস্টমে ইয়ে সব পুরি সবজি, মিঠাই ওগ্যারাহ খানা বন্ধ করনা পড়েগা বাবলুজী। মতলব আগর আপ ইয়ে রিলেশন কে বারে মে সিরিয়াস হ্যায় তো।’
কোন সে দিগন্তের ওপার থেকে আমাদের ভোলাভালা ছেলেটার বিস্মৃতপ্রায় আবছা স্বর ভেসে এলো, ‘হাঁ হাঁ সঙ্গীতাজী। বোলিয়ে না, কেয়া কেয়া করনা পঢ়েগা। আপকো তো মালুম হ্যায়..’
‘মর্ণিং মে সির্ফ টু স্লাইস ব্রেড, উইদাউট বাটার। উসকে সাথ থোড়াসা কিউকাম্বার অ্যান্ড ক্যারট মিক্স…’
কেউ নিজের পায়ে কুড়ুল মারে, কেউ নিজের পা”টা কুড়ুলের ওপর মারে। ফলাফল একই।
আড়াইশো পনীর আর গাদাগুচ্ছের স্বাস্থ্যসম্মত সবজি সমেত বাড়ি ফিরতে ফিরতে শুনি বাড়ির সামনে কোন বেরসিক হতভাগা মাইকে রোবিন্দসংগীত চালিয়েছে, ‘আহা আজি এ বসন্তে, এত ফুল ফুটে, এত বাঁশি বাজে..এত পাখি গায়…’
বসন্ত, মাই ফুট!
সুরা, নারী এবং সেলসের চাকরি
ক্যাম্পাস প্লেসমেন্টে সেলসে চাকরি পেয় খুবই আনন্দের সঙ্গে খবরটা যখন আমার শ্বশুরমশাইকে সোল্লাসে জানাই, ভদ্রলোক খানিকক্ষণ চুপ থেকে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করেন, ‘সেলস ছাড়া আর কোনও প্রফেশন পছন্দ হলো না বাবা?’
প্রৌঢ় মানুষটির মনোকষ্টের কারণ বুঝতে অবশ্য বেশী দেরি হয়নি। সেলসের লোকেদের নিয়ে প্রচলিত ধারণাই হচ্ছে যে এরা আদ্যন্ত মিথ্যাবাদী, ওভারস্মার্ট, দেখানেপনায় অভ্যস্ত, সুরাসক্ত এবং দুশ্চরিত্র! এমন ছেলে জামাই করে কোন শ্বশুরই বা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন বলুন?
প্রথম তিনটি অভিযোগের কারণ অনুমান করা খুব কঠিন নয়। সেলসের চাকরিতে এত বিচিত্র চরিত্রের লোকের সঙ্গে সদাসর্বদাই ডিল করতে হয় যে একটা বাহ্যিক চালাকচতুরতা এসেই পড়ে। বস্তুত অত্যন্ত সহজসরল মাটির মানুষ হলে সেলসে টিঁকে থাকা একটু মুশকিল। এখানে একটু বাগ্বিস্তারের দরকার আছে। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে সেলসে সফল হতে গেলে এক্সট্রোভার্ট হওয়াটা অন্যতম আবশ্যিক শর্ত। কথাটা আদ্যন্ত ভুল। চালাকচতুর হওয়ার সঙ্গে এক্সট্রোভার্ট বা ইনট্রোভার্ট হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই, আমার দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান সেলস ম্যানেজাররা প্রায় প্রত্যেকেই খুবই ইন্ট্রোভার্ট। কিন্তু তাঁরা অসামান্য ধীশক্তির অধিকারী, যুক্তিতর্কে তথ্যে তত্ত্বে প্রতিপক্ষকে অনায়াসে ফালাফালা করে দিতে সিদ্ধহস্ত। মোদ্দা কথা তুমি তোমার আইডিয়া সামনের লোকটিকে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে বিক্রি করতে পারছো কি না তার ওপরে নির্ভর করছে তোমার সফলতা, তার সঙ্গে মিথ্যাকথা বলার বা দেখানেপনার কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ অন্যকে টুপি পরাতে পারো কি না সেটা ততটা ইম্পর্ট্যান্ট নয়, তোমাকে টুপি পরাবার যাবতীয় প্রয়াস হেলায় এড়িয়ে যেতে পারছো কি না, সেটাই বিশেষ বিচার্য। কামড়াবার দরকার নেই, তুমি যে ফেঁস করতে পারো সেটা জানান দিলেই হবে। আর মিথ্যাকথা বলে সেলস প্রফেশনে আজ অবধি কেউ টিঁকে থাকতে পারেনি, ইন্টিগ্রিটি বা সততা হচ্ছে সেলসে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। আমার অভিজ্ঞতা বলে ডিস্ট্রিবিউটর ও ম্যানেজাররা সেই সেলস অফিসারকেই একমাত্র পছন্দ করেন যে সৎ, পরিশ্রমী, ডেডিকেটেড এবং কমিটেড। মিথ্যাকথা ধরে ফেলতে ঘাঘু সেলস ম্যানেজাররা একমুহূর্তের বেশী সময় নেন না, প্রতিটি সিনিয়র সেলসম্যানেজার লোকচরিত্র চেনার ক্ষেত্রে বড়বড় সাইকোলজিস্ট ও রাজনৈতিক নেতাকে বলে বলে দশ গোল দিতে পারেন।
