কাপ্তান—বয় এসে ডাকল, মাদাম।
কফি। দু’কাপ।
ধীরে ধীরে জাহাজটা দ্বীপ দুটোকে পিছনে ফেলে চলে যাচ্ছে। সূর্যের আলো দ্বীপের সব অপরিচিত গাছের ফাঁক দিয়ে সমুদ্রে এসে পড়েছে। জনহীন এইসব ছোট ছোট দ্বীপ কতকাল থেকে এমন নিঃসঙ্গ কাটাচ্ছে কে জানে। দ্বীপের ঝোপ জঙ্গলের পাশে সুমিত্র এবং তার জন্য যদি কোনো তপোবন থাকত, যদি একফালি রোদ সেই কুটির—সংলগ্ন উঠোনে এসে পড়ত এবং সারাদিন পর সমুদ্র থেকে ঘরে ফিরে এসে সুমিত্র ওকে জড়িয়ে যদি জীবনের স্বাদ গ্রহণ করত, কত রঙিন স্বপ্ন দেখল চেরি, কত আকাঙ্ক্ষার কথা, বিচিত্র সব শখ সারাদিন ধরে ডেক পাটাতনে ভেবে ভেবে কখনও অন্যমনস্ক, কখনও বেদনায় বাংকে শুয়ে শুয়ে স্মৃতিকে ধরে রাখোর স্পৃহাতে এক নির্দিষ্ট যুবকের পায়ের শব্দ শুনতে চায়।
তখন সুমিত্র চোখ খুলে দেখল এই কেবিন। গভীর ঘুমের আচ্ছন্ন ভাবটুকুর জন্য বুঝতে পারল না কোথায় এবং কীভাবে, সে দেখল এই কেবিন ওর পরিচিত। তারপর একে একে বিগত রাতের ঘটনার কথা স্মরণ করে সে ফের আতঙ্কিত হল। দিনের আলো পোর্টহোল দিয়ে কেবিনে গলে গলে পড়ছে। চেরি ঘরে নেই। সুতরাং মনে নানা অগোছালো চিন্তা জট পাকাচ্ছে। অথবা রাত হলেই তার কী যে হয়। নিজের এই অপরিণামদর্শিতার জন্য সে দুঃখিত হল। তারপর চেয়ার থেকে সন্তর্পণে উঠে ডেকে এসে দেখল, চেরি দূরের দ্বীপসকল দেখছে। চেরি খুব ঝুঁকে আছে রেলিংয়ে। সে তাড়াতাড়ি নিজের কেবিনে ঢুকে বিছানায় হাত—পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
কাপ্তান—বয় এসে ডাকল, মাদাম।
এই যে!
আপনার কফি দেওয়া রয়েছে।
দু’কাপের মতো?
হ্যাঁ মাদাম।
চেরি তাড়াতাড়ি কেবিনে ঢুকবে ভাবল, সুমিত্রকে হাতমুখ ধুতে বলবে বাথরুমে। তারপর একসঙ্গে কফি খেতে খেতে দ্বীপের গল্প, ওর দেশ বাড়ি এবং অন্য অনেক সব খবর নিতে হবে—কিন্তু ভিতরে ঢুকেই দেখল, কেবিন ফাঁকা। সুমিত্র নেই। তারপর সে দেখল পোর্টহোলের কাচ খোলা। সে এবার কফির সবটুকু বেসিনে ঢেলে দিল। একটু এগিয়ে গিয়ে কাচ এবং লোহার প্লেট দিয়ে পোর্টহোল বন্ধ করে দিল। যেন সুমিত্রর কোনো প্রতিবিম্ব ভাসবে না এবং লজ্জায় আর অধোবদনও হতে হবে না। নিজের এই দুর্বলতাকে পরিহার করার জন্য সে আজ ভালোভাবে স্নান করল। সুমিত্রকে এড়িয়ে চলার জন্য নানা রকমের পত্রপত্রিকা খুলে বসল বাংকে। মনের বিক্ষিপ্ত ইচ্ছাগুলিকে সংযত করতে গিয়ে বারবার সে হোঁচট খাচ্ছে। কোথায় যেন এক বিশাল পাথরের বোঝা হয়ে ভারতীয় জাহাজিটা মনের উপর চেপে বসে আছে। চেরি আর পারছে না। চেরি নিজেকে রক্ষার জন্য দরজা খুলে তাড়াতাড়ি কাপ্তানের কেবিনে ছুটে গেল। বলল, আপনার এই বারান্দায় একটু বিশ্রাম নিতে চাইছি।
যতক্ষণ খুশি।
একটি ইজিচেয়ারে বসে সমুদ্র দেখতে থাকল চেরি। এখানে সুমিত্র নেই, শুধু সমুদ্র শুধু ঢেউ। কিছু পারপয়েজ মাছ। কিছু ঢেউ মেঘ হয়ে আছে আকাশে। সমুদ্রের ওপাশ দিয়ে একটা জাহাজের মাস্তুলে নিশান উড়তে দেখছে। কাপ্তান নিচে আছেন। তিনি দূরবিন চোখে রেখে জাহাজটাকে দেখলেন। চেরি উঠে দাঁড়ালে কাপ্তান ওর হাতে দূরবিন দিয়ে বললেন, দেখুন দূরে একটা তিমি মাছ দেখতে পাবেন। চেরি কিন্তু দূরবিন চোখে রেখে সুমিত্রর দিকে চেয়ে থাকল। পিছনের রেলিংয়ে সুমিত্র ঝুঁকে আছে—সে বোধহয় প্রপেলারের শব্দ কান পেতে শুনছে। চেরি দূরবিনটা কাপ্তানের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ইজিচেয়ারটা ইচ্ছা করে দূরে সরিয়ে নিল। সুমিত্রকে আর দেখা যাচ্ছে না এবং সে খুশি হওয়ার ভান করে কাপ্তেনকে পরবর্তী বন্দর সম্বন্ধে প্রশ্ন করল, আশা করছি দু’দিন বাদেই আমরা সিডনি পৌঁছাব।
আপনার সমুদ্রযাত্রা ভালো লাগছে না বোধহয়?
চেরি কথা বলল না।
ভালো লাগবে কী করে! যাত্রীজাহাজে যেতে পারলে আপনার এতটা অসুবিধা হত না।
চেরি বলল, কাল বিকেলটা বেশ লাগল।
তা বটে।
আপনাদের কথা আমার মনে থাকবে ক্যাপ্টেন।
আপনার কথাও আমাদের মনে থাকবে। কাল আপনার ভায়লিনের সুর অপূর্ব লাগছিল।
ক্যাপ্টেন, এবার কিন্তু কথাটা একটু খোশামোদের মতো মনে হল।
না মাদাম, আপনি বিশ্বাস করুন। সকলেই আপনার প্রশংসা করছে। সুমিত্র ভারতীয়, সে পর্যন্ত বলল, মাস্টার, এ সফরের কথা আমরা সকলেই মনে রাখতে বাধ্য হব। তারপর সে আপনার কথায় এল।
চেরির বলতে ইচ্ছা হল, আর কিছু বলেছে, আর কিছু? কিন্তু সম্মানিত জীবনের কথা ভেবে সে ওই প্রগাঢ় ইচ্ছাকে জোর করে থামিয়ে দিল।
কাপ্তান চেরির নিকট থেকে উৎসাহ না পেয়ে চার্ট—রুমে ঢুকে গেল এবং নিজের কাজ করতে থাকল।
চেরি ব্রিজে পায়চারি করছে। একবার উইংসের পাশে ঝুঁকে অথবা কখনও কম্পাসটার সামনে এসে (যেখানে কোয়ার্টার—মাস্টার স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাচ্ছে) নিজেকে বারবার আড়াল করার চেষ্টা করল। সুমিত্রকে আর দেখাই যাচ্ছে না। সুমিত্র পিছিলে কোথাও নেই। সে অ্যাকোমোডেশন ল্যাডার ধরে নেমে বোট—ডেক পার হয়ে কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সুমিত্র এখন এনজিন—রুমে। সে হাতঘড়িতে সময় দেখে এমত ধারণা করল। এবং কেন জানি অপার বিষণ্ণতা চেরিকে গ্রাস করছে। এবার দু’হাত ছুড়ে চেরির যেন বলবার ইচ্ছা—কে আছ তোমরা এসো, সুমিত্র নামে এক ভারতীয় যুবক আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আমাকে রক্ষা করো!
