একটা জিনিস জানিয়ে রাখা ভালো, এই পাঁচটি জনগণপথই উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। মুম্বই শহরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়া অনেক হ্যাঙ্গাম মশাই। ভাইসি ভার্সা পশ্চিম থেকে পূবেও তাই, তবে কিনা আজকাল একবার পশ্চিমে পাড়ি জমাতে পারলে কেউ পূবে বিশেষ ফিরছে টিরছে না দেখে বাহুল্যবোধে আর উল্লেখ করিনি!
তা এই তিনটি লাইনের মধ্যে অবশ্য ভাবভালোবাসার কমতি নেই। ওয়েস্টার্ন লাইন যেখানে সেন্ট্রাল লাইনের বুকে গুগাবাবার শেষে সন্তোষ দত্তের স্টাইলে ‘দাদারে’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তার নাম দাদর। এখানেই লোকে লাইন চেঞ্জ করে ওয়েস্ট থেকে সেন্ট্রাল বা সেন্ট্রাল থেকে ওয়েস্টে যায়। অতি জনবহুল, ব্যস্ত স্টেশন, তার খ্যাতি লেখার শুরুয়াতেই উল্লিখিত স্লোগানটি শুনে হৃদয়ঙ্গম হবে আশা করি। অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ হলো দাদর থেকে কল্যাণ বা ভিরারের জন্যে ‘ফাস্ট’ ট্রেনে ( কলকাত্তাই ভাষায় গ্যালপিং ট্রেনে) যারা উঠতে পারে, তাদের দুএকজনকে ঠেলেঠুলে অলিম্পিকে পাঠাতে পারলে রেসলিং এ দু চারটে গোল্ড মেডেল নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। তবে নেহাত অলিম্পিক ভিলেজে ভড়া পাও পাওয়া যায় না বলেই হয়তো প্রস্তাবটা খাতায় কলমেই রয়ে গেছে।
হারবার লাইন যেখানে প্রেয়সীর মতন সেন্ট্রাল লাইনের গায়ে সাগর জলে সিনান করা মাথাটা এলিয়ে দিয়েছে, তার নাম কুরলা। এও বেশ জনবহুল স্টেশন বটেক। তবে হারবার থেকে ওয়েস্টার্ন লাইন যাওয়া অবশ্য অনেক হাঙ্গামা। আগে হিসেব করে দেখতে হবে আন্ধেরি কোথায়, বা কুরলা কোথায় থাকতে পারে। তারপর দেখতে হবে ওয়াডালা কই। তারপর দেখতে হবে সেই হিসেব মতন যখন আন্ধেরি কি কুরলা থেকে যখন ওয়াডালা গিয়ে পৌঁছবে, তখন ট্রেন কোথায় থাকবে…
পাতি কথা বলছি দাদা, নেহাত বাধ্য না হলে লোকে অটো নিয়ে নেয়!
মুম্বই লোকালের খ্যাতি অবশ্যই তার ভীড়ের জন্যে। মুম্বই লোকালের ভীড় আধুনিক ভারতের একটি আর্বান লিজেণ্ড বিশেষ। প্রায় আড়াই হাজার লোকাল ট্রেন সর্বসাকুল্যে রয়েছে মুম্বইতে, ভোর চারটে থেকে রাত একটা অবধি চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। রোজ কত লোক যাতায়াত করেন জানেন? মাথাটা চেপে ধরুন, বাঁই করে ঘুরে গেলে কম্পানী দায়ী নহে!
পঁচাত্তর লাখ!
মানে এক বছরে আড়াইশো কোটির একটু বেশি, পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ!
যাকগে, এসব নাম্বারের কচকচি বাদ দিয়ে মুম্বই লোকালের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের গল্পটাই না হয় বলি।
প্রথম যখন এই মহানগরীতে পদার্পণ করি, সেটা ছিল দশ বছর আগে, দুহাজার ছয় সালে, সামার ট্রেনিং নিমিত্ত। তা প্রথম দিন তো এয়ারপোর্ট থেকে নেমে সোজা অফিসে গেছি। আমাকে আমার তদানীন্তন বস তথা গাইড বললেন যে ‘ভাইটি, কাল সকাল দশটা নাগাদ ঘাটকোপার থেকে ট্রেন ধরে সিএসটি এসো। কোলাবা মার্কেট ভিজিটে যাবো’। তা আমিও তো সুবোধ বালকের মতন পরের দিন ছানটান করে চুল আঁচড়ে খেয়েদেয়ে, ঘাড়েমুখে পাউডার বুলিয়ে স্টেশনে গিয়ে তো হাজির।
গিয়েই দেখি, উরিত্তারা! ই কি? সারা স্টেশন জুড়ে থিকথিক করছে লোক, কিলো কিলো প্যাসেঞ্জার মশাই ! দুর্গাপুজোয় অষ্টমীর দিন সুরুচি সঙ্ঘ আর একডালিয়া এভারগ্রীনের মিলিয়ে যা ভীড় হয়, তার চারগুণ বললেই চলে। অফিস টাইমে শ্যালদা দেখেছি, এ তো তার এককাঠি নয়, রীতিমতো একবাঁশ ওপরে!
তা ভাবলুম হয়তো কোথাও কোনও জনসভাটভা আছে। এই ট্রেনটা ছেড়ে দিই, পরেরটায় বেশ আয়েশ করে যাবো না হয়।
তা তিনি এলেন। আগমন নয়, আবির্ভাব বললেই চলে। তিনি আসছেন এই খবর চাউর হতেই লোকজন দেখি সব স্ট্র্যাটেজিক পজিশন নেওয়া শুরু করেছে। সে কি একাগ্র লক্ষ্য, সে কি একরোখা তেজী ভাব, সে কি ভীতিপ্রদ চাউনি, দেখলে ভয়, ভক্তি, শ্রদ্ধা তিনটেই জাগে।
তা তিনি যখন এলেন, ও হরি দেখি তিনিও তদ্রুপ! ট্রেনের কামরার ভেতরে থিকথিক করছে লোক। বেশ কয়েকজন বাইরেও ঝুলছে। দুএকজনকে স্পষ্ট দেখলুম কোনও অবলম্বন ছাড়াই ঝুলতে, ভেতর থেকে কেউ কলার ধরে টেনে রেখেছে, তাই বাঁচোয়া!
এইবারে আমার মনে গূঢ় চিন্তার উদয় হলো। সহৃদয়া পাঠিকা জানেন, চিরকালই পরের জন্যে আমার প্রাণ কাঁদে। ভাবলাম, তাই তো, এইবার এই এত লোক যাবে কি করে? অনেকেরই তো আর্জেন্ট কাজও থাকতে পারে। ইনটারভিউ, হাসপাতাল, মিটিং, ইলেক্ট্রিক বিল, বসের বাড়ির বাজার করে দেওয়া, মায় গার্লফ্রেণ্ডের সঙ্গে ডেটিং অবধি, কিছু না কিছু তো আছেই।
ও মা, ভাবতে ভাবতেই দেখি মিনিটের মধ্যে সেই এক প্ল্যাটফর্ম লোক দিব্যি ট্রেনের মধ্যে সেঁধিয়ে প্ল্যাটফর্ম পুরো ফরসা, ট্রেনও দেখি সেই কলারের ওপর ভরসা করে ঝুলতে থাকা ছোকরাকে নিয়ে ধাঁ! যদি ওই এক প্ল্যাটফর্ম ভর্তি লোক যদি ট্রেনের মধ্যে সেঁধুতে পারে তাহলে ট্রেনের ভেতর কারা ছিল? যদি ওই ট্রেনে ভর্তি লোকই থাকবে তো প্ল্যাটফর্মে কারা ছিল? তিনকেজির বিড়াল যদি এককেজি মাংস খাওয়ার পরেও যদি তার তিনকেজি ওজন হয় তাহলে মাংসটা গেলো কই? ডিমনির পরেও যদি সেই পুরো পনেরো হাজার কোটিই ফিরে আসে তাহলে ব্ল্যাক মানি….
খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে চেয়ে থাকার পর বুকে একটু নিশ্চিন্দির ভাব এলো। যাক, প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম, পরের ট্রেনে উঠতে কষ্ট হবে না। কিন্তু…দেড় মিনিট। ঠিক দেড় মিনিট। ফের পিলপিল করে লোক এসে ঘাটকোপার স্টেশন যেন ব্রিগেডের জনসভা!
