সুতরাং বিকেলে জোর করে নিজেকে কেবিনে আবদ্ধ করে রাখল। সুমিত্র যে ক’বার এনজিন—রুম থেকে উঠেছে নেমেছে, প্রত্যেকবার চেরির দরজা, পোর্টহোল বন্ধ দেখেছে। বিকেলবেলাতে সুমিত্র কাপ্তান—বয়কে প্রশ্ন করল, চাচা, রাজকন্যার দরজা—জানালা যে সব বন্ধ!
কী জানি, মেয়েমানুষের মর্জি বোঝা দায়। আমাকে বলল, ঘুমালে ডেকো না। বারোটার সময় দরজার কড়া নাড়লাম, খাবার দিতে হবে…. কোনো সাড়াশব্দ না। কাপ্তানকে বললাম—তিনি বললেন, বোধহয় ঘুমোচ্ছে, সুতরাং বাটলারকে বলে দাও যেন খাবারটা গরম রাখার ব্যবস্থা রাখে। ও আল্লা, নিচে নামতেই দেখি হৈ—হল্লা বাধিয়ে দিয়েছে।
সুমিত্র বলল, কাপ্তান আচ্ছা রাজকন্যার পাল্লায় পড়েছে!
তা হবে। কিন্তু কাল রাতে তোমার কথাই বারবার বলছিল।
কেন? কেন?
না, থাক। ওসব আমার বলা বারণ আছে, বলে কাপ্তান—বয় টুইন—ডেকে নেমে গেল।
এবং এ সময় সুমিত্র দেখল চেরি সান্ধ্য—পোশাকে টুইন—ডেক অতিক্রম করে এদিকেই আসছে।
সুমিত্র অন্যান্য সকল জাহাজিদের সঙ্গে কথা বলছে—চেরিকে দেখছে না এমত ভাব ওর চোখে—মুখে। চেরি আফট—পার্টে চলে আসছে। সুমিত্রর গলা শুকনো শুকনো ঠেকছে। চেরি আফট—পার্টে উঠে সুমিত্রকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সুমিত্রর দিকে তাকাল না, অথবা কথা বলল না। সে ঘুরে বেড়াচ্ছে জাহাজ—ডেকে। সুতরাং সকলে সরে দাঁড়াল। চেরি স্টারবোর্ড সাইডের ডেক ধরে এক নম্বর, দু’ নম্বর ফল্কা পার হয়ে ফের অদৃশ্য হয়ে গেল।
সুমিত্র পাশের জাহাজিকে বলল, চেরিকে খুব শুকনো লাগছে, না চাচা?
জাহাজে চড়লে প্রথম সকলেরই একটু শরীর খারাপ হয়। সুখী ঘরের মেয়ে। তা, একটু শুকনো লাগবে।
সুমিত্র এইসব কথা শুনল না। সে পিছিল থেকে নড়ছে না। সে চেরিকে ফরোয়ার্ড—ডেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল। চেরির মুখ শুকনো, সেই হেতু একটা কষ্ট—কষ্ট ভাব সুমিত্রর মনে। চেরি চুপচাপ চলে যাচ্ছে—গেল। সুমিত্র স্থাণুবৎ। এই প্রথম একজন পরিচিত যুবতীর জন্য মনে মনে দুঃখ বোধ করছে এবং যতবার অস্বীকারের ইচ্ছায় দৃঢ় হয়েছে ততবার এক দুর্নিবার মোহ সুমিত্রকে উত্তেজিত করে একসময় নিদারুণ প্রেমে ঘনিষ্ঠ করতে চেয়েছে।
সুমিত্র অনেকক্ষণ স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে থেকে সহসা দেখল ডেক এবং অন্যত্র সকল স্থান আলো আলোময় করে জাহাজ গতিশীল। সে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। সে ডেক ধরে নেমে গেল। সে হাঁটতে থাকল উদ্দেশ্যহীনভাবে। অথচ একসময় সে নিজেকে দেখল চেরির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চেরির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। মনে হচ্ছে ভিতরে কোনো আলো জ্বলছে না। চেরি অন্ধকারে শুয়ে আছে চুপচাপ। সে ধীরে ধীরে কড়া নাড়ল।
ক্লান্ত গলায় ভিতর থেকে প্রশ্ন করল চেরি, কে?
আমি, সুমিত্র।
সুমিত্র ভিতরের শব্দে বুঝল চেরি খুব দ্রুত কাজসকল সম্পন্ন করছে। আলো জ্বালাচ্ছে, প্রসাধন করছে। সবকিছুতেই ত্রস্তভাব। সুমিত্র এ—সময় এতটুকু ভীত হল না।
চেরি দরজা খুলল। চোখে ভয়ানক ক্লান্তি, তবু সুমিত্রর হাত ধরে এনে ভিতরে বসাল।
আপনাকে আজ খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে। কাল রাতে বুঝি এতটুকু ঘুমোননি?
সুমিত্র, আমি তোমাকে মিথ্যা বলব না। কাল আমি ঘুমোতে পারিনি।
আমি দেখছি মেজ—মালোমের কাছে ওষুধ পাওয়া যায় কী না।
না সুমিত্র, তুমি বোস। ঘুমোতে পারছি না বলে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।
কিন্তু আপনার চোখের কোল যে ফুলে উঠেছে!
সব সেরে যাবে। তুমি বোস। একটু কফি খাও। চেরি দরজায় গলা বের করে কাপ্তান—বয়কে ডাকল।
কফি খেতে খেতে চেরি প্রশ্ন করল, তোমার কে কে আছে সুমিত্র?
কেউ নেই।
কেউ নেই?
না।
মা?
না।
বাবা?
না।
আত্মীয়স্বজন?
সুমিত্র এবারেও ঠোঁট ওলটাল।
কী করে এমন হল?
সব দাঙ্গাতে মারা গেছে। আমার বাড়ি পূর্ববঙ্গে ছিল।
ঈশ্বর! চেরি আর কিছু প্রকাশ করতে পারল না। অনেকক্ষণ নির্জনে বসে থাকার মতো চুপচাপ বসে থাকল। দীর্ঘ সময় ওরা হতবাক হয়ে থাকল।
সুমিত্রই কথা বলল, আমি না ডাকতেই এসেছি বলে রাগ করেননি তো?
সুমিত্র, আমি খুব খুশি হয়েছি খুব।
আপনার শুকনো মুখ দেখে আমার আজ কেন জানি বারবারই মনে হল, এই জাহাজে আপনি আমার মতোই একা। আমার মতো আপনারও কেউ নেই। এবং সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত ধরনের কষ্টে পীড়িত হতে থাকলাম। শেষে বিশ্বাস করুন, কে যেন জোর করে আপনার দরজায় আমাকে এনে হাজির করল।
এইসব কথায় চেরি আবেগে প্রগাঢ় হল। সমস্ত শরীরে এক অদৃশ্য কম্পন। সে তার সকল দৃঢ়তা, সকল প্রত্যয়, সকল সম্মানিত জীবনের আলো গান পরিত্যাগ করে সুমিত্রর দু’হাত চেপে ধরল। কিন্তু আবেগের প্রগাঢ়তায় কিছুই প্রকাশ করতে পারল না। বলতে পারল না, মাই প্রিন্স! আমার আশৈশবের রাজপুত্র! সে মাথা নত করে সুমিত্রর মুখোমুখি বসে থাকল। মনে কোনো আলো জাগল না। নিমজ্জমান তরীর মতো জীবনের এক প্রবল মাধ্যাকর্ষণে ক্রমশ গভীর সমুদ্রে ওরা মিলে যাচ্ছে, মিশে যাচ্ছে। এবং একসময় সুমিত্র যখন চোখ তুলল চেরিকে দেখবার জন্যে, তখন চেরি অবাক হতে হতে দেখল, সেই চোখ, সেই বিষণ্ণ চঞ্চল চোখ কাচের জানালায় প্রতিবিম্ব হয়ে ভাসছে। কত ইচ্ছাই না চেরিকে এ সময় বিব্রত করেছে, কিন্তু কোনো ইচ্ছার সফলতাকেই অমৃতময় বলে মনে হল না, সুতরাং চেরি সুমিত্রর প্রিয়মুখ দর্শনে শুধু বিহ্বল হতে থাকল।
