এমন সময় সেই দোকানটা চোখে পড়লো, যেটা দেখে আমি বা আনন্দ ঠাকুর, আমরা কেউই প্রথমে কিছু বুঝিনি।
কোকাকোলার সাইনবোর্ডের নিচেই এন্ট্রান্স ছিল দোকানটার, দরজাও ছিল খোলা। দেখে বিস্মিতই হলাম, এত সকালে ফরাসীরা দোকান খুলে রেখেছে? শুনেছিলাম তো এরা কুঁড়ের জাত, বাঙালিদের মতই। যাগগে,বিশ্বায়নের বাবাজি যদি সব জায়গায় ঠুল্লু দেখাতে থাকেন, ফ্রান্সই দোষ করলো কিসে? ইত্যাদি উচ্চাঙ্গের ভাবনাচিন্তা করে ঢুকে দেখি, বাহ, এতো ব্যুটিক সালোঁ হে!! চমৎকার সাজানো ইন্টিরিয়র। ব্যবস্থা অবিশ্যি ছোটই, নিচু কয়েকটা চেয়ার,আর একটা কাঁচঢাকা টেবিল। দোকানের কোনে একটা চিনেমাটির ফুলদানি। দেওয়ালে ঝুলছে মুঙখের স্ক্রিম আর গঘের স্টারি নাইটসের কপি,সব মিলিয়ে একটা দিব্যি পরিচ্ছন্ন রুচির ছাপ স্পষ্ট।
তা রেস্তরাঁর তারিফ টারিফ করছি, এমন সময়ে পেছনে একটা ”হেললো” শুনে তাকিয়ে দেখি মধ্যবয়সী ওয়েট্রেস এসে হাজির, চোখে সামান্য বিস্ময়। খুবই স্বাভাবিক, দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গেই কাস্টমারের ভীড় লেগে গেলে তো…. সে যাগগে, আমি তো স্মিত মুখে ‘বঁজু মাদাম, দুকাপ কড়া করে কফি পাওয়া যাবে? আর সিগারেট? একটু হাত চালিয়ে দেবেন প্লিজ, তাড়া ছিল’ বলে অর্ডার প্লেস করে দিলুম। মহিলাটি কি ভেবে ভেতরে চলে গেলেন।
বসে বসে আমরা দুইজনে গজল্লা করছি, এমন সময়ে সেই ওয়েট্রেস ভদ্রমহিলা একটা ট্রেতে ধুমায়িত দু কাপ কফি এনে হাজির। সঙ্গে এক প্যাকেট উৎকৃষ্ট সিগারেট। নাম মনে নেই, পরে খেয়ে বুঝেছিলুম এ রীতিমতো উচ্চাঙ্গের জিনিস। তা মহিলাটির পরে পরেই বিশালদেহী গুঁফো যে ভদ্রলোক ঢুকলেন, অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে ইনিই এই সালঁর মালিক। তিনিও বঁজু বলে অভিবাদন করলেন, আমরাও মাথা নেড়ে বঁজু বলে উত্তর দিলুম। ভদ্রলোকটি তাঁর বিশাল শরীর নিয়ে এক কাঠের চেয়ারে বহু কষ্টে অধিষ্ঠান হলেন, তারপর পকেট থেকে একটা পাইপ ধরালেন,তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে ভাঙাচোরা ইংরেজিতে জানতে চাইলেন কোথা থেকে এসেছি, কি কাজ, কদ্দিন আছি, কি করে এই সালঁর খোঁজ পেলাম ইত্যাদি। আমরাও গড়গড় করে আমাদের জাত কুল ঠিকুজি, মায় গতরাতের নৈশসফরের কথা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলুম। ভদ্রলোক দেখলুম বেশ রসিক লোক। থেকে থেকেই অট্টহাসিতে ঘর কাঁপিয়ে তুলতে লাগলেন। আর মধ্যে মধ্যে কিছু আদিরসাত্মক ফোড়ন। সকাল সাড়ে ছটার পক্ষে আদিরস একটু আর্লিরস বুঝি, তবে আড্ডাটা দিব্য উপভোগ্য হচ্ছিল বলে আমরাও বেশ তালেতাল দিয়ে চলছিলুম। ওয়েট্রেস মহিলাও দেখলাম মালিকের কথা শুনে বেশ মিটিমিটি হাসছেন।
তা সেই দুর্দান্ত ভালো কফি শেষ হতে আমরা আরও দুকাপ অর্ডার করলুম। ভদ্রমহিলাও বেশ শশব্যস্ত হয়ে ভেতরে চলে গেলেন। ততক্ষণে দুজনেই বেশ চনমনে হয়ে উঠেছি। ভদ্রলোক আমাদের নাম, বয়েস ইত্যাদিতে জিজ্ঞেস করা অবধি নেমে এসেছেন দেখে ভারি আপন আপন ফিল করতে লাগলুম। দেশে তো এইরকমই হয়, সামান্য আলাপেই লোকজন মাইনে, বাবার প্রস্টেট, শ্বশুরমশাই মারা গেলে সম্পত্তির কত অংশ পাবো, মেয়ের বিয়ের জন্যে কত ভরি সোনার গয়না জমিয়েছি, মায় অ্যাপেন্ডিক্সের সাইজ অব্ধি জিজ্ঞেস করে নেয়! ইওরোপীয়রা সেদিক দিয়ে অনেক সভ্য। তার পরেও যখন ইনি বয়েস, নাম ইত্যাদি অবধি নেমেছেন, এবং মেয়ের বিয়ে দেবার চক্কর নেই, নিশ্চয়ই সেটা নিজের বলে ভেবেছেন বলেই।
তা ইতিমধ্যে দ্বিতীয় কাপও এসে গেছে। আমরাও সেই দুরন্ত ভালো কফি শেষ করতে করতে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় দেওয়াল ঘড়ির দিকে চোখ গেলো।
আটটা বাজে, কি সর্বনাশ!!!
চকিতে বাকি কফিটা গলায় ঢেলে ভদ্রমহিলাকে বললাম, ‘খুব ভালো কফি খেলাম মাদাম, বিলটা আনুন প্লিজ, উঠতে হবে’।
এবার মাদাম আর মঁসিয়ে দুজনেই একে অন্যের দিকে তাকালেন, তারপর দুজনেই মৃদু হেসে জানালেন আমাদের পেমেন্ট করার দরকার নেই!!
অ্যাঁ, সে আবার কি?
এবার আমাদের বিব্রত হবার পালা। তা কি করে হয় মঁসিয়ে, আপনাদের সেবাযত্ন, যাকে বলে, হৃদয়ে রহিল গাঁথা, কিন্তু এত্ত উদার হলে আপনাদের রেস্তরাঁই বা চলবে কি করে, অ্যাঁ?
এবার দুজনেরই মুখের হাসি আরও চওড়া হলো, মহিলাটি স্মিত হেসে জানালেন, মঁসিয়ে স্যারক্যার, এটা রেস্তরাঁ নয়।
তখন আমাদের মনের অবস্থা, সংস্কৃতে যাকে বলে, অবর্ণনীয়!! রেস্তরাঁ নয়? মানে? সক্কালবেলা এসবের মানে কি, অ্যাঁ?
এবার বিপুলদেহী ভদ্রলোকটির হা হা অট্টহাসিতে চারিদিক সচকিত হয়ে উঠল, ওঁরা প্রথম থেকেই বুঝতেই পেরেছিলেন যে দুটি বিদেশী ভুল করে রেস্তরাঁ ভেবে ঢুকে পড়েছে। ওঁরাও এতক্ষণ তেড়ে কৌতুক উপভোগ করছিলেন, আমরা যে বুঝতেই পারিনি তাতে ভারি আমোদ পেয়েছেন। তবে সত্যিই এটি কোন রেস্তরাঁ নয়, রীতিমতো ভদ্রাসন!
আমাদের মনের অবস্থা বলে আর আপনাদের আর বিব্রত করবো না। শুধু পুরো ঘেঁটে যাওয়া মুখে একবার শুধোলাম, সব জেনেও আমাদের অ্যামন মুরগি করার কারনটা জানালে একটু সুস্থ হৃদয়ে দেশে ফিরে যেতে পারতুম আর কি!
ভদ্রমহিলা দেখলাম মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন। পরিস্থিতি আচমকা বেদম গম্ভীর। গলা খাঁকারি দিয়ে সেই বিশালবপু ভদ্রলোকটি জানালেন, ঠিক আমাদের বয়েসী দুটি ছেলে ছিলো ওঁদের। বছর পাঁচেক আগে আল্পসে স্কিইং করতে গিয়ে হারিয়ে যায়, আর ফিরে আসেনি। বুড়োবুড়ি এখনো আশা করেন কোথাও না কোথাও ওরা সুস্থ শরীরে বেঁচেবর্তে আছে, হয়তো স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে। একদিন নিশ্চয়ই, রাস্তা খুঁজে ফিরে আসবে তারা, শীতের শেষে যেমন ফিরে আসে পরিযায়ী পাখিরা।
