বলা বাহুল্য ব্রাণ্ডির বদলে এক কোয়ার্টার রদ্দি হুইস্কিই এলো। প্রথমে ভাবলুম বুড়োকে বাছাবাছা দিই কিছু। তারপর চারিদিকে তাকিয়ে মালুম হলো যে এই দ্বীপে এই যে পাচ্ছি তাই ঢের!
তারপর লোকজন তো খ্যা খ্যা করে হেসে, নেচে কুঁদে, আজাইরা প্যাচাল পেড়ে জায়গাটাকে যা নরক গুলজার করে তুললো তা আর কহতব্য নয়। তার ওপর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বুড়ো হাতের কাছে গরমাগরম প্রণফ্রাই দিয়ে যেতেই দিব্যি চনমনে হয়ে চেগে উঠলাম। সমুদ্দুরের হাওয়ায় খিদেটাও পেয়েছিলো জব্বর। তারপর হুইস্কি যে ক্ষুধাবর্ধক, সে কথা সুরসিক মাত্রেই স্বীকার করতে বাধ্য। আমি তো প্রসন্ন মুখে ‘বেশ বেশ ‘ বলে দুটো ডোঙা টেনে কাজে লেগে পড়লুম।
তারপর মশাই বিভিন্ন উচ্চাঙ্গের হাই থট ভাবতে ভাবতে তো আমি তো প্রায় ধ্যানস্থ হয়ে গেছি। আমার আবার প্রতিভা খুবই উমদা কি না, ব্রহ্মযোগে প্রায় উঠে গেছিলুম আর কি! মানে সাধনফাধনের টপ লেভেল মেরে এনেছি প্রায়, ইড়া পিঙ্গলা ইত্যাদি হাত ধরাধরি করে নেচেগেয়ে সহস্রারে পৌঁছে যায় যায় করছে, জাস্ট টিকিটের পয়সা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে পা রাখার ওয়াস্তা, এমন সময় কানের কাছে শুনি খুবই শুকনো স্বরে কেউ বলছে, ‘আপনি কি আরও প্রণফ্রাই খাবেন?’
তাকিয়ে দেখি সবাই খুবই ক্ষুধার্ত ও বেদনাহত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে, আর আমার হাতের কাছে সাতপ্লেট, থুড়ি সাতডোঙা প্রণফ্রাইয়ের ধ্বংসাবশেষ!
এসব ক্ষেত্রে গম্ভীর হতেই হয়। আমি গলাফলা ঝেড়ে বুড়োর উদ্দেশ্যে কম্বুকণ্ঠে একটা হাঁক পাড়লুম, ‘কি কাকা, আর প্রণ নেই?’
ও মা, বুড়ো দেখি দাঁতফাঁত বার করে যা জানালো তার মর্মার্থ এই যে ”বড়াবাবু”র এইরকম রাক্ষুসে মার্কা ক্ষিদে পেয়েছে সেটা তার অভিজ্ঞতার র্যাতডারে ধরা পড়ে নাই। এই লেভেলের দানবীয় খিদে দেখে সে চট করে তার নাতিকে জাল হাতে জলের ধারে এইমাত্তর বসিয়ে দিয়ে এইচে ..’চিঙুরি’ ধরা পড়িলেই সে আরও কয়েক প্লেট তাজা প্রণফ্রাই ভেজে দিতে পারবে এই দৃঢ় বিশ্বাস তার আছেই !
চারিদিকের সেই হিংস্র নৈঃশব্দ্যের মধ্যে আমি শুধু শুকনো ঠেঁট চেটে এইটুকুই জিজ্ঞেস করতে পারলুম, ‘ইয়ে, প্রণ ছাড়া আর কিছু নেই?’
বুড়োর হাসি আরও চওড়া হলো ‘চা আর চিপসঅ আছে ভাইনা!’
তা সেই চিপসই এলো, সঙ্গে হলদে রঙের কাপে জণ্ডিস রঙের চা গোলা। চারিদিকে প্রসন্ন দুপুর, সাগরের জল ছলাৎছলাৎ করে পা ধুইয়ে দিচ্ছে, মিঠেকড়া রোদ আশেপাশের বালিতে ছড়িয়ে আছে লাবণ্য হয়ে। এরই মধ্যে আমি ছেলেপিলেদের অসম্ভব বিতৃষ্ণ ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে সেলস ম্যানেজারদের অবশ্যকর্তব্য আর ঘোরতর দায়িত্ব বুঝিয়ে চলেছি, এমন সময় দেখি কি একটি অতি নিরীহ গোছের নখদন্তহীন কেঁউসর্বস্ব একটি নেড়ি এসে আমাদের উৎকলাধিপতি ম্যানেজার, নাম হরিপ্রসাদ, তার পায়ের কাছে বসে অতি নিরীহ ভাবে লেজ নাড়তে ভুকভুক করতে লাগলো। ভাবখানা যেন ‘কি দাদা, এট্টুস চিপস হবে নাকি? হবে না বলছেন? তাহলে প্রণফ্রাই? তাও না? তাহলে কী আছে, রাজভোগ? বিরিয়ানি? মাটন দোপেয়াজা? হাক্কা চিলি চিকেন? বাদশার এগরোল? প্যারামাউন্টের শরবৎ? শ্রীহরির রাবড়ি? গোলবাড়ির কষা মাংস? কি বললেন? এসব কিছুই নেই? তাহলে এসেছেন কেন এখানে? এটা কি নাট্যশালা, অ্যাঁ? এটা কি নাট্যশালা? দেব নাকি ঘ্যাঁক করে…’
এইভাবে দুইজনের মধ্যে আলাপ ঝালা ইত্যাদি বেশ জমে উঠেছে, এমন সময় কেউ একজন যেন পেছন থেকে বললো, ‘শায়েদ ইস ডগি নে হরি কো পসন্দ কর লিয়া।’
আমিও তক্ষুণি তেড়েফুঁড়ে উঠে সমর্থন করে (আহা, এমনিতেই পাঁকে পড়ে আছি, এখন একটু ”আমি তোমাদেরই লোক” ইয়ে না দেখালে চলে কি করে?), দ্রুত ঘাড়ফাড় নাড়লুম ‘হাঁ হাঁ জরুর। আওর হরি কো ভি ডগি বহোত পসন্দ হ্যায়, মুঝে পতা হ্যায়।’ বলেই একটা শ্রীচৈতন্য মার্কা উদার হাসি বিলিয়ে হরিপ্রসাদের দিকে কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করলুম, ‘ তাই না হরি? তুঝে ডগি বহোত পসন্দ হ্যায়, নেহি ? উসদিন ইওর ওয়াইফ ওয়াজ অলসো টেলিং মি দ্যাট। শি সেইড শি অলসো লাইকস ডগি আ লট!’
সঙ্গে চারিদিকে এত খুঁকখুঁক হাসি কেন শুরু হলো কে জানে? আমি কি তেমন হাসির কিছু বল্লুম? আপনারাই বলুন দেখি। আর তার ওপর সেই ভর দুপুরে হরির চোখেমুখে যা জিঘাংসা দেখলাম, আমার তো ইয়েটা কেমন শিউরে শিউরে উঠতে লাগলো। আমি চটপট করে বল্লুম ‘ওরে চল, বেলা যে পড়ে এলো, বাসনায় আগুন দে, ওঠ…তোদের যে খেলা শেষই হতে চায় না দেখছি।’ এই সব ইত্যকার বলে ঝটপট করে সেই বোটে চড়ে বসলুম।
ফের সেই বোট চলেছে। চারিদিকে অখণ্ড শান্তি। আমাদের বোটে কেউ কোনও কথা বলছে না। প্রত্যেকের মুখ দেখে মনে হচ্ছে তীরে পৌঁছোবার ওয়াস্তা, তারপর আমারই একদিন কি এদেরই একদিন। আমি তো মশাই সদ্যবোধিপ্রাপ্ত তথাগত”র মতন শান্ত সমাহিত হয়ে চাদ্দিকে দেখছি। ডলফিনদর্শনাভিলাষী ব্যাকুল পর্যটকেরা নিজনিজ কুলায় ফিরে গেছেন। স্থির জলে পড়ে আছে শেওলা, চিপস-কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল আর লোভী সভ্যতার অশ্লীল থাবা। আমিও নেশার ঝেঁকে ভাবছি এই নিয়ে একটা জ্বালাময়ী পোস্ট যদি ফেসবুকে ছাড়ি তাহলে কটা লাইক আর কটা শেয়ার আসার চান্স হউছি। এমন সময় খেয়াল করলুম পেটের মধ্যে কে যেন একবার চুঁই করে উঠলো।
কে রে?
