রান্নাঘর থেকে গিন্নি বেরিয়ে এসে একটা কাঁসার বগি থালার ওপর ইয়াব্বড়বড় খান পাঁচেক ফুলকো লুচি রেখে গেলেন, সঙ্গে বড় জামবাটিতে কুচো নারকেল দিয়ে ছোলার ডাল। ফলে হাসিমুখে গিয়ে বসতেই হলো,কারণ লুচি ঠাণ্ডা করে খেলে কুম্ভীপাক নরকে পার লুচি একশো বছর করে এক্সট্রা খাটতে হয় বলে শাস্ত্রে স্পষ্ট নির্দেশ আছে না? গিন্নি রান্নাঘরে চলে যাবার আগে গলদার মালাইকারির কথাটা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করাতে উনি চাপা গলায় ‘হ্যাংলা বাঙাল’ টাইপের কিছু একটা বলে গেলেন বলে মনে হলো, তবে কি না সেটা আমার শোনার ভুলও হতে পারে। যাগগে যাক… খাওয়াদাওয়াতে, যাকে বলে অত্যন্ত অভিনিবেশ সহকারে মন দিলাম।
তা ঘন্টাখানেক বাদে, যখন সেই চিংড়ি-চিকেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে মুখ তুল্লুম, আমার স্নেহময়ী শাশুড়ির মুখে একটা সস্নেহ প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি, যেন রেমব্রাঁ ওনার আঁকা ”নাইটওয়াচম্যান” দেখে অভিভূত এক গুণমুগ্ধ কলারসিকের অভিবাদন প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করছেন। থালার দিকে তাকিয়ে দেখি গলদার খোসাটা, আর চিকেনের ঠ্যাঙগুলো ছাড়া থালা পুরো আয়নার মতন চকচক করছে। বেগুনভাজার খোসাটার চিহ্ন অবধি নেই। লুচির কথা ছেড়েই দিন। আড়চোখে দেখলুম গিন্নি থমথমে মুখে রান্নাঘরে ময়দা মাখতে বসেছে!
ইত্যাদির পর পরিতৃপ্তি সহকারে ড্রয়িংরুমে এসে বসেছি। শ্বশুরমশাই ভারি খুশি হয়ে আমার খাওয়াদাওয়ার প্রশংসা করছেন, ‘বুঝলে হে, আমরা যকন ইয়াং, ছিলুম, রোজ হেদোতে সাঁতার কেটে, বুইলে কি না, কারবালা ট্যাঙ্কের বাড়িতে ফিরে অ্যাই একধামা নুচি স্রেপ কাঁচানঙ্কা দিয়ে মেরে দিতুম, বুইলে কি না? তাপ্পর রাত্তিরে….’। শুনেই বাবার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো, শুধু হেদোর বদলে ষষ্ঠীপুকুর, কারবালা ট্যাঙ্কের বদলে শিবপুর, একধামা নুচির বদলে একথালা ভাত আর কাঁচানঙ্কার বদলে গিমা শাক ভাজা, এইটুকুই যা তফাৎ!
এমন সময়ে গিন্নি ময়দামাখা হাত ধুয়ে বড় একটা রূপোর বাটিতে পায়েস এনে হাজির। হালকা বাদামী ক্ষীর দিয়ে বানানো পায়েস, ওপরে পেস্তা আর কাজু কিশমিশ বেশ আমন্ত্রণমূলক ভাবেই শুয়ে আছে। আমার তো মনে হলো ওখানেই গিন্নিকে কোলে তুলে ট্যাঙ্গো ট্যাঙ্গো জিঙ্গো জিঙ্গো গাই আর কি। নেহাত ব্যাপারটা শউরমশাই ততটা পছন্দ করবেন না হয়তো… বলে আনমনে ভাবতে ভাবতে এক চামচ মুখে দিয়েই…
ইররক..গ্লুলুস..ঘিঁআও…খ্যাঁকখক..
পুরো আগুনে গরম! মনে হলো একটা মিষ্টি লাভাস্রোত যেন জিভের ওপর খেলে বেড়াচ্ছে! পুরো শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা, ফেলতেও পারছি না, গিলতেও পারছি না। সবাই বিলক্ষণ শশব্যস্ত হয়ে পড়লো, হ্যা হ্যা করছি, গিন্নি একটা খবরের কাগজ নিয়ে দ্রুত হাওয়া আর দাঁত কিড়মিড় কচ্চেন, শাশুড়িমা খুবই উদ্বেগের সঙ্গে ‘আহা, একটু রয়েসয়ে খাবে তো’ টাইপের কিছু একটা বলার চেষ্টা কচ্চেন, এমন সময়ে আমার কন্যারত্নটি ন্যায্য উদ্বেগে ফেটে পড়লেন, ‘সবেতে তাড়াহুড়ো করা তোমার স্বভাব। জল ঢেলে খাও নি কেন? নীট খেতে কে বলেছিল তোমায়? সবেতে ওস্তাদি’।
পরের কথা এহ বাহ্য। সেদিনই ফিরে এসে গভীর রাতে আমার বসকে মুম্বাই যাবার ব্যাপারে গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে দিই। জামাইষষ্ঠী চুলোয় যাক, ইজ্জতে গ্যামাক্সিন না পড়লেই হলো।
যদ্দিন না এ মেয়ের জ্ঞানগম্যি হচ্চে, তদ্দিন হেথা নয়, হেথা একদম নয়, অন্য কোথাও, অন্য যে কোন খানে!
তবে মুম্বাই এসেই বুঝেছিলাম যে এ ভারি ভালো শহর।
আগেই বলেছি যখন নিতান্তই দৈবদুর্বিপাকে এই মহাদ্রুমের পক্ষপুটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই, তখন যা মনের অবস্থা ছিল সে কহতব্য নয়। সে শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা, রানী পদ্মিনীর জৌহরব্রত আর নেতাজী সুভাষের মহাভিনিষ্ক্রমণ একসঙ্গে মিলিয়ে তার সামান্য আইডিয়া হলেও হতে পারে। যাবার সময় এয়ারপোর্টে বসে ঠিক ক’মাস অন্তর অন্তর কলকেতা শহরে একবার ঢুঁ মারলে কলজেটা ঠাণ্ডা হবে সেই হিসেব কষতাম। বসের মুখটা মনে পড়লেই মনে ‘ধনুর্দর আছ যত, সাজ শীঘ্র করি চতুরঙ্গে, রণরঙ্গে ভুলিব এ জ্বালা, এ বিষম জ্বালা যদি পারি রে ভুলিতে’ গোছের কুচিন্তা মনে উদয় হত। আরসালান, দুর্গাপুজো আর ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে মুম্বাই যায় কোন আহাম্মক?
কিন্তু কবি বলে গেছেন দৈব, দৈবই সর্বত্র প্রবল। নইলে যে লোকটা বস হিসেবে দিব্যি তিন বছর শরিফ মেজাজে আমার দেখভাল করেছে, প্রোমোশন দেওয়ার নামে এমন লেঙ্গিটা সে আমাকে মারবে কেন?
তবে মুম্বাই যে আগে আগে আসিনি তা নয়। তবে কি না সে ছিল নেহাতই দীঘির পাড়ে জল তুলতে এসে নির্দোষ আঁখমিচোলি খেলা, প্রাজ্ঞজনেরা ম্লেচ্ছ ভাষায় যাকে বলেন ফ্লার্টিং। সকাল সকাল আর্লি মর্নিং এসে, মিটিং সেরে রাতের ফ্লাইট ধরা।
কিন্তু সেইবারই মুম্বাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেঁড়েমুষে সংসার করতে আসা!
প্রথমে এসে উঠলাম কম্পানির গেস্টহাউসে। এমনিতে গেস্ট হাউসে টানা এক সপ্তাহের বেশি থাকার নিয়ম নেই। কিন্তু হেড অফিসে অ্যাডমিন দেখতেন এক উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা কাজলনয়না সুতনুকা। আর আমি যে কিরকম হ্যাণ্ডসাম, হেঁ হেঁ, বলতে লজ্জাই লাগছে আর কি, সে তো আপনারা জানেনই! ফলে সাড়ে তিনমাস দিব্য কাটিয়ে দিয়েছিলুম সেখানে। শেষে অবশ্য একদিন বলপ্রয়োগের আভাস পেয়ে ঠাঁইনাড়া হতে বাধ্য হই, কিন্তু সে আরেক গল্প।
