বিজন গ্যাঙওয়ের পথ ধরে ফিরছিল। গ্যাঙওয়েতে তুষারঝড়টা মুখোমুখি লাগছে। সুতরাং সে হাঁটতে হাঁটতে চিফ কুকের গ্যালিতে চলে এল। হাত পা সেঁকল এবং চা করে আবার সেই শীতের রাজ্যে ঢুকে জাহাজটা পাহারা দেবার সময় দেখল, দূরে কোথাও কোনো আলোর রেখা ফুটে উঠছে না। তুষার—ঝড়ের জন্যে সব কেমন অন্ধকারময়। বসে বসে সে ঝড়ের শব্দ শুনল, সমুদ্র দূরে গর্জন করছে। জাহাজটা নড়ছিল। যেন জাহাজটা হাসিল ছিঁড়ে এবার ছুটবে অথবা জাহাজের শরীরে এক রকমের শব্দ, যা বিজনকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে। মাস্টের আলোগুলি দুলছিল—সে দেখতে পেল। বন্দরের আলোগুলি অস্পষ্ট, বরফের কুচি ওদের অস্পষ্ট করে রেখেছে। সে হাতের দস্তানাটা এবার আরও টেনে দিল।
নিচেও কোনো লোক চলাচল করছে না। ক্রেনগুলো দৈত্যের মতো এই জেটির সকলকে তুষারঝড়ের ভিতর পাহারা দিচ্ছে। উইংসের আলো জ্বলছে না। শুধু জাহাজটা নড়ছিল। এতদিনের এই সমুদ্রযাত্রা এবং প্রপেলারের শব্দ, এনজিন রুমের শব্দ তারপর সমুদ্রের ঢেউ—সবই কেমন নিঃশেষ হয়ে গেছে। সবই কেমন রাতদুপুরে মাঠের নির্জনতায় ডুবে যাওয়ার মতো। সে এবার ধীরে ধীরে উঠল। বসে থাকলেই শীত বেশি করছে। সে পায়চারি করতে লাগল। এবং ডেক পার হলে গ্যালি, পরে সব জাহাজিদের ফোকসাল। বিজন এত দূর পর্যন্ত হেঁটে গেল না। সে পোর্টহোলের কাচের ভিতর দিয়ে বড় মিস্ত্রির কেবিন দেখল। ওর ঘরে নীল লাল মিশ্রিত এক ধরনের আলো। বড় মিস্ত্রি অবনীভূষণ এত রাতেও একটা বই পড়ছেন। অশ্লীল সব বই এবং নগ্ন সব ছবি দেয়ালে দেয়ালে। বড় মিস্ত্রি জাহাজ নোঙর করলে ঘন ঘন রেলিংয়ে ভর করে দূরে কিছু যেন প্রত্যক্ষ করছিলেন। প্রত্যাশা যেন কিছুর। অন্ধকার জেটিতে কিছু আবিষ্কারের জন্য পাগল। বিজন বলেছিল, স্যার, বন্দরে কেউ নেই। খালি।
কেউ নেই! কথাটা তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
যথার্থই কেউ নেই স্যার।
অবনীভূষণ চোখের চশমা খুলে রুমালে মুছতে মুছতে কথাটা অবিশ্বাস করার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ডেসির আসার কথা অথচ ডেসি এল না। তিনি বিড় বিড় করে তুষারঝড়কে ধিক্কার দিচ্ছিলেন। ডেসি এলে এই জাহাজ মনোরম… বড় কামুক গন্ধ এই জাহাজের অলিগলিতে, নোনা জলের ঘন রঙ অথবা সমস্ত বিষাদ সমুদ্রের—ডেসি একা সামলাত। ডেসি এলে ওর ঘরে রাত যাপনের প্রশ্ন উঠত। অন্যান্য সফরের মতো বন্দরের দিনগুলো উপভোগের সুখ পেত। বড়ই দুঃসময়, এমনকি বেশ্যামেয়েরা পর্যন্ত ঘর থেকে বের হচ্ছে না, কী অনাবশ্যক দিন—শুধু তুষারঝড়, বরফের কুচি উড়ছে আর রাত বলে, আলো কম বলে সমস্ত শহরটা অদ্ভুত রহস্যময় ঠেকছে। দূরে ইতস্তত কোনো কুকুরের চিৎকার, গির্জাতে ঘণ্টা বাজছে এবং অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি যাচ্ছে, জেটিতে একটা মাতাল পুরুষকে পর্যন্ত দেখা গেল না। কী অবিশ্বাস্যভাবে নসিব বদলা নিতে শুরু করেছে। ডেসির জন্য এই প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে বড় মিস্ত্রি রেলিংয়ে ভর করে প্রতীক্ষা করছিলেন। উত্তেজনায় শরীর অধীর হচ্ছিল। কারণ উত্তর অঞ্চলের অন্য বন্দরে ডেসির চিঠি ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল—চিফ, জাহাজ তোমার ভিড়বে রাতে। যত প্রতিকূল অবস্থাই হোক না, আমি উপস্থিত থাকব জেটিতে। তোমাকে নিয়ে ঘরে ফিরব। চিঠিতে সে ওর বেড়ালের জন্য বড় মিস্ত্রিকে কড মাছের চর্বি আনতে লিখেছিল।
বড় মিস্ত্রি অশ্লীল পুস্তকের ভিতর থেকে ডেসির তলপেটের গন্ধ নিচ্ছিলেন যেন। এবং এ সময়ে পোর্টহোলে প্রতিবিম্ব পড়তেই তিনি প্রশ্ন করলেন, কে?
আমি স্যার, সুখানী। বিজন বলল।
অবনীভূষণ শান্ত গলায় বললেন, সুখানী, আমাকে একটু চা খাওয়াবে ভাই। রাত অনেক হল। ঘুম আসছে না। আর এই রাতে বয়দের জ্বালাতন করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
বিজন ফের চিফ কুকের গ্যালিতে ঢুকে গেল। চা করল, তারপর চিফ এনজিনিয়ারের দরজাতে দাঁড়িয়ে ডাকল, আপনার চা এনেছি স্যার। দরজা খুলুন।
বড় মিস্ত্রি ভিতর থেকে বললেন, দরজা খোলাই আছে, ভিতরে এসো।
বিজন দরজার ভিতর ঢুকে দেখল, নীল কাচের গেলাসে এখনও লিকার পড়ে আছে। সে টিপয়তে চা রাখল। তারপর বের হতেই শুনল, তিনি ডাকছেন, সুখানী। সুখানী কাছে গেলে বললেন, কোথাও কেউ নেই?
না স্যার।
কোনো ঘরে কেউ আসেনি?
না স্যার।
যথার্থ কথা বলছ?
হ্যাঁ, স্যার। কোনো কেবিনে কেউ আসে নি।
কাপ্তানের ঘর?
ঘর ফাঁকা স্যার।
ঠিক আছে, যাও। বড় সাব অবনীভূষণ কেবিনের সোফায় বসে চা খেলেন। রাত এখন কত? কাচের ঘরে ঘড়ির কাঁটা নড়তে দেখলেন। রাত বারোটা বেজে গেছে। সমুদ্রে এবার একনাগাড়ে কত দিন? দশ মাসের উপর হবে। হোম থেকে কবে বের হয়েছেন—কত কাল আগের যেন সেইসব দিন, সেইসব বন্দর এবং স্ত্রীর কালো দুটো চোখ এখন পোর্টহোলের কাচে দৃশ্যমান। শরীরে তার যৌবন নিঃশেষ অথচ প্রেমটুকু আলোক—উজ্জ্বল দিনের মতো। সবই তিনি স্মরণ করতে পারছেন অথচ ডেসি এল না—ডেক ছাদে কার পায়ের শব্দ। তিনি এবার কম্বল টেনে শুয়ে পড়লেন। কারণ বাইরে তখনও তুষারঝড় হচ্ছে।
বিজন তুষারঝড়ের জন্য চিফ স্টুয়ার্ডের কেবিন এবং অ্যালওয়ের ফাঁকটাতে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকল। এই ফাঁকটুকু থেকে গ্যাঙওয়ে স্পষ্ট। ওর শরীরে এখন ঠান্ডা হাওয়া লাগছে না। জাহাজ কতদিন পর বন্দর পেল অথচ দুর্যোগের জন্য জাহাজিরা কিনারায় নামতে পারছে না। কাল সকালে এবং অপরাহ্ণ বেলায় যখন জাহাজিরা একে একে জাহাজ খালি করে বন্দরে মানুষজন গাছপালা মাটির টানে নেমে যাবে, তখন ওরা কিংস পার্কে অথবা সান্তাক্লজের চূড়ায় উঠে শহর দেখবে তখন… তখন বিজনের বড় ইচ্ছা এই ঠান্ডায় কোনো যুবতীর উত্তাপ, কাপ্তানের ইচ্ছা কিছু উত্তাপ…. তখন বিজন পাশের কেবিনে বড় পরিচিত শব্দ শুনল। শব্দটা মধুর। শব্দটা ভীষণ উত্তেজনাময়—সে স্থির থাকতে পারছে না। সে ধীরে ধীরে দরজায় কান পেতে শুনতে চাইল—কিছুই শোনা যাচ্ছে না, অস্পষ্ট। সে এ সময় অধীর যুবকের মতো দেয়ালে হাত রাখল।
