বিজন এই ফাঁকটুকুতে দাঁড়িয়ে শান্তি পাচ্ছে না। পোর্টহোলের কাচে মুখ রাখা যাচ্ছে না। পোর্টহোলের কাচে কিছুই দেখা যাচ্ছে না—সে এই কেবিনের একটা রন্ধ্রপথ খোঁজার জন্য খুব সন্তর্পণে দেয়াল হাতড়ে বেড়াতে লাগল। দরজার পাল্লা ধীরে ধীরে একটু ফাঁক করতে গিয়ে বুঝল দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ভিতরে এবং বাইরে আলো বলে বিজন বুঝতে পারছে না, বিজন এবার বাইরের আলো নিভিয়ে এক ঘন অন্ধকার সৃষ্টি করতেই দেখল পোর্টহোলের উপরে যেখানে স্টিম পাইপ আছে তার পাশে গোলাকার ছিদ্রপথ। সে তাড়াতাড়ি টুলটা গ্যাঙওয়ে থেকে নিয়ে মই বেয়ে ওঠার মতো উঠল। মুখটা কিঞ্চিৎ ঢুকিয়ে দেখল ওরা দুজনই পাশাপাশি শুয়ে আছে। ওরা উভয়ে রাতের প্রথম প্রহরে বোধহয় যৌনক্রিয়ায়û মুখর ছিল। এখন শান্ত। এখন ঘর এবং ঘরণীর মতো ওদের মুখচ্ছবি। কোনো অপরাধবোধের চিহ্ন নেই মুখে। যেন কত দীর্ঘ দিনের আলাপ, যেন কত দীর্ঘদিনের প্রেম এবং সহিষ্ণুতা উভয়কে গভীর শান্তিতে আচ্ছন্ন রেখেছে। বিজন, কম্বলের নিচে ওদের নগ্ন এমন এক ছবির কথা চিন্তা করে টুল থেকে নেমে পড়ল। ওর ওয়াচ শেষ হবে এখন। সুতরাং এই নগ্নতা দর্শনে তৃপ্তি নেই, এতে শুধু উত্তেজনা বাড়ে। মেয়েটির রুক্ষ চুলে সুমিত্রর মোটা শক্ত হাত। অন্য হাতটি কম্বলের নিচে নড়ছিল… কম্বলের নিচে মেয়েটির তলপেটের কাছাকাছি কোথাও ইঁদুরের মতো ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে অথবা যেন শরীরের সকল কুশল চিন্তার কথা ভুলে সারারাত যৌনসংযোগে মগ্ন থাকলে সকলই সুখের আকর…. বিজন আর ভাবতে পারল না, সে তাড়াতাড়ি টুলটা হাতে নিয়ে কেবিনের পাশ থেকে সরে গিয়ে কিঞ্চিৎ ছুট দিল। সে ছুটতে ছুটতে বড় মিস্ত্রির কেবিনের পাশে এসে দাঁড়াল এবং বলতে চাইল, স্যার আমি… আমি যথার্থ কথা বলিনি।
এখন বড় মিস্ত্রি দরজা খুললে বলতে হবে স্টুয়ার্ডের ঘরে চটুল রমণী স্টুয়ার্ডকে পতিব্রতা ভার্যার প্রেম এবং সুখ বিতরণ করছে। সুতরাং কাল ভোরে আপনার দরজার পাশ দিয়ে একজন চটুল রমণী উঁচু জুতো পরে এবং নিতম্বে রস সঞ্চার করতে করতে জেটিতে নেমে যাবে তারপর আমি অভিযোগের করুণ বিষোদগারে জর্জরিত হব, সে ঠিক নয় স্যার। সুতরাং সকল ঘটনার কথা খুলে বলাই ভালো।
সে ডাকল, সাব।
কে বাইরে? কম্বলের ভিতর থেকেই বড় মিস্ত্রি চোখ পিট পিট করে তাকাতে থাকলেন।
আমি স্যার, সুখানী।
ঘরে এসো। শরীরটা বড় খারাপ বোধ হচ্ছে।
বিজন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল এবং বলল স্যার, আমি যথার্থ কথা বলিনি।
যথার্থ কথা বলিনি! তবে আস্তে বলো। দরজাটা ভেজিয়ে দাও। বড় ঠান্ডা হাওয়া আসছে। বাইরের তুষারঝড়টা মনট্রিলের দিকে যাচ্ছে না তো, অথবা ভ্যানকুবার থেকে জাহাজ আসার কথা ছিল—ওরা কিছু মেয়ে আমদানি করতে পারে হয়তো।
না স্যার। সেসব কথা আমি বলছি না। আমাদের জাহাজে এই ঝড়ের মধ্যেও একজন মেয়ে উঠে গেছে। মেয়েটা চিফস্টুয়ার্ডের কেবিনে আছে।
এমত কথায় বড় মিস্ত্রি অবনীভূষণের চোখ গোল হয়ে উঠল। ওঁর বাসি দাড়িগুলি লম্বা হয়ে গেল যেন। তিনি বললেন, এই ঝড়ের রাতে!
আজ্ঞে স্যার।
ভালো কথা নয়।
নয় স্যার।
তুমি দেখলে?
আজ্ঞে দেখলাম স্যার। টুলের উপরে উঠে উঁকি দিয়ে দেখতে হল ঘুলঘুলিতে।
ওরা কী করছে। অবনীভূষণ ঢোক গেলার মতো মুখ করে থাকলেন।
বিজনকে কিঞ্চিৎ লজ্জিত দেখাচ্ছে। সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, আমি যাই স্যার।
তুমি তো খুব স্বার্থপর লোক হে। আমি একটু দেখতে যাব ভাবছি আর তুমি কিনা বলছ আমাকে একা ফেলে চলে যাবে!
আমার ওয়াচ শেষ হতে দেরি নেই স্যার।
আরে চলো। বলে তিনি কম্বল ছেড়ে উঠে পড়লেন। ওভারকোট গায়ে জড়িয়ে বললেন, দেখা যাক না ঘটনাটা কেমনভাবে ঘটেছে। বুঝলে সুখানী, ডেসি নামে একটি মেয়ে আমার কেবিনে আসার কথা ছিল। সেজন্য আমার ঘুম আসছে না। আর ডেসি মেয়ের মতো মেয়ে বটে। ডেসি বেশ্যামেয়েদের মধ্যে প্রথম শ্রেণীর। সে এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেতে পারে। এক এক রাতে পাঁচটা সাতটা লোককে সে হজম করতে পারে।
তাই বুঝি স্যার! সুখানীকে এ সময় ভয়ানক বোকা বোকা লাগছিল।
একে, দেখে কেমন মনে হল?
স্যার, ওরা এখন শুয়ে আছে। তবে ঘুমোয়নি। ঘুমোলে, কম্বলের নিচে স্যার ইঁদুর নাচত না।
রাত গভীর এবং ঝড়ের গতি বাড়ছে। অ্যালওয়ের দরজা বন্ধ। ঝড়টা ভিতরে ঢুকতে পারছে না অথচ বাইরে ভয়ংকর শব্দে যেন আকাশ ফেটে পড়ছে। যেন জাহাজের মাস্তুল এবার ভেঙে পড়বে। ওরা দুজনে সন্তর্পণে এনজিন রুমের পাশ দিয়ে হেঁটে চলল, উভয়ে হেঁটে যেতে থাকল। পাশের কেবিনগুলোর দরজা বন্ধ। অবনীভূষণ খুব মদ টেনেছিলেন বলে গতিতে শ্লথ ভাব। অথবা বয়সের ভারে ঠিকমতো যে হেঁটে যেতে পারছেন না। তিনি বালকেড ধরে ধরে হাঁটছিলেন। শরীরের ওজন ভয়ানক, হাত পা শক্ত এবং নিবিড় এক মদিরতা ওঁকে এই গতির ভিতর আচ্ছন্ন করে রাখতে চাইছে।
বড় মিস্ত্রি চলতে চলতে খুব আস্তে এবং জড়ানো গলায় বললেন, আমার শরীরটা কিঞ্চিৎ মোটা হয়ে গেছে। এতবার এনজিন রুমে নামা—ওঠা করি তবু ভুঁড়ির হেরফের হচ্ছে না। আপদ!
হ্যাঁ স্যার, আপদ!
পেট মোটা থাকলে যৌনতায় আনন্দ পাওয়া যায় না। তৃপ্তি নেই।
বিজন ভাবল, লোকটা মদ খেয়েছে বলে এত কথা বলছে। কারণ সুখানী জানত দিনের বেলাতে বড় মিস্ত্রি অবনীভূষণ গোমড়ামুখো। কোনো কথা নেই—তিনি চুপচাপ এনজিনে নেমে যান অথবা বাংকে শুয়ে শুয়ে অশ্লীল সব বই পড়েন। অথবা ব্রিজের নিচে ছোট একটা ডেকচেয়ারে বসে পাইপ টানতে টানতে দূরের বন্দর, পাইন গাছ এবং সমুদ্র দেখেন। কোনো কথা বলেন না, কোনো হাসি—ঠাট্টা করেন না জাহাজিদের সঙ্গে। তখন তিনি যথার্থই বড় মিস্ত্রি জাহাজের।
