তা খেয়েদেয়ে ভদ্রলোককে যারপরনাই ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে হেঁটে আসছি, আনন্দ ভারি হাসিমুখে জিগাইলো, স্টেশনে যাচ্ছি কেন? বোকা বোকা প্রশ্ন শুনলে রাগ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, খেঁকিয়ে বল্লুম হোটেলে ফিরবি না? আনন্দের মুখে হাসিটি কিন্তু প্রায় তুরীয়মার্গের, আমাকে মিষ্টি করে শুধলো, আমার হাতে কি ঘড়ি নেই? আমিও ততোধিক মিষ্টি করে ঘড়ির সঙ্গে স্টেশনের কি সম্পর্ক শুধোতে যাবো, এমন সময়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি,
সর্বনাশ!!! রাত আড়াইটে!! টিউব বন্ধ। এখন উপায়???
রাস্তাঘাটে ট্যাক্সি চলছিল বটে, কিন্তু আনন্দের নিজের বয়ানে, ও একবার এরকমই এক অভিশপ্ত রাতে সোনাগাছি থেকে মদনাভিসার সমাপ্ত করে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরেছিল সল্ট লেক যাবে বলে। সে ট্যাক্সি তাকে ধর্মতলা হয়ে, রেড রোড ধরে, দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়ে, সাঁতরাগাছি হয়ে, বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে সল্ট লেকে নিয়ে এসেছিল, সাড়ে আটশো টাকা ভাড়া দিয়ে। আনন্দ একটু বোকা বটে, কিন্তু প্যারিসে এসে উল্লু হবার কোন সদিচ্ছেই ওর নেই,তাতে লোকে ওকে কায়ের বা ডরপোক যা খুশি বলুক। আর সাড়ে আটশো ইউরো ট্যাক্সিভাড়া উঠলে কি কি বেচলে সেই টাকাটা জোগাড় হবে সেটা যেন আমি আগে থাকতে ভেবে রাখি। রাজপুতের ছেলে সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু বিদেশবিভূঁইতে এসে বেকার হ্যাঙ্গামে কিছুতেই জড়িয়ে পড়তে রাজি নয় ইত্যাদি ইত্যাদি…
অতএব,তিন সাড়ে তিনঘণ্টা ঘন্টা ওখানেই কাটানো ছাড়া আর কি উপায় থাকতে পারে? তবে ভরসা একটাই পিগালে রাত তখনো, যাকে বলে স্টিল ইয়াং। এদিকওদিক চাইতে চাইতে দেখি,
উরিত্তারা, তিনতলা একটি সেক্স শপ!!
এখন সেক্সহিপোক্রিট দেশের বুভুক্ষু মানুষ আমরা, এসব দেখলে চাপা দেওয়া লিবিডোর তাড়নায় ঢুকতেই হয়, এবং ঢুকে পড়েই হাঁ হয়ে যেতেই হয়। যেসব জিনিস আজ অবধি শুধু বিচিত্র সব পর্নো মুভিতে দেখেছি, সেইসব নিষিদ্ধ বস্তু দেখি থরেথরে সাজানো। শারীরিক আনন্দের জন্যে মানুষের ক্রিয়েটিভিটি কি পর্যায়ে যেতে পারে ভেবেই মাথাটা শ্রদ্ধায় ও রোমাঞ্চে নত হয়ে এসেছে, চোখে জল আসি আসি, এমন সময় তাকিয়ে দেখি আমাদের ঠাকুর সাহেব যাকে বলে ভেরি ভেরি বিজি! তিনি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে অভিনিবেশ সহকারে প্রতিটি বস্তু দেখে, ধরে, টিপেটুপে, নাড়িয়ে, শুঁকে একেবারে যাকে বলে রীতিমতো পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন। একবার তো দুই বিদেশিনীর প্রতি উতলা হয়ে ছুটেই যাচ্ছিলেন, ওনাদের সদ্য কেনা বস্তুগুলির দ্রব্যগুণ ও ব্যবহারবিধি সম্যকরূপে বুঝে নেবেন বলে! সেযাত্রা পাবলিক প্যাদানির ভয় দেখিয়ে সেই বিহারনন্দনকে তার বিপুল জ্ঞানান্বেষণের পথ থেকে টেনে আনতে বাধ্য হই!!
ঘন্টাদুয়েক বাদে বেরিয়ে এদিকওদিক হাঁটতে লাগলুম। তখন রাত অনেকটাই ঘন হয়ে এসেছে, লোক চলাচলও কম। এমন সময় দুটি বারের মাঝে একটা অন্ধকার গলিপথ দেখে ভাবলাম দেখাই যাক কি আছে। টাইম তো হ্যাজ!
ঢুকেই বুঝলাম জায়গাটা খুব সুবিধের নয়। গলিটা শুধু আঁধারই নয়, নোংরাও বটে। আর গলিপথবাসী বা বাসিনীদের রকমসকমও খুব সুবিধের নয়। ছোটখাটো পোষাক পরা, উগ্র মেকআপ করা এই মুখগুলো বোধহয় হাড়কাটা গলি থেকে প্যারিসের রাজপথ, সর্বত্র একইরকম দেখায়। যথারীতি তেনারা নতুন শিকারের খোঁজে এগিয়ে এলেন। আনন্দবাবুর বোধহয় ভূমানন্দের সুখ নিতে বিশেষ আপত্তি ছিল না, কিন্তু আমার নজর পড়েছে তখন আরেকটু এগিয়ে, দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি একটা ছোট আগুন ঘিরে বসে কয়েকজন বেশ উদাত্তস্বরে গান ধরেছে।
ছোট আগুনের কুণ্ডলী, ঘিরে বসে কয়েকজন ছেলেমেয়ে। সবার হাতেই ঘুরছে বিয়ারের ক্যান আর সিগারেট। পিছনে একজনকে একটা রাংতা থেকে সাদা সাদা কিছু গুঁড়ো নাকে টেনে নিতেও দেখলাম। শুধু একজনের হাতে ছিল অন্যকিছু, একটা গিটার। সোনালী চুলের রোগাসোগা সেই ছেলেটি গাইছে একটি ফরাসী গান, উত্তাল তার ছন্দ, বলিষ্ঠ তার গায়কী। আশেপাশের সবাই দেখলাম জোরসে মাথা ঝাঁকাচ্ছে আর সমে এলেই সমস্বরে চিৎকার করে উঠছে তাল মিলিয়ে, অনেকটা সেই ”পেয়ার হামে কিস মোড় পে লে আয়া” র মতন, ”ইয়ে দিল করে হায়” এর পরের হায়’টাতে না চেঁচিয়ে এই গান কাউকে উপভোগ করতে দেখিনি। এও প্রায় তার কাছাকাছিই। সবাই নেশায় বুঁদ। আমরাও দুখানা বিয়ার চেয়েচিন্তে নিয়ে বসে গেলাম। আশেপাশের বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে ফরাসী বেশ্যাদের দল, আগের কাস্টমারকে ছাড়তে বা পরের কাস্টমারকে নিতে। এসে মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে শুনেও যাচ্ছে দুকলি, কারো কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছে সিগারেট, কারো বিয়ারের ক্যানে একঢোঁক চুমুকই দিয়ে গেলো হয়তো। শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই দেখলাম দালাল, কাস্টমার বেরিয়ে এলেই টুক করে গিয়ে দালালিটুকু নিয়ে আসছে বাঁধা মেয়েমানুষটির থেকে।
প্যারিসের মধ্যে এ এক অন্য প্যারিস!
খানিকটা ভোর ভোর হয়ে আসার সময় ”হরি হরি বলো মুখে মিলি বন্ধুগন, শনির পাঁচালি কথা হোক সমাপন” টাইপের সমবেত জয়ধ্বনি দিয়ে আসর ভাঙলো। আমরাও উল্টোপথে হেঁটে পিগালের বড় রাস্তাটা ধরবো, তার দুইপ্রান্তে দুটি টিউবস্টেশন, এমন সময় মিনিট পাঁচেক হাঁটাহাঁটি করে বুঝলাম, কেলো করেছে, রাস্তা হারালুম কি করে?
ছ’টা প্রায় বাজে প্রায়। সকাল সাড়ে দশটা থেকে কনফারেন্স শুরু। আসার সময় আধঘণ্টার বেশি লাগেনি, যেতেও তাইই লাগবে, কিন্তু রাস্তাটা তো পেতে হবে!!
