কবি লিখেছিলেন আধুনিক জীবনে মানুষের শোকের আয়ু দেড়দিন। মানুষের সুখের আয়ু যে দেড় মিনিট, সেটা কেউ কোথাও লিখে যাননি। লিখে রাখা উচিৎ ছিল! এর পর কি করে অকুস্থলে পৌঁছই তার বিবরণ চেয়ে সুধী পাঠিকা আমাকে বিপদে ফেলবেন না বলেই বিশ্বাস রাখি!
মুম্বই লোকালের প্রতিটি কামরা আদতে এক একটি মিনি ভারতবর্ষ। সুবেশ টাইধারী বাঙালি কর্পোযুবার পাশেই দেখবেন প্রৌঢ় গুজরাটি শেয়ার ব্রোকার, মালয়ালী দোকানদারের পাশে আধঘুমন্ত বিহারি ড্রাইভার, মারাঠি গৃহপরিচারিকার কোল ঘেঁষে পাঞ্জাবী উঠতি অভিনেত্রী। ভাষা, ধর্ম, জাতি, সংস্কৃতি, জীবিকা সবকিছু দিয়ে সঞ্জীবিত বহুবিচিত্র ভারতভূমির এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর কোথাও পাওয়া যায় না বলেই বিশ্বাস। কার ঘাম কার ঘাড়ে, কার আঙুলের ওপর কার পা, কার কাঁধে কার মাথা বোঝা দায়। আর মুম্বই এর যা বৈশিষ্ট্য, কেউ কারো পারসোনাল স্পেসে হানা দেয় না। কলকাতার মতন এখানে সম্পূর্ন অনাত্মীয় সহযাত্রীর সঙ্গে ধোনির রিটায়ারমেন্ট টু ডিমনিটাইজেশন, সারদা টু শ্রীরামকৃষ্ণ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ভাবাই যায় না! ওই প্রচণ্ড চাপাচাপি গরমে বেশিরভাগই মোবাইলে গান শুনছে, বা গেম খেলছে বা ফেসবুক করছে দেখতে পাবেন। বৃদ্ধারা হয়তো বাবা রামদেবের জীবনচরিত পড়ছেন, তার পাশের উদ্ভিন্নযৌবনা খুকিটি হয়তো পেন্টহাউস লেটার্স, কারোরই কিছুতে কিছু এসে যায় না! বিগতযৌবন লোকটি হয়তো খবরের কাগজে মন দিয়ে শেয়ারের ভাও দেখছেন, সেই পেপারেরই পাশের পেজে মল্লিকা শেরাওয়াতের স্বল্পবসনা ছবিতে মগ্ন এক ইউপি’র যুবক, এ খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। এহ বাহ্য, আমি নিজে স্বচক্ষে চিঁড়েচ্যাপটা ভীড় ট্রেনে এক স্থূলাঙ্গী মারাঠি মহিলাকে সিটে বসে বাড়ির আনাজপাতি কাটতে দেখেছি, অন্য পরে কা কথা! মোটমাট মুম্বই লোকালে পূজা-নমাজ, শৌচকার্য আর নিজ পার্টনারের সঙ্গে ঝিঙ্কুলুলুটুকুই যা করা যায় না আর কি!
মুম্বইয়ের জীবনযাপনের এক অন্যতম লক্ষণ হলো নন-ইন্টারফেয়ারেন্স। কেউ কারও বিষয়ে আগ বাড়িয়ে উদগ্র কৌতূহল প্রকাশ করতে যায় না। লিভ অ্যান্ড লেট লিভ, তুমি কি আমার পর? এই হচ্ছে মুম্বইয়ের আত্মার মূল কথা। মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেনও তার ব্যত্যয় নয়। এই প্রসঙ্গে পড়ে গেলো, আমার এক মুম্বইবাসী বন্ধু কর্মব্যপদেশে একবার কলকাতা যান, ডেরাডাণ্ডা বাঁধেন পিয়ারলেস ইনে। তা কোনও এক মিটিঙে তাঁকে যেতে হবে সল্টলেকে, এদিকে শখ কলকাতার মেট্রো চড়বেন। আমি মশাই ভারি পরহিতৈষী মানুষ, একবার জিগাতেই এসপ্ল্যানেড থেকে মেট্রোতে শোভাবাজার, আর তারপর সেখান থেকে অটো ধরে উল্টোডাঙা হয়ে কি করে সল্টলেক যাওয়া যায় বাতলে দিলুম।
তা সন্ধ্যেবেলা যখন তত্ত্বতালাশ নিচ্ছি, তিনি ভারী গোমড়ামুখে বললেন ‘তোমরা বাঙালিরা কার্টেসি জানো না।’
এই রে! হঠাৎ এহেন অভিযোগ?
জিজ্ঞাসাবাদের পরে প্রকাশ পেলো, তিনি এসপ্ল্যানেডে উঠেই দরজার পাশে একটা সিট পেয়ে সেখানে জমিয়ে বসে নিজের প্রেয়সীকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি রগরগে মেসেজ করছিলেন। অনেকটা লিখে ফেলার পর হঠাৎ কাঁধে একটা টোকা পেয়ে চমকে দেখেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক তাকে ডাকছেন। ‘ইয়েস, হোয়াট হ্যাপেন্ড’ এর উত্তরে সেই ভদ্রলোক জানান যে তিনি একজন প্রাইভেট টিউটর এবং বন্ধুবর এতক্ষণ যা যা লিখেছেন তার গ্রামারে নাকি গণ্ডাখানেক ভুল! আর ম্যাস্টারবেশন শব্দটার স্পেলিং কি করে এক নব্যযুবা ভুল করতে পারে সেটা উনি ভেবেই পাচ্ছেন না! হতভম্ব বন্ধুটি কিছু জবাব দেওয়ার সুযোগই পাননি, কারন এর পরই নাকি আরেক ভদ্রলোক, যিনি নিজেও লেখাটা ওঁর ঘাড়ের ওপর দিয়ে পড়ছিলেন, তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ওল্ড ইংলিশ স্পেলিং অ্যান্ড নিউ ইংলিশ স্পেলিং নিয়ে কামরাতে ধুন্ধুমার বেঁধে যায়! শেষে দুজনেই পরস্পরের দিকে যথাক্রমে নেসফিল্ড এবং রেন অ্যান্ড মার্টিন ছুঁড়ে মারলে সেদিনকার মত ঝগড়ার ইতি হয়!
মুম্বইতে আর একটি ভারী ভালো অভ্যাস আছে। চট করে এখানে রাস্তা, স্টেশন ইত্যাদির নামকরণ করা হয় না। একেবারে যে হয়না তা নয়, তবে কলকাতায় যেমন আপনি রাত্তিরে কলু মিস্ত্রি লেনে ঘুমোতে গেলেন, আর সকালে উঠে দেখলেন তার নাম বদলে হয়েছে দেশবরেণ্য লোকনায়ক মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত সরণি, এখানে তেমন এপিডেমিক হারে হয় না। রাজনৈতিক নেতাদের হুঁশপর্ব কিছু আছে, বেকার অপ্রয়োজনীয় কাজে ত্যানা প্যাঁচান না। সাকি নাকা বোধহয় সেই আদি অনন্ত কাল থেকেই সাকি নাকা। মালাড বা ভিরার অথবা পাওয়াই এর নাম বোধহয় গত একশো বছরে বদলায় নি। কোলাবা কি মালাবার হিলসের উল্লেখ তো বোধহয় ঋকবেদেও পাওয়া যাবে বলে আমার সন্দেহ! মুম্বই বোঝে এসব ফালতু কাজে দিমাগ না লাগিয়ে শেয়ার বাজারে লাগালে বরং দুটো পয়সা ঘরে আসে। নইলে নিদেনপক্ষে অন্তত মাটুঙ্গার নাম বদলে কি বালাসাহেব ঠাকরে ধরণী করা যেত না?
তা যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোন নামই বজায় আছে, মাঝেমধ্যে একই স্টেশনের নাম তিনটে বিভিন্ন ভাষায় শুনলে চমক লাগে। যেমন যে স্টেশনের নাম ইংরেজিতে স্পষ্টাক্ষরে ঙ্কাত্বন্ডননত্থ লেখা আছে, ও আপনি বাইকুল্লা বাইকুল্লা জপতে জপতে বলে নামবেন বলে রেডি হচ্ছেন, তার নাম অ্যানাউন্সড হলো ‘ভায়খালা’, ওটাই আদত মারাঠি উচ্চারণ কি না! তারপর ধরুন সায়ন। ইংরেজিতে বলে সিয়ন, হিন্দিতে সায়ন, মারাঠিতে শীন! আর তো আর, বহুখ্যাত বান্দ্রা স্টেশনের নামই তিন আলাদা উচ্চারণে শুনতে পেয়ে রীতিমতো আমোদ পেয়েছিলুম মনে আছে, বান্দ্রা, ব্যান্ড্রা, ওয়ান্দ্রে!
