বিজন একটু থেমে বলল, স্যার টুলটা নিয়ে আসি। টুলটা না নিলে ঘুল—ঘুলিতে মুখ রাখা যাবে না।
কেবিনের আলো এবং একটি ক্যালেন্ডারের পাতায় সুন্দর এক হ্রদের দৃশ্য অথবা অ্যালওয়ে পার হয়ে অন্য অফিসারদের কেবিন, স্টোর রুম এবং ডাইনিং হল অতিক্রম করে চিফ স্টুয়ার্ডের ঘর—বাংকে বেশ্যা রমণীর সুন্দর চোখ, আর পারা যাচ্ছে না—সে আগে আগে চলতে থাকল, কোনো কথা বলল না। অন্য কেবিনে যারা ঘুমিয়ে আছে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাল না।
বিজন ফিস ফিস করে বলল, এসে গেছি।
যে টুলটা বালকেডের পাশে সন্তর্পণে রাখল। বলল, এবারে উঠুন স্যার। সে আঙুল দিয়ে ঘুলঘুলি নির্দেশ করে দিল।
আমাকে উঠতে সাহায্য কর। বড় মিস্ত্রি মাতাল। তিনি কুকুরের মতো উত্তেজনাতে হাঁসফাঁস করছেন।
বিজন অ্যালওয়ের আলোটা নিভিয়ে দিল। বাইরে ঝড় এবং ঝড়ের গতি বাড়ছে। সুতরাং ওদের কথাবার্তার শব্দ ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। বড় মিস্ত্রি ফস করে লাইটার জ্বালিয়ে একটা চুরুট ধরালেন। ওদের মুখ এখন বীভৎস রকম দেখাচ্ছে।
বিজন বলল, স্যার এক কাজ করেন?
এখন কোনো কাজের কথা নয়, সুখানী তুমি বড় বেশি কথা বল।
বিজন কোনো জবাব দিল না অথচ মনে মনে গাল দিল। বেঢপ মোটা বামন।
দেখ সুখানী, আমার ভাড়া করা স্ত্রী যদি কাল জাহাজে আসে, তুমি আবার এ সব ঘটনার কথা বলে দিও না। মেয়েটি খুব সুন্দর। বছর পাঁচেক আগে নাইট ক্লাবে ওর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বুঝলে সুখানী, তুমি তো মদ খাও না অথচ মেয়েমানুষের শরীর পেলে পেটুকের মতো কথাবার্তা বলো।
বিজন বলল, স্যার, আপনি আমার ওপরওয়ালার ওপরওয়ালা। আপনার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথাবার্তা বলতে ভয় হয়।
সুখানী, আবার তোমার সেই বেশি কথা।
সুতরাং ভয়ে ভয়ে বিজন টুলটা ধরে রাখল। অ্যালওয়ে অন্ধকার বলে ওরা পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছে না।
আমাকে টুলে উঠতে সাহায্য করো। ফের ধমক দিলেন বড় মিস্ত্রি।
চিফ টুলের উপর উঠে সেই ঘুলঘুলিতে চোখ রাখতে গিয়ে বুঝতে পারলেন যে তিনি এই হালকা টুলে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারবেন না। শরীর টলছিল। তিনি একটি শক্ত টুল অন্বেষণ করলেন। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, শক্ত টুল নেই সুখানী?
আছে স্যার। কসপের ঘরে একটা শক্ত টুল আছে। কসপকে ডেকে তুলব?
না, দরকার নেই। বেশি হইচই করো না, সকলে, কুকুরের মতো এখানে এসে ভিড় করবে। এবং কাপ্তান জানলে রাগ করবেন।
বড় মিস্ত্রি এবার টুল থেকে নেমে পড়লেন। ফিস ফিস করে বললেন, বরং তুমি দেখ ওরা কী করছে। যা দেখবে, সব বলবে। কিছু লুকোলে আমি ধরতে পারব।
বিজন টুলের উপর উঠে ঘুলঘুলিতে চোখ রাখল। গরম হাওয়া ভিতর থেকে বের হয়ে আসছে। স্টুয়ার্ড এবং মেয়েটি সন্তর্পণে এখন কী যেন লক্ষ্য করছে। খরগোসের মতো ভীত চোখ নিয়ে কী যেন দেখছে। ওরা তাড়াতাড়ি উঠে বসল। বোঝা যাচ্ছে দুজনই উলঙ্গ। ওরা পরস্পর কী বলছে বুঝতে পারছে না বিজন।
বিজনকে কিছু বলতে না দেখে বড় মিস্ত্রি ক্ষেপে গেলেন।—সুখানী, তুমি নেমকহারাম, পাজি। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলছেন।—তুমি নিজে সব দেখছ অথচ আমাকে কিছু বলছ না।
স্যার, ওরা এখন উঠে বসল।
তারপর সুখানী?
ওরা বোধহয় টের পেয়েছে।
মেয়েটি দেখতে কেমন সুখানী?
রোগা স্যার। মেয়েটি এখন আবার কম্বল টেনে শুয়ে পড়ল।
চিফস্টুয়ার্ড তখন ভিতরে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলছিল, মর্লিন, কারা যেন বাইরে কথা বলছে। যদি টের পায় তবে নিশ্চয় হামলা করবে।
মর্লিন উঠতে চাইল না। বলল, শরীর আর দিচ্ছে না। বাইরে ঝড়, নতুবা চলে যেতাম সুমিত্র।
সুমিত্র খুব দুঃখের সঙ্গে একটা হাত ওর স্তনের নিচে রাখল এবং কাছে টানল। বলল, অ্যালওয়েতে এখনও যেন কারা চলাফেরা করছে। কথা বলছে। অনেকক্ষণ থেকে এটা হচ্ছে। দরজা খুলে দেখব?
এই সুখানী, হারামজাদা! তুমি আমাকে বাগে পেয়ে খুব কলা দেখাচ্ছ হে।
স্যার, ওরা কিছু করছে না।
নিশ্চয় করছে। তুমি আমায় মিথ্যা কথা বলছ।
ভেতরে মেয়েটি বলল, না, আমার শরীর ভালো নেই সুমিত্র। ঠান্ডায় জমে গেছিলাম। এই ঘর আমাকে উত্তাপ দিচ্ছে। আমি আজ আর একটি লোককেও সামলাতে পারব না। সে অন্য পাশ ফিরে ঘুমোবার চেষ্টা করল। চিফ স্টুয়ার্ড সুমিত্র হাঁটু ভাঁজ করে রাখল মেয়েটির নিতম্বের নিচে এবং বুকে হাত রেখে ঘন হয়ে শুতে চাইল। অথচ শান্তি পাচ্ছিল না। সে ফের উঠে বসল। পোর্টহোল খুলে সমুদ্রের গর্জন শুনতে চাইল। ওর শরীর নগ্ন। ঠান্ডা হাওয়া ওকে কাঁপিয়ে তুলছে। স্টুয়ার্ড তাড়াতাড়ি রাতের পোশাক পরে বেসিনে হাত ধুতে গিয়ে শুনল, বাইরে চেঁচামেচি, সুতরাং সে একটা হাই তোলার চেষ্টা করল।
স্যার, আমি মিথ্যা বলছি না।
তুমি আলবাৎ বলছ। খুব আস্তে অথচ ক্ষুণ্ণ গলায় বললেন বড় মিস্ত্রি।
বিজন মরিয়া হয়ে বলল, বলেছি তো বেশ করেছি।
বেশ করেছ! তুমি বেশ করেছ! আচ্ছা… এইটুকু বলে বড় মিস্ত্রি কড়া নাড়লেন, স্টুয়ার্ড, দরজা খোল। আমি বড় মিস্ত্রি। কিন্তু ভিতর থেকে কোনো শব্দ হল না বলে তিনি ফের বললেন—আমি। স্টুয়ার্ড আমি কোনো হামলা করব না। তুমি বললে আমি তিন সত্যি করতে পারি।
তুষারঝড় সকলকেই নিঃসঙ্গ করে রেখেছে। দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রা অতিক্রম করার পর এই বন্দর, বন্দরে আলো অথবা কোনো রাস্তার নিচে বেশ্যা রমণীর আপ্যায়ন ওদের জন্য প্রতীক্ষা করল না। বড় সাহেবের ডেসি আসেনি, সুখানী বাইরে গিয়ে একটু মদ গিলতে পারেনি অথবা রমণীর মুখ দর্শন যেন কত কাল পর, কত দীর্ঘ সময় ধরে ওদের নোনা জলের চিহ্ন মুখে, রমণীর নরম নরম মুখ এবং চাপ চাপ আস্বাদন সবই কোন অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত।
