যে এলাকায় শেষ পর্যন্ত ডেরাডাণ্ডা বাঁধি তার নাম পাওয়াই, সেন্ট্রাল লাইনে।
এখানে এই সেন্ট্রাল লাইন বিষয়টা ভালো করে না বোঝালে বাকিটা প্রণিধান করতে অসুবিধা হবে।
মুম্বাইতে এই সেন্ট্রাল লাইন, ওয়েস্টার্ন লাইন, ইস্টার্ন এক্সপ্রেসওয়ে, ইত্যাদি হচ্ছে বর্গীজীবনের অর্গি, চলাচলের পক্ষে এগুলি ছাড়া নান্য পন্থা বিদ্যতেহনায়ঃ। শাস্ত্রে বলে মহাজন যেন গতঃ স পন্থা, মহাজন (ক্রেডিট কার্ড কম্পানি নয়, মহৎ জন) যে রাস্তায় গেছেন সেটাই রাস্তা। মুশকিল হচ্চে মুম্বাইতে মহাজন, হীনজন, বজ্রজন সব্বার গতি ওই এক, তিনটি রেল লাইন, আর দুটি এক্সপ্রেসওয়ে। এদের নিয়ে না হয় আরেকদিন গপ্প করা যাবে। আজকের টপিক অন্য।
মুম্বাই শহর কখনও থামে না, এ কথা শুনে শুনে আপনারা হেজে গেছেন। তবুও আরেকবার শুনুন, কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আমরা যারা ”পেনসনার্স সিটি” কলকাতা থেকে আসি, তারা প্রথমে এই অবিশ্রান্ত কর্মপ্রবাহ দেখে ঘাবড়ে যাই। এখানে বাজে কথা, বাজে সময় নষ্ট, এসব নিষেধ। এর সুফল কুফল দুইই আছে, বারান্তরে প্রকাশ্য।
যে কোনও শহরে নেমে সেই শহর সম্পর্কে প্রথম ধারণা হয়ে সেই শহরের ট্যাক্সি আর অটোওয়ালাদের আচরণ দেখে। ‘চেন্নাই কেমন লাগছে’ জিজ্ঞেস করুন চেন্নাইতে প্রথমবার পা রাখা যে কোনও লোককে, প্রথমেই চেন্নাইয়ের অটোওয়ালাদের উর্ধতন চৌদ্দ পুরুষের গুষ্টির তুষ্টি করে দেবে, বক্তার অপভাষা প্রয়োগে কিঞ্চিৎ প্রারব্ধ সঞ্চিত ব্যুৎপত্তি থাকলে সেই অটোওয়ালাদের উর্ধতন চৌদ্দ নারীর উদ্দাম লিবিডোর কাহিনীও শুনে ফেলতে পারেন। এককালে কলকাতার এয়ারপোর্টের আর হাওড়া রেলস্টেশনের ট্যাক্সিওয়ালাদের এই দুর্নাম ছিল। গত বছর পাঁচেক ধরে অবিশ্যি দেখছি ব্যবস্থাটা অনেক শুধরেছে।
এ বিষয়ে মুম্বাইয়ের অটো বা ট্যাক্সিওয়ালারা একশোতে একশো দশ পাবে। এমন ভদ্র, বিনয়ী, সৎ জনসেবক চট করে দেখা যায় না। বাকি দেশ তো ছেড়েই দিলাম, বিদেশেও এর জুড়ি মেলা ভার। না না, ব্যাজস্তুতি করছি না, ঘডনা পুরাই হইত্য!
পুরো মুম্বাই শহরেই একটি ব্যবহারিক সততা কাজ করে। এ জিনিস কলকাতা বা দিল্লিতে হয় না। ছ্যাঁচড়াপনা জিনিসটা খুব সম্ভবত পূর্ব ও উত্তরভারতের একচেটে। তিন বছর হয়ে গেলো মুম্বাইতে, সর্বত্র দেখেছি একটি স্বাভাবিক ন্যায়ের সার্বিক ধারণা সর্বদা ক্রিয়াশীল। দু চার টাকা অবৈধ উপার্জনের জন্যে জালিয়াতি বা চোখরাঙানি এখানে ভাবাই যায় না, না আছে লোকের প্রবৃত্তি, না সময়! অটো চড়লেও আপনি এ জিনিস দেখতে পাবেন। মোটামুটি ভালো থেকে বেশ ভালো সিট, ব্যবহার অতি ভদ্র, মিটারও একদম ঠিক, আজ অবধি মুম্বাই অটোর কোনও বেচাল পাইনি। যেখানে বলবেন সেখানে নিয়ে যাবে, ‘আজ আমার পেট খারাপ/ ওদিকে জুজু আছে, যাবো না/ আজ মাসির ননদের সেজোমাসির ভাশুরপোর বিয়ে, আমি নিতবর সেজেছি’ গোছের অপযুক্তি দেবে না। পঞ্চাশ টাকার ভাড়া উঠলে পাঁচশো টাকা দিন, তৎক্ষণাৎ খুচরো পাবেন, কলকাতার অটোমহাত্মনদের মতন প্রাকৃত ভাষায় অতি উচ্চাঙ্গের খেদোক্তি শুনতে হবে না। এই কাস্টমার সেন্ট্রিসিটি বা উপভোক্তামুখিনতায় মুম্বাই শহর কলকাতা সহ দেশের বাকি সমস্ত মেট্রোকে বলে বলে দশ গোল দেবে। এ জিনিস আপনি আপনার আদ্যন্ত কলকাতা প্রেমরসে ভিজিয়ে তার সঙ্গে মার্কের ক্লাস স্ট্রাগল আর গৌতম বাবুর সাব অল্টার্ন থিওরি পাঞ্চ করেও এক্সপ্লেইন করতে পারবেন না, কারণ কলকাতার অটো/ট্যাক্সিওয়ালা আর মুম্বাইয়ের অটোওয়ালাদের আর্থিক অবস্থা, সমাজ সচেতনতা, ক্লাস আইডেন্টিটি কিন্তু একই। তফাৎ এই যে আইন ভাঙ্গলে আপনি কারও পেছনে পার্টিশাসনের বরাভয় হস্ত উদ্যত করেছেন, আর কারও পেছনে ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের ডাণ্ডা। ফলাফল দেখতেই পাচ্ছেন।
মুম্বাইতে এক্স্যাক্ট কত অটো চলে বলা মুশকিল। মোটামুটি দেড় লাখ মতন অটো তো চলেই। কল্যাণ অ্যান্ড নভি মুম্বাই ধরে নিলে সংখ্যাটা ২ লাখের কিছু বেশি দাঁড়ায়। আর এখানে শেয়ার অটো বলে কিছু নেই, সবই মিটারে চলে। প্রথম আট কিলোমিটার আঠেরো টাকা, পরে প্রতি চার কিলোমিটারে দু টাকা। একটাকাও হতে পারে, ঠিক মনে নেই। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে দেখেছি যে মুম্বাইয়ের অটোওয়ালারা একটাকা দুটাকা কিছু মান্য করেন না। প্রথম প্রথম কলকাতা থেকে গিয়ে এটা খুব অদ্ভুত লাগতো। কলকাতায় অটো/ট্যাক্সিওয়ালারা যেমন যাত্রীরা একটাকা দুটাকা না দিতে পারলে বা বড় নোট দিলে যে ভাষায় যাত্রীর মা ও বোনের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ করার বাসনা প্রকাশ করতে থাকেন, সেসব এখানে ভাবাই যায় না। মুম্বাইতে এসব তুচ্ছ বিষয়ে কেউ ঝগড়া করে না, ব্যস্ত শহর, সবারই সময়ের দাম আছে। বাহান্ন টাকা বিল হয়েছে, পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বললেন দুটাকা খুচরো নেই, অটোওয়ালা কিচ্ছুটি মাইন্ড করেন না, ‘কোই নেহি’ বা ‘ঠিক হ্যায়’ বলে কেটে পড়েন। একজন দুজন নয়, তিনবছরে দেখা প্রতিটি অটোওয়ালাই তাই। এটা আমরা যাত্রীরাও করি, আটচল্লিশ টাকা বিল হয়েছে, পঞ্চাশ দিয়েছি, অটোওয়ালা কাঁচুমাঁচু মুখে জানালো ‘দো রুপেয়া নেহি হ্যায় সা’ব’, আমরাও ‘ঠিক হ্যায়, কোই নেহি’ একটা উদার ভঙ্গিমা করে কেটে পড়ি, আজ অবধি কাউকে হল্লা জুড়তে দেখিনি।
