একটি শোকাহত ভ্রমণকাহিনী
আমি না কিচুতেই বুইতে পাচ্চি না যে এরা এরম বিহেভ কচ্চে কেন! আপনি এট্টু দেকুন দিকি মশাই, কি কেস…
পুরী এসেছি গতকাল ভোরে। সচরাচর ম্যানেজারদের নিয়ে মান্থলি মিটিংটা আমি কলকাতায় অফিসেই সেরে নিই। তবে লাস্ট দুটো কোয়ার্টার খুব ভালো পারফর্মেন্স করার পর ছেলেরা ধরে বসলো যে জানুয়ারির মিটিংটা কলকাতার বাইরে করতে হবে।
আজকালকার ছেলেপিলে, কবে কার মতিগতি বিগড়ে যায় কে জানে, তাই রাজি হতেই হলো। এমনিতেও লাস্ট কোয়ার্টার শুরু হয়ে গেছে। থার্ড কোয়ার্টারে কয়েক ইঞ্চির জন্যে নর্থ রিজিয়ন আমাদের ফেলে গেছে এগিয়ে। এখনইই তো সময়, খাইয়ে পরিয়ে, তুইবে বুইয়ে, ধুয়েমুছে এদের মার্কেটে নামিয়ে দিতে হবে। টার্গেটের ওপরেও এক্সট্রা একশো কিলোলিটারের মামলা, এরা যদি ”উর্ধগগনে বাজে মাদল”, বা ”শুণ্ডিরও দেবো পিণ্ডি চটকে” গাইতে গাইতে একশো কিলোলিটার নামিয়ে দেয় তাহলে…জয় জগন্নাথঅ… ভাবতেও বুকটা সামান্য কেঁপে উঠলো…এই দরিদ্র কায়স্থসন্তানের পকেটে কিছু ইনসেন্টিভ ঢোকে। যদিও অতিইইই সামান্য, তবুও মানি ইজ মানি দাদা, হানি বললেই চলে। মেয়ের হায়ার স্টাডিজ , হোম লোনের ইএমআই…জীবনে কি লোড কম নিয়েছি, অ্যাঁ?
কালকে মিটিং এর হদ্দমুদ্দ করে, প্রেমাশ্রুর সঙ্গে বাবা বাছা মিশিয়ে, তিন পৌয়া ইমোশনের সঙ্গে কিলোখানেক ধমকধামক পাঞ্চ করে ইহাদের টার্গেটটি গিলাইয়াছি। শেষে চিরতার জলের সঙ্গে কুইনাইন মিশিয়ে খেলে যেমন মুখ হয়, তেমন মুখ করে ছেলেপিলেরা বায়না ধরলো পরের দিন চিল্কা যাবে, চিংড়িভাজা দিয়ে হাণ্ড্রেড পাইপার্স খাবে আনলিমিটেড, আর সেই বিমলানন্দে আমি যেন ‘তাউজী জ্যায়সা টিকটিক করকে’ বাধাদান না করি!
ইনসেন্টিভের অ্যামাউন্টটার কথা মনে করে অপমানটা স্রেফ হজম করে গেলুম, বুইলেন। আমিও তক্কে তক্কে আছি, আসুক অ্যাপ্রেইজাল.. তোরই একদিন কি আমারই…
তারপর দুপুর নাগাদ এসে সতপডা এসে পৌঁছেছি। দরদাম করে একটা বোট নিয়ে ঢুলুঢুলু চোখে জলপথ পরিভ্রমণে (উভয়ার্থেই) নিবিড় মনোযোগ দিয়েছি, এমন সময় প্রথম কেলো!
আমার টিমের বঙ্গাধিপতি ভদ্রলোক এমনিতে জিমটিম করে একটি দেড় বা আড়াইপ্যাক মার্কা বডি বানিয়েছেন বটে, কিন্তু ভদ্রলোক রোডেশিয়ান কুত্তা থেকে টিকটিকি অবধি বেহুদ্দ ”ডরিয়ে” থাকেন। আজ তিনি সতপডা নেমেই বললেন যে আমরা যেন জলবিহার সমাপ্ত করে সহি সলামত ফিরে আসি এই কামনা বুকে চেপে ইনি একটি ওল্ড মঙ্কের ফুল বটল হাতে তীরেই অপেক্ষা করবেন!
কেন রে সোনা? তোর বুঝি জলে ভয়?
তারপর তিনি যতই ”অমাবস্যাতিথিতে শুক্রবার পড়লে শিবুখুড়ো জলের নামতে খুব করে মানা করেছে” বা ”বাবার ছোটমেসোর মেজোপিসিশ্বাশুড়ির ননদের গুরুদেব বলেছিলেন যে পুকুরের পাশে একানড়ে থাকে.. ‘ টাইপের যুক্তির অবতারণা করুন না কেন..আমরা তো মশাই সমবেতভাবে ভদ্রলোকের খিল্লি উড়িয়ে নেচেকুঁদে একশা।
অবশেষে উনি আমাদের সঙ্গ দিতে রাজি হলেন!
এইবার তিনি বোটে চড়েছেন। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে স্পষ্ট যে অত্যন্ত টেনশনে আছেন। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সিটের হ্যাণ্ডেল দুটো এমনভাবে ধরে আছেন যেন স্পুটনিকে বসে আছেন, এই উড়লেন বলে..এমন সময় বোটটা অযথাই দুলে উঠলো।
এরপর ভদ্রলোক আমার প্যাঁকাটির মতো সরু হাতটা আঁকড়ে ধরতেই যারপরনাই বিরক্ত হলুম। অমন তরিবৎ করে বানানো নেশাটি, তারপর চিল্কার হাওয়ায় দিব্য ধুনকিটি জমে উঠেছে, এমন সময় এমন ইল্লুতেমার্কা ব্যাভার কার রে?
পেচুন থেকে খ্যাঁকম্যাক ধ্বনি ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেলস অপারেশনস ম্যানেজার পদাধিকারী মহিলাটি কানে কানে আমাকে জানালেন, ‘ বস, আশিসজী বোট হিলা রহে হ্যাঁয়’।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে সেই উত্তরপ্রদেশনাথের প্রতি একটি বজ্রকঠিন হুঙ্কার ছাড়লুম, ‘আশিস, বোট মত হিলাও। হিলানে কে লিয়ে আউর ভি বহুত কুছ হ্যায় তুমহারে পাস!’
বলে ফের ঘাড় ঘুরিয়ে সমাধিস্থ হতেই খেয়াল করলুম যে বোট জুড়ে আশ্চর্য নৈঃশব্দ নেমে এলো! কেন কে জানে!
যাই হোক, তারপর ডলফিনের নাচনকেঁদন দেখে, (উফ, চাট্টি কচি ডল্ফিনের পেছনে মশাই কম করে খান পঁচিশেক বোট, তাতে কিলো কিলো লোক পিলপিল করছে.. বেচারিরা মাথা তুলতেই গগনভেদী রব উঠছে, ‘ ওই যে ওই দিকে।’ সে বেচারারা তো ‘বিশ্বাস করুন স্যার, আআআমরা কিছু করিনি’ টাইপ ভঙ্গি করে যে বেগে চম্পট দিচ্ছে, খুব সম্ভবত থাইল্যাণ্ডেই গিয়ে ল্যাণ্ড করবে মনে লয়!) আমরা চল্লুম ডোপ না ঝোপ এইরকম সরল নামের দ্বীপের উদ্দেশ্যে।
দ্বীপের মাঝখানে অস্থায়ী ঝুপড়ি গাদাখানেক। সেখানে গিয়ে নামতেই একটা বুড়োমত লোক বেশ অভ্যর্থনা করেই নিয়ে গেলো ভেতরে। দেখেই মনটা বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠলো। আহা, আমার মধ্যে যে বেশ একটা রাজকীয় আভিজাত্য আছে, সেটা তো আর অস্বীকার করলে চলছে না দেখছি!
আমি তো একটা রংচটা প্লাস্টিকের চেয়ারে আমার এই রাজকীয় বপুখানি স্থাপন করা মাত্র চারটি পায়াই বালির মধ্যে অর্ধেকখানি গেঁথে ফেলে প্রবল ক্যাঁচকেঁচ আওয়াজ তুলে প্রতিবাদ জানাতে লাগলো। আমি তাতে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নীলদর্পণের ব্রিটিশ সায়েবের মত, ”হেই খেডমটগার, ব্রাণ্ডি লাও, ব্লাটি পানি লাও” আদেশ দিয়ে ”তাজা বতাজা” গান গাইতে লাগলুম।
