রাত্রির বিষণ্ণ আলোতে চেরিকে সুখী করার জন্যে সুমিত্র বলল, তোমাকে যদি রাজা—রানির গল্প বলি, তুমি খুশি হবে?
চেরি শুধু চেয়ে থাকল ফ্যাল ফ্যাল করে।
পরদিন ভোরে সুমিত্র টুপাতির কেবিনে ঢুকে বলল, তোমার সময় হবে?
চেরি বলল, আমার হবে, তোমার হবে কী না বল?
আমার আজ থেকে কোনো ওয়াচ থাকবে না।
কেন?
কাপ্তান সারেংকে বলে পাঠিয়েছে, আজ এবং কালকের জন্যে অন্য কাউকে দিয়ে ওয়াচ চালিয়ে দিতে। সুমিত্র আজ বেশ আরাম করে দুটো পা বাংকের উপর তুলে দিয়ে বসল, তারপর ঠাকুমার মুখে শোনা চম্পা এবং আর দুই সখীর গল্প করে চেরিকে আনন্দ দিল। গল্পটা বলতে বেশি সময় নিল না সুমিত্র। বারোটার পর সাহেবদের লাঞ্চ। চেরি খাবে তখন। সুমিত্র এগারোটা বাজতেই উঠে গেল।
বিকেলে বোট—ডেকে গল্প করতে এসে সুমিত্র দেখল চেরি বসে বসে সমুদ্র দেখছে। সে ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর কী ভেবে চলে যাবার জন্যে পা বাড়াতেই ব্রিজে কাপ্তানের গলা পেল।
সুমিত্র, গুড আফটারনুন।
গুড আফটারনুন, মাস্টার।
কাল আমরা বন্দর পাব।
কখন স্যার?
সন্ধ্যায়।
চেরি এখনও চোখ তুলছে না, অথবা ওদের দেখছে না।
কাপ্তান বলল, বেশ সমুদ্রযাত্রা আমাদের। কোনো ঝড় নেই, সমুদ্র একেবারে শান্ত।
মাস্টার, আকাশ খুব পরিষ্কার।
সারা রাতই ডেকে জ্যোৎস্না। মাদাম কী বলেন? চেরিকে উদ্দেশ্য করে কাপ্তান ব্রিজ থেকে কথা বলতে চাইল।
চেরি মুখ না তুলে এক ধরনের সম্মতিসূচক শব্দ করল।
সুমিত্র চলে যাচ্ছিল, চেরি ডেকে বলল, সুমিত্র, কাল আমরা বন্দর পাব।
আশা করছি।
বন্দরে আমার এক আত্মীয়া এবং এক বন্ধু আসবেন রিসিভ করতে, তুমি তাদের সঙ্গে পরিচয় করবে না?
নিশ্চয় করব। কী রকম আত্মীয় হন তাঁরা?
একজন পিসিমা। অন্যজন পিসেমশায়ের দাদার ছেলে। একটা মোটর কোম্পানির পরিচালক।
এইসব কথার ভিতর কেবলই তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। বলো তো আর একটা গল্প শোনাই। খুব আনন্দ পাবে।
না, আর রূপকথা নয়। এবার জীবনের কথা বল। আমি জাহাজ থেকে নেমে গেলে তোমার কষ্ট হবে না?
হবে, খুব কষ্ট হবে।
তোমাকে অযথা মন্দ কথা বলেছি।
এ—কথা এখন আর ভালো শোনাচ্ছে না।
হয়তো আর দেখাই হবে না কোনোদিন। অথচ…
দেখা হবে না কেন? জাহাজে যখন কাজ করছি, তখন নিশ্চয়ই দেখা হবে।
সুমিত্র, তুমি তো জিজ্ঞাসা করলে না তোমার জন্য আমার কষ্ট হবে কি না?
তোমারও হবে। সুমিত্র পাশেই বসে পড়ল। বলল, বেশ সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে।
এই কথা শুনে চেরি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল। অথচ সুমিত্রকে দেখে মনে হল না, সে চেরির বিদায়বেলাতে কোনো দুঃখবোধে পীড়িত হবে। চেরি বলল, আমার কেবিনে এসো। বলে, সে হাঁটতে থাকল।
একটু বসো না, এই সমুদ্র তোমার ভালো লাগছে না?
এখনই সন্ধ্যা হবে। চল, কেবিনে নীল আলো জ্বেলে তোমার গল্প শুনব।
একটা অনুরোধ করলে রাখবে?
বলো। যা বলবে আমি সব করব।
আমাকে ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাবে?
শোনাব। কেবিনে চলো।
কেবিনে নয় চেরি। এই বোট—ডেকে। খোলা আকাশের নিচে বসে।
তাই হবে।
এখন রাত নামছে সমুদ্রে। ফরোয়ার্ড পিকে পাহারা দিতে দুজন জাহাজি চলে গেল। ব্রিজে পায়চারি করছেন মেজ—মালোম। ওরা লাইফ—বোটের আড়ালে বসে আকাশ দেখল, নক্ষত্র দেখল। পরস্পর গল্প করতে করতে একসময় ঘনিষ্ঠ হল এবং পরস্পর হাতে হাত রেখে সমুদ্রের গর্জন শুনল যেন যথার্থই কোনো রাজপুত্র কোটালপুত্র ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে… ছুটছে। চেরি এ সময় গর্ভিণী তিমির মতো উদগ্র আবেগে ছটফট করতে লাগল।
চেরি ভায়োলিন বাজাতে বাজাতে বলল, কেমন লাগছে সুমিত্র?
শীতের নদীতে কাশফুলের রেণু উড়ছে। প্রজাপতি উড়ছে যেন এবং শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে নতুন বউ। কলের গান বাজছে নৌকার পাটাতনে। দুটো ফুটফুটে ছেলেমেয়ে সাদা ফ্রক গায়ে তখন চরের কাশবনে প্রজাপতি খুঁজে বেড়াচ্ছে—টুপাতি চেরির বেহালার বাজনা সুমিত্রর মনে সে রাতে এমন একটা ভাব সৃষ্টি করেছিল।
তারপর অধিক রাতে যখন পরস্পর বিদায় জানিয়েছিল কেবিনে, চেরি সুমিত্রর চোখ দুটোতে চুমু খেল, যে চোখ দুটো দীর্ঘকাল ধরে চেরিকে অনুসরণ করে ফিরছে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জাহাজিরা কিনারা দেখার চেষ্টা করল। আকাশের কিনারায় কোনো দ্বীপ অথবা মাটির রেখা ভেসে উঠছে কি না দেখল। ওরা খবর পেয়েছে, জাহাজ বিকালে নোঙর ফেলবে। এবং রাতে পাইলট—জাহাজ এসে বন্দরে জাহাজ টেনে নেবে। সুতরাং জাহাজিরা মন দিয়ে কাজ করল, ডেকে ফল্কায়, অথবা ড্যারিকে। ফানেলে কেউ রঙ করল। চেরি একবার ডেকে বের হয়ে সকল কিছু দেখে কেবিনে ঢুকে গেছে। এবং সুমিত্র এই ভোরেও বাংকে পড়ে ঘুমোচ্ছে। কাপ্তান—বয় এল এসময়। ফোকসালে ঢুকে ডাকতে থাকল সুমিত্রকে।
সুমিত্র একটা বড় রকমের হাই তুলে বলল, তারপর চাচা, নতুন কিছু খবর আছে?
কাপ্তান যে আবার ডেকে পাঠিয়েছেন।
সুমিত্র ব্রিজে গেলে কাপ্তান বললেন, বিকালে পাইলট ধরবে জাহাজ। সুতরাং তখন থেকে তুমি আর চেরির কেবিনে যাবে না। পাইলট—জাহাজে ওর আত্মীয়স্বজন আসার কথা আছে।
কিন্তু স্যার…।
আমি সব বুঝি সুমিত্র। মনে রেখো, তুমি জাহাজি। কত বন্দরে কত ঘটনা থাকবে। তোমাকে যে একটু দৃঢ় হতে হবে।
সুমিত্র ব্রিজের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল—আকাশ তেমনি পরিষ্কার। জাহাজিরা সকলেই বন্দরের জন্য উদগ্রীব। যত বন্দরের দিকে এগোচ্ছে জাহাজ, তত জাহাজিরা উৎফুল্ল হচ্ছে, সুমিত্রর মনে একটা দুঃসহ কালো মেঘের অন্ধকার নেমে আসতে থাকল। সে ধীরে ধীরে ব্রিজ থেকে নেমে এল। চেরির কেবিন অতিক্রম করার সময় ইচ্ছা করেই আজ আর পোর্টহোলে চোখ তুলে কাউকে খুঁজল না। হাঁটতে হাঁটতে একসময় ক্লান্ত বোধ করল। ফোকসালে ঢুকে নিজের বাংকে চুপচাপ শুয়ে পড়ল।
