এই দিকের কেবিনগুলি ফাঁকা। স্টুয়ার্ডের একমাত্র কেবিন, পরে ডাইনিং হল, সামনে ছোট ঘর অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য। ডেকের নিচে মাংসের ঘর তারপর সোজা সব ফাঁকা কেবিন, কারণ এই শীতের অঞ্চলে কোনো যাত্রী ওঠেনি। কেবিনে সুতরাং কোনো মানুষের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। স্টুয়ার্ড এসব জেনেই মেয়েটিকে অন্ধকার জেটির ওপর থেকে তুলে সিঁড়ি ধরে জাহাজে নিয়ে এসেছিল—কারণ সে জেটি থেকে তখন দেখেছে গ্যাঙওয়েতে কোয়ার্টার মাস্টার নেই, সুতরাং এটাই উপযুক্ত সময়। সে সময়ের সদ্ব্যবহার করেও কোনো ফল লাভ করতে পারল না, এত সতর্কতা তবু সব কেমন ফাঁস হয়ে গেল! চিৎকার এবং হামলা আরও বেশি হতে পারে ভেবে সে দরজা খুলে দিল। ভয়ানক শীত এই অ্যালওয়ের অন্ধকারে। কেবিনের আলোতে সে বড় মিস্ত্রির পাথরের মতো চোখ দুটো দেখল। এই সময় চিফস্টুয়ার্ডকে অদ্ভুত রকমের তোতলামিতে পেয়ে বসল।
বড় মিস্ত্রি কেবিনের ভিতর ঢুকে গেলেন। বললেন, আমি তিন সত্য করছি স্টুয়ার্ড, আমি কোনো হামলা করব না। আমাকে একটু সুখ দাও। আমি তবেই চলে যাব। কেমন বেহায়া এবং নির্লজ্জ ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেন বড় মিস্ত্রি। তিনি ধমকের সুরে বিজনকে ডাকলেন, এসো। নচ্ছার সব জাহাজি। এটা তোমার বাড়ি নয় সুখানী! এখানে মা বাবা ঘুলঘুলি দিয়ে দেখতে আসবে না, এসো।
সুখানী ভালো ছেলের মতো বড় মিস্ত্রিকে অনুসরণ করল। সে কেবিনের ভিতর ঢুকল না। সে দরজার একটা পাল্লা ধরে উঁকি দিল মাত্র। স্টুয়ার্ডের সবকিছু দেখছে। ভয়ে ওর তোতলামি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। বড় মিস্ত্রির চোখ দুটো চক চক করছে এবং হননের ইচ্ছাতে একাগ্র। জানোয়ারের মতো উদগ্র লালসা মুখে, অবয়বে। সে দেখল, বড় মিস্ত্রি চেয়ার টেনে বসেছেন, দেয়ালে বিচিত্র সব নগ্ন ছবি এবং এই বাংকের অন্য পাশে মর্লিন—ওর কোমল ত্বকের গন্ধ অথবা মুরগির মতো নরম কলজের উত্তাপ বড় মিস্ত্রিকে এতটুকু অন্যমনস্ক করছে না। সে ঘরের ভিতর নিমন্ত্রিত অতিথির মতো বসে থাকল।
মর্লিন কম্বলের ভিতর থেকে উঁকি দিল। ওর সোনালি চুল বালিশের উপর, ওর নীল চোখ শান্ত। বড় মিস্ত্রির বিদঘুটে শরীর ক্রমশ পাশবিকতায় আচ্ছন্ন হচ্ছে। মর্লিন কম্বলের ভিতরে এসব দেখে ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে। সে অন্য একটি মুখ দেখল দরজার পাশে। সে মনে মনে বড় মিস্ত্রিকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাইল, ম্যান, আমি জানি তোমাকে নিয়ে কোন কোন ভঙ্গিতে ক্রীড়াচাতুর্য প্রদর্শন করলে তুমি দু’বার, তিনবার অত্যধিক চারবার… কিন্তু শরীর ভালো নেই, বড় কষ্ট এই শরীরে, শীতে শরীর মুখ বিবর্ণ এবং ভিতরে ভয়ানক যন্ত্রণায় ভুগছি। তুমি আজকের মতো রেহাই দাও। এই দুর্যোগ যাক, বসন্ত আসুক—তখন তোমার কত টাকা আমার কত সুখ বিদ্যমান, দেখাব। অথচ মর্লিন কিছু বলতে পারছে না। ভয়ে ওর শরীর কেবল গুটিয়ে আসতে থাকল।
সুখানী দেখল, বড় মিস্ত্রি কেমন পাগলের মতো করছেন। পোশাক আলগা করার সময় তিনি দরজা খোলা কী বন্ধ পর্যন্ত দেখছেন না। সুতরাং সুখানী নিজেই দরজাটা টেনে দিল।
বড় মিস্ত্রি দুটো শক্ত হাত ওর সোনালি চুলের ভিতর ঠেসে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়লেন। তিনি মর্লিনের চুলের ভিতর মুখ গুঁজে দিলেন। মর্লিন মৃতপ্রায় পড়েছিল। বড় মিস্ত্রি কম্বলটা শরীর থেকে বাঁ হাতে ঠেলে দিলেন। ঠোঁট দুটো নীল, বিবর্ণ। ঠোঁট দুটো কামড়ে দেবার সময় দেখলেন, কেমন সাপের মতো পিছলে যাচ্ছে। অত্যন্ত ক্ষীণ গলায় বলছে, ম্যান আমাকে মেরে ফেলো না। আমি আর পারছি না।
মর্লিনের মুখ থেকে তখন থুথু উঠছিল। বাইরে বড় মাস্টের আলোগুলো দুলছে। মেসরুমে বাতি জ্বলছিল। মনসুর আসবে এ সময়। ওর এখন ওয়াচ। মনসুরকে ডাকতে হবে। যতক্ষণ না ডাকবে ততক্ষণ মনসুর শুয়ে থাকবে। সুতরাং সুখানী বিরক্ত হচ্ছে। বড় বেশি সময় নিচ্ছে বড় মিস্ত্রি। সুখানী দরজা ঠেলে উঁকি দিতেই দেখল বড় মিস্ত্রি বড় বেশি বেহুঁস। সে ভিতরে ঢুকে পড়ল। মর্লিনের শরীর থেকে সুখানী বড় মিস্ত্রিকে শক্ত হাতে ঠেলে ফেলে দিল। তারপর টানতে টানতে দরজার বাইরে এনে বলল, আপনি দাঁড়ান। বেশি ইতরামি করলে ভালো হবে না। বলে সে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
বড় মিস্ত্রি অবনীভূষণ অসহায় পুরুষের মতো স্টুয়ার্ডকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখলে কাণ্ডটা, কাল আমি ওকে দেখব।
স্টুয়ার্ড বলল, বড় দুর্বল স্যার। শীতে কষ্ট পাচ্ছিল। আমি জাহাজে তুলে এনেছি। টাকা তো মুফতে দেওয়া যায় না। তাই রয়ে সয়ে একটু সুখ নিচ্ছিলাম।
ওরা দুজনই চুপচাপ বালকেডে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল।
স্টুয়ার্ড অত্যন্ত বিচলিতভাবে কথা বলতে থাকল, স্যার, এটা অত্যাচার হচ্ছে ওর উপর। একটা রুগণ মেয়েকে দীর্ঘ সময় ধরে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।
তার জন্য আমি কী করতে পারি। বলে, তিনি অ্যালওয়েতে পায়চারি করতে থাকলেন। অন্ধকার আলওয়েতে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সেই থেকে থেকে আগের মতো সমুদ্রগর্জন ভেসে আসছে। তুষারঝড়ের গতি কমছে কী বাড়ছে অন্ধকার পথে দাঁড়িয়ে বড় মিস্ত্রি টের করতে পারলেন না। তিনি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিরক্ত গলায় বললেন, সুখানী বড় দেরি করছে। স্টুয়ার্ডের দিকে এখন নজর বড় মিস্ত্রির। স্টুয়ার্ড এখনও কিছু বলছে না।
