বুড়ো কাপ্তান—বয় এসে সুমিত্রর পাশে বসল।
কিছু খবর আছে চাচা?
না। আমি বুঝি কেবল তোমার দুঃসংবাদই বয়ে আনছি?
তেমন কথা কি আমি বলেছি?
কী জানি বাপু, কেবল খবর আর খবর!
চেরি কী করছে চাচা?
সারাদিন বাইবেল পড়ছে।
আমার কথা কিছু বলছিল?
না।
সুমিত্র পাশ ফিরে শুলো। কোনো প্রশ্ন করার ইচ্ছা নেই। কেবল পড়ে পড়ে ঘুমোতে ইচ্ছা হচ্ছে। বন্দরে জাহাজ নোঙর করলে কোনো পাব—এ ঢুকে মদ খাওয়ার শখ হচ্ছে।
বিকেলে সুমিত্র উপরে উঠে গেল। অ্যাফটার—পিকে ভর করে দাঁড়াল। দূর সমুদ্রে পাইলট—জাহাজটা যেন উড়ে চলে আসছে। এ—সময় চেরিকে দেখার প্রত্যাশা করল সুমিত্র। চেরি ওর আত্মীয়ের জন্য গাঙওয়েতে অপেক্ষা করবে। অথচ চেরি নেই। চেরি এখনও কেবিনে পড়ে আছে। সুমিত্র দেখল পাইলট—জাহাজ থেকে ওর আত্মীয়া—পিসি এবং সেই যুবক উঠে আসছে। হাতে বড় বড় দুটো গোলাপের কুঁড়ি। পাইলট সকলের শেষে উঠে এল। কাপ্তান ওদের সকলকে সঙ্গে করে অ্যালওয়েতে ঢুকে গেলেন। সুমিত্র এইসব দেখে কেমন বিমর্ষ হয়ে গেল।
সুমিত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাপ্তান—বয় এবং মেসরুম মেটের সব কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। পাশাপাশি অন্যান্য জাহাজিরাও এসে ভিড় করেছে। জাহাজিরা সুমিত্রকে কোনো প্রশ্ন করছে না। এইসব ঘটনা ওদের সকলকেই অল্পবিস্তর দুঃখ দিচ্ছে। তখন ওরা সকলেই দেখল চেরি এবং ওরা দুজন, কাপ্তান, বড় মিস্ত্রি, পাইলট—ডেক ধরে হাঁটছে। সুমিত্র তাড়াতাড়ি জাহাজিদের ভিতর নিজেকে আড়াল করে ফেলল। সে চেরিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, চেরি সমুদ্রযাত্রায় যেন ভয়ানক দুর্বল। এখন ওরা পরস্পর বিদায়—সম্ভাষণ জানাচ্ছে। ওরা নেমে গেল। সুমিত্র চেরিকে দেখতে পাচ্ছে না এখন। সে ফের নিচে নেমে বাংকে শুয়ে পড়ল।
চেরি চোখ তুলে এই জাহাজের ডেকে কিছু অন্বেষণ করতে গিয়ে গলায় এক দুঃসহ আবেগের কান্না অনুভব করল—কোথাও কোনো অমৃতের চিহ্ন নেই। চোখ দুটো সজল হতে হতে এক রুদ্ধ আবেগে চেরি ভেঙে পড়ল। এই ঘটনায় প্রিয়জনেরা উদ্বিগ্ন; ভাবল, শারীরিক কুশলে নেই চেরি; ভাবল, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর প্রিয়জন দর্শনে কোনো পরিচিত আবেগের জন্ম হচ্ছে শরীরে। কাপ্তান নিজেও এই বিচ্ছেদটুকু লালন করতে পারলেন না। তিনি ইচ্ছা করে পাইলটের সঙ্গে জাহাজ—সংক্রান্ত কথাবার্তা আরম্ভ করলেন। কাপ্তান—বয় যখন বখশিশ নিয়ে উঠে আসছিল, চেরি সন্তর্পণে তাকে কাছে ডাকল। একটি চিরকুট দিল, গোলাপের কুঁড়ি দুটো দিল, অথচ কোনো নির্দেশ দিল না, তারপর চেরি পাইলট—জাহাজের পাটাতনে নেমে ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে মুহ্যমান। কিছুই এখন সে দেখতে পাচ্ছে না যে, যেন এক রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে ছুটে ছুটে সমুদ্র অতিক্রম করছে এবং হিমালয়ের পাদদেশে গিয়ে আর পথ খুঁজে পাচ্ছে না, তাই ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে দিয়ে চেরির দিকে অনিমেষ নয়নে চেয়ে আছে।
কাপ্তান—বয় ফোকসালে ঢুকে বলল, এই নাও তোমার বকশিশ। বলে, গোলাপের কুঁড়ি দুটো এবং চিরকুটটি পাশে রাখল।
সুমিত্র বলল, পাইলট—জাহাজটা কত দূরে গেছে?
অনেক দূর।
সুমিত্র এবার চিরকুটটি পড়ল।
যখন আমি বুড়ো হব সুমিত্র, যখন নাতি—নাতনিদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে রূপকথার গল্প করব, তখন বলব ভারতবর্ষের এই রূপকথার রাজপুত্র সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে কাকাতিয়া দ্বীপের রাজকন্যাকে খুঁজতে বের হয়েছিল। বলব, ঘোড়ায় চড়ে নয়, রথে চড়ে নয়, জাহাজে চড়ে। বলব, কাকাতিয়া দ্বীপের রাজকন্যাকে খুঁজে বের করেছিল, ভালোবেসেছিল, সোনার কাঠি রুপোর কাঠি নিয়ে হাত বদলেছিল, কিন্তু রুপোর কাঠি ইচ্ছা করেই শিয়রে রাখার চেষ্টা করেনি।
শেষে তার কোনো এক প্রিয় কবির দুটো লাইন লিখেছে,
–Better by far you should forget and smile
Than that you should remember and be sad.
সুমিত্র উপরে উঠে রেলিংয়ে ভর করে দাঁড়াল। দূরে পাইলট—শিপ অস্পষ্ট। ক্রমশ তীরের দিকে চলে যাচ্ছে। মনে মনে সেই লাইন দুটো আবৃত্তি করতে গিয়ে বুঝল, পৃথিবী অমৃতময়। চেরি অমৃতময়। দুঃখ এবং বেদনার কিছুই নেই। পিছনে এ সময় কার হাতের স্পর্শে সে ঘুরে দেখল কাপ্তান ওর পিঠে হাত রেখেছেন, বলছেন, আমার কেবিনে এসো সুমিত্র। আজ আমি তোমাকে খ্রিস্টের গল্প শোনাব।
চার
অবনীভূষণ বিজন এবং সুমিত্রর দীর্ঘদিন জাহাজে কেটে গেছে। অবনীভূষণ এখন প্রৌঢ়। বিজন সুমিত্র উত্তরত্রিশের যুবক। ওরা সফরে ক্রমশ এক প্রাচীন নাবিকের গন্ধ মেখে বন্দর থেকে বন্দরে, এক সমুদ্র থেকে অন্য সমুদ্রে এবং এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে ঘুরছে। তারপর একই জাহাজে ওরা তিনজন একদা দূর সমুদ্রযাত্রায় বের হয়েছিল। সে রাতও তুষারঝড়ের রাত ছিল। সে ঘটনার সাক্ষী অবনীভূষণ ছিল, বিজন ছিল এবং সুমিত্র ছিল। শুধু এ ঘটনা অথবা কাহিনী একা এক অবনীভূষণের থাকছে না, বিজনেরও থাকছে না, এমনকি সুমিত্রেরও নয়। এ ঘটনা অথবা কাহিনী ওদের সকলের এবং সকল মানুষের।
ফোকসালে সকলেই প্রায় ঘুমোচ্ছিল। কারণ দীর্ঘ সমুদ্রাযাত্রার পর এই বন্দরের আলো—ঘর—বাতি সবই কেমন মুহ্যমান এবং তুষারঝড় হচ্ছে। সুতরাং জাহাজিরা বন্দর দেখে খুশি হতে পারল না। ওরা ডেকে পায়চারি করতে করতে বন্দরের গল্প করল না। ওরা শীতে অবসন্ন, ওরা কম্বল মুড়ি দিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকল।
