ইত্যকার ঝামেলা মিটিয়ে নিচে এসে রিসেপশনের সেই সুন্দরীশ্রেষ্ঠাকে সটান প্রশ্ন, অয়ি বরবর্ণিনী, প্যারিসের নাইটলাইফ, আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে, স্ট্রিপটিজ দেখতে গেলে কোথায় যেতে হবে আমাদের?
ভদ্রমহিলা বোধহয় আমাদের মতন ইতর লোক হ্যাণ্ডেল করে করে অভ্যস্ত,তাবৎ পারভার্ট ভারতীয়রা এসে নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ নিশিনিলয়ের সন্ধান চায় আগে। প্যারিসের টিউবের একটা ম্যাপ আর হোটেল অ্যাড্রেস সামনে ঝড়াকসে ফেলে দিয়ে বললেন’ জায়গাটার নাম পিগাল। হোটেল থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে দুমিনিট হাঁটলেই টিউবস্টেশন। ফিরতে হলে রাত দুটোর আগে ফিরবেন, তারপর টিউব বন্ধ থাকে। নইলে সেই ভোরে, ছ”টার পর’। বুঝলাম, ফরাসীজাতির বানিয়াকরণ ইজ ইন প্রোগ্রেস।
পিগাল স্টেশন থেকে বেরিয়েই, আইসসালা, এই লাল রঙের উইন্ডমিল মার্কা বাড়িটা চেনা চেনা লাগে যে! আনন্দ তার গভীর মননের ফল আমাকে উপহার দিলো, ‘দাদা, পার্ক স্ট্রিট মে অ্যায়সা এক বার হ্যায় না? সালোঁনে পুরা কা পুরা কপি উতার দিয়া লাগতা হ্যায়, নেহি?’
বাজে কথায় আমি কোনদিনই কান দিই নি, এবারেও দেওয়ার কোন মানে ছিল না, স্পেশালি চোখের সামনে যখন মহিমান্বিত প্রতাপে বিরাজমান দ্য গ্রেট মুল্যাঁ রুজ!
মুল্যাঁ রুজের সামনেকার দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে রাস্তার ধারে আসতেই, একটার পর একটা স্ট্রিপটিজ বার, রাস্তার দুপাশেই। আলোঝলমলে সুন্দরী প্যারিস তার মোহময়ী রাতের পশরা সাজিয়ে বসেছে। বিশাল বিশাল নিওন সাইন প্রতিটি দোকানের সামনে। পরিষ্কার ঝকঝকে রাস্তা,তার মধ্যে বয়ে চলেছে উদ্দাম জনস্রোত, লাস্যে, হাস্যে, লালিত্যে, বিভঙ্গে,কটাক্ষে, কলকাকলিতে মুখর লা পারি। স্ট্রিপটিজ বারের মাঝে মাঝে মদিরাশালা। সেখানেও উচ্ছল হাসি কলরোলের আনন্দলহরী। আহা, হাসি গান আনন্দে মুখরিত সেই সন্ধ্যাটি ছিল ফরাসী সুরার মতই মদির, ফরাসী তন্বীটির মতই উচ্ছল, ফরাসী তরুণটির মতই প্রাণবন্ত।
প্রতিটি স্ট্রিপটিজ বারের সামনে দালালের দল রীতিমতো হইহই করে বিচিত্র বিভঙ্গে কাস্টমার ডেকে আনার চেষ্টা করছে, শিয়ালদার হোটেলগুলোর সামনে যেভাবে ‘ও দাদা এদিকে, ওও বৌদি এখানে’ বলে খদ্দের ডাকে, অবিকল সেই তরিকা। দুএকটা হাতছানি এড়িয়ে বেশ বড়ো গোছের একটা স্ট্রিপটিজ বারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি কি দাঁড়াইনি, বৃষস্কন্ধ ব্যঢ়োরস্ক মহিলা দালালটি তেনার শালপ্রাংশু মহাভুজদুটি দিয়ে আমাদের দুইজনের নড়া ধরে নেংটি ইঁদুরের মতই ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে দুটো সীটে ফেলে গেলেন। যাবার আগে অবশ্য দশ দশ কুড়ি ইউরো খামচেই নিয়ে গেলেন। সে কি হাতের পাঞ্জা, মনে মনে মেপে দেখলুম ভদ্রমহোদয়া কোন কারণে রুষ্ট হয়ে যদি আমাকে একটা থাপ্পড় কষান, মোটামুটি ব্রহ্মতালু থেকে থুতনি অবধি ওতে কভার হয়ে যাবে!
এখন আপনি কিসের জন্যে নড়েচড়ে বসলেন স্পষ্ট বুইতে পাচ্চি, হেঁ হেঁ, কিন্তু কত্তা,স্ট্রিপটিজের বর্ণনা দিয়ে আমি কিছুতেই সুকোমলহৃদয় তরলমতি পাঠকপাঠিকাদের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাতে পারবো না, না, না। তাছাড়া অনেক গুরুজনেরাও আছেন,এমনিতেও আমার ছ্যাবলামি দেখে আর ফাজলামিগুলো পড়ে এঁরা আমার অন্ধকার ভবিষ্যতের ব্যপারে সাতিশয় উদ্বিগ্ন। এরপর স্ট্রিপটিজের রগরগে বর্ণনা শুনলে সরবিট্রেট, মোহমুদগর, রবীন্দ্রসংগীত, কিছুতেই শানাবে না যে!! শুধু জানিয়ে রাখি কুন্দশুভ্র নগ্নকান্তি সেই সুরেন্দ্রবন্দিতাদের বিলোল কটাক্ষমদির লাস্যনৃত্য আজও চোখ বুঝলেই দেখতে পাই। আহা, শুধু শরীর দিয়েও এমন স্বর্গীয় জাদুর দুনিয়া গড়তে শুধু ফরাসীরাই পারে!
তা নাচটাচ দেখে, ঘন্টাদুয়েক বাদে ঠোঁটের কোণে একটা বিস্ময়,প্রশংসা, উত্তেজনা মেশানো হাসি নিয়ে বেরিয়েছি, আনন্দবাবু ঘোষণা করলেন যে ওনার পেটে বিলক্ষণ কিছু পোস্তা স্পেশাল চুহা দৌড়চ্ছে, এবং সামান্য ক্ষুন্নিবৃত্তি না করে উনি সেখান থেকে নড়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না!
তা কথাটা আমারও দিব্যি মনে ধরলো। ইতিউতি খুঁজেই দেখি একটি ছোট্ট লেবানিজ রেস্তরাঁ। ভেতরে ঢুকে দু’দুখানা চেয়ার দখল করে বসতেই মধ্যবয়সী মালিক ভদ্রলোকটি এগিয়ে এলেন, মুখে একটা অমায়িক ‘কি খাবেন স্যার’ মার্কা হাসি। বলতেই হলো যে আমরা এপাড়ার লোক নই, একটু দেখেশুনে কিছু খাওয়ালেই হলো, শুধু সঙ্গে যেন ভালো হুইস্কি থাকে, আর হ্যাঁ, আমরা বিফ খাই না।
মুখের হাসিটি অমলিন রেখে ভদ্রলোক শুধোলেন, কোন পাড়া? বলতেই হলো ইণ্ডিয়া। ভদ্রলোক স্মিত হেসে জানালেন উনি দেখেই বুঝেছেন ক্যাবলা দুইটি ইণ্ডিয়ান, প্রশ্ন আরো গভীর, ইণ্ডিয়ার কোথায়? আমরা তো মাইরি হেব্বি ইম্প্রেসড। আমি কিছু বলার আগেই আনন্দ ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর অনিন্দ্যসুন্দর বিহারি ইংরেজিতে গুছিয়ে জানালো এক মক্কেল বেঙ্গলের, আরেকজন বিহারের, উনি কি চেনেন? না না, মক্কেলদের নয়, জায়গাদুটিকে?
ভদ্রলোকের স্মিত হাসিটি চওড়া হলো, জানেন বৈ কি। জানা গেলো ইনি পাকিস্তানের, বছর ত্রিশেক আগে দেশান্তরী হয়ে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছেন, আর কোনদিনই ফিরে যান নি। তবুও প্রায়-দেশোয়ালি লোক দেখলেই এখনো দিব্যি আনন্দ পান,সোয়াত উপত্যকার হিমেল হাওয়ার স্রোত এখনো বুকের মধ্যে খেলে যায় নিরন্তর।
জীবনে সুখাদ্য কম খাইনি। কিন্তু সেদিন সেই পাকিস্তানি রেস্তরাঁতে বসে হুইস্কি আর আড্ডা সহযোগে খাওয়া একটি লেবানিজ ডিশ, শোওয়ারমা সেই সুতনুকার নাম, আমার কাছে এখনো সুজাতার পায়েস হয়ে আছে। শুধু কি রান্না? নাকি ফেলে আসা সোয়াত উপত্যকার হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসা কিছু স্মৃতি, প্রায়-দেশোয়ালি ভাইদের জন্যে কিছু ভালোবাসাও মিশে গেছিল তার সঙ্গে?
