খুব স্টাইলে তার দিকে দেড়শো টাকা এগিয়ে দিয়ে বীরদর্পে ওয়েট করতে লাগলাম। দেখি, লোকটা কোথা থেকে শুরু করে।
তা লোকটা শুরু করলো বটে। টাকাটা নিজের ওয়ালেটে ঢোকালো। তারপর একটা কুড়িটাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘তিন রুপেয়া দে রাঁহা হুঁ’!!
ঘোর কাটতে আমার বেশ কিছু সময় লেগেছিল!
না, যতটা পাষণ্ড আমাকে দেখায় ততটা আমি নই। সেই তেইশ টাকা তাকে দিয়ে এসেছিলাম, টিপস হিসেবে। নিজে যা লজ্জা পেয়েছিলুম সে কথা না হয় থাক!
ঘটনা দুইঃ এটি আমার এক বন্ধুর কাছে শোনা। ইনি একটু অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ বলে কুলোকে এঁকে চালবাজ, ঢপমাস্টার, বখতিয়ার খিলজি ইত্যাদি নানাবিধ অন্যায্য আখ্যায় ভূষিত করে থাকেন। গল্পটা তাঁর জবানীতেই বলি। বাই দ্য ওয়ে এতে কিন্তু মুম্বাই অটোর গুণগান নেই, নেহাতই গল্প।
‘থাট্টি ফাস্টের নাইট বুঝলি। বিকেল নাগাদ আমার গাড়িটা নিয়ে তিন বন্ধু বেরিয়েছি। প্রথমে গেলাম মেরিন ড্রাইভ, সেখানে চৌপাট্টিতে বসে একটা ফুল বিপি নামালাম। তারপর সেখান থেকে কোলাবা, প্যরামাউন্ট বার। সেখানে তিনজনে তিন তিরিক্কে ন’টা ট্যাকিলা শট মেরে খানিকক্ষণ উদমা নাচলাম। তারপর আবার ড্রাইভ করে আন্ধেরি, সেখানে আহলুওয়ালিয়ার বাড়ির পার্টিতে। সে ব্যাটা আমার জন্যেই নাকি ভালো স্কচ আনিয়ে রেখেছিল, আর তুই তো জানিস স্কচ আমার একমাত্র দুর্বলতা। তবে বেশি না, পাঁচ পেগের থেকে এক ফেঁটা বেশি খাইনি, একথা আমি হলফ রেখে বলতে পারি। যাই হোক, তারপর ঘাটকোপারে নাইট ক্যুইন ডিস্ক।
সেখানে কার সঙ্গে গেসলুম আর কি কি খেয়েছি, সত্যি কথা বলতে কি ভাই একদম মনে নেই। ইন ফ্যাক্ট কি কি করেছি তাও যে মনে আছে বিশেষ তাও নয়। শুধু খেয়াল হলো যে রাত প্রায় বারোটা বাজে, আর ঠিক এইসময় মুম্বাই পুলিশ সবকটা মোড় নাকাবন্দি করে আর মাতাল ড্রাইভার ধরে। একবার ধরতে পারলেই চিত্তির। ব্রেদ অ্যানালাইজার নিয়েই দাঁড়ায়, আর সুমুন্দির পো’দের কোনও মায়াদয়া নেই। কোনও পলিটিকাল দাদাকে ধরে কিছু করা যায় না, স্রেফ শ্রীঘর। আর আমার যা অবস্থা, ব্রেদ অ্যানালাইজারের দরকার নেই, দেখলেই বুঝতে পারবে যে আমি এখন উড়ছি। পা দুটো যে এখনও মাটিতে লেগে আছে সেটা কিঞ্চিৎ স্বকৃত পাপের ফল বৈ আর কিছু নয়।
এসব ক্ষেত্রে রিস্ক নেয় আহাম্মকরা। অনেক ভেবে দেখলাম যে আমি অনেক কিছু হতে পারি, কিন্তু আহাম্মক নই। ফলে একটা অটো নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
রাস্তায় যেতে যেতেই বুঝলাম আমার অনুমান কত নির্ভুল। প্রতিটা মোড়ে মোড়ে মামু দাঁড়িয়ে, প্রাইভেট কার দেখলেই ‘থাম্বা রে থাম্বা’ করে এগিয়ে এসে খপাৎ করে জাল ফেলছে আর ড্রাঙ্ক ড্রাইভার তুলছে। অটো, বা ট্যাক্সি বা হায়ার্ড ক্যাবগুলোকে অবশ্য কিছু বলছে না, জানে যে সওয়ারি মাতাল বলেই গাড়ি বা অটো ভাড়া করেছে।
আমি তো ভাই দেখেশুনে বুঝলাম কি বাঁচান বেঁচে গেছি। এই অটো না থাকলে আজ আমি এতক্ষণে থানায় বসে হাপু গাইছি।
মুশকিল হলো সকালে, বুঝলি। খোঁয়াড়ি কাটার পর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে অটোটাকে দেখে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না যে অত রাতে অটো চালিয়ে আমি এতটা রাস্তা এলাম কি করে?
আর তার থেকেও বড় কথা, অটোটা কার!’
মুম্বাইয়ের অটো নিয়ে তো শুনলেন। এবার শুনুন মুম্বাইয়ের লাইফলাইন, লোক্যাল ট্রেনের কথা।
মুম্বই মহানগরীর প্রাণভোমরা হচ্ছে তার লোকাল ট্রেন সার্ভিস। দুরন্ত গতিময় এই শহর কখনও থামে না এমনিতে, সে সন্ত্রাসবাদী হামলাই হোক আর অতিবর্ষণ। কিন্তু যদি লোকাল ট্রেন থেমেছে, তো ব্যাস,আকা মুম্বই বন্ধ, বিড়ু ! লোকাল হলো মুম্বইএর লাইফলাইন, সাতরাজার ধন এক মাণিক, অন্ধের যষ্টি, বুকের পাঁজর। মুম্বাই লোক্যালের স্পিরিটভোমরা ধরা আছে এই বিজ্ঞাপনী প্যারডির মধ্যে,”ডর কে আগে জিত হ্যায়/ দাদর কে আগে সীট হ্যায়”
ঢাকার আয়ুর্বেদিক ঔষধালয় দেখে নাকি জনৈক বিবসনা সাধু অত্যাশ্চর্য একটি মন্তব্য করেছিলেন, ‘অ্যায়সা কাম সত্য ত্রেতা দ্বাপরমে কোঈ নেহি কিয়া’, এই ঘোর কলিতেই প্রথম। মুম্বই লোকালের মতন এমন বহুবর্ণ বিচিত্র প্রতিষ্ঠান দেখে তিনি কী বলতেন সে ভাবতেও রোমাঞ্চ জাগে। মুম্বাই লোকাল ট্রেন নিয়ে মহাকাব্য লেখা যায়। চলমান ভারতবর্ষ বলতে যদি কিছু বোঝায় তো তার নাম মুম্বাই লোকাল।
ইতিহাসের জানকারি রাখনেওয়ালা প্রাজ্ঞ জনগণ নিশ্চয়ই জানেন ভারতবর্ষে প্রথম ট্রেন চলে মুম্বইতে, ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস বা ভিটি (তখন নাম ছিল বোরি বন্দর) থেকে থানে অবধি। অবিশ্যি সে রামও নেই, অযোধ্যাও নেই। ভিটির নাম পালটে হয়েছে সিএসটি, ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস। কুলোকে অবশ্য বলে এটাই ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সেক্স চেঞ্জ অপারেশন, তবে সে কথায় কান না দেওয়াই মঙ্গল। এই লাইনটি বর্তমানে সেন্ট্রাল লাইন বলে পরিচিত।
আগেই বলেছিলাম, তিনটি লোকাল লাইন আর দুটি এক্সপ্রেসওয়ে, এই পঞ্চপাণ্ডব মিলে মুম্বইয়ের ভূভার বহন করেন। এদের মধ্যে বয়সে ও পদমর্যাদায় সেন্ট্রাল লাইন হলেন নৈকষ্যকুলীন। এর পর আছেন ওয়েস্টার্ন লাইন, মুম্বইয়ের পশ্চিম দিক দিয়ে। এঁয়ার দৌড় চার্চগেট থেকে ভিরার অবধি। আর নবীনতম সদস্য হচ্ছেন হারবার লাইন, নভি মুম্বইবাসীদের জন্যে। এঁর বিস্তার সিএসটি থেকে পানভেল অবধি।
