চোরের মতো সুমিত্র কড়া নাড়তে থাকল। রাত বলে এনজিনের আওয়াজ প্রকট। সুতরাং এখন কেউ সুমিত্রর কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাবে না। কেউ এদিকে এলে এনজিন রুমে নেমে যাবার মতো ভান করে দাঁড়িয়ে থাকবে। বড় মালোমের ঘর পর্যন্ত খোলা নেই। সে আবার কড়া নাড়তে থাকল এবং এ—সময়েই দেখল ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। চেরির পায়ের শব্দ ভিতরে। চেরি দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। ভিতর থেকে প্রশ্ন এল, কে! কে?
আমি সুমিত্র, মাদাম। সে আর কীছু প্রকাশ করতে পারছে না। সে উত্তেজনায় অধীর। সে শরীরে শক্তি পাচ্ছে না। সমস্ত গা পুড়ে যাচ্ছে। গলা ভয়ে শুকনো, কাঠ। সে কোনোরকমে গলা ঝেড়ে আবার ডেকে উঠল, মাদাম, আমি সুমিত্র।
দরজা খুললে চেরি দেখতে পেল সুমিত্র দরজায় দাঁড়িয়ে ঘামছে। এই শীত—শীত রাতেও এমত ঘাম সুমিত্রর মুখে শরীরে সর্বত্র। কেবিনের আলোয় মুখের বিন্দুসকল ঝলমল করছে। সুমিত্রর চোখের নিচে কালি পড়েছে; বিশেষ করে গত রাতের সেই যুবকটিকে যেন আর চেনাই যাচ্ছে না। চেরি এবার সুমিত্রের হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এল। পাখা খুলে দিয়ে বলল, বোস। ইজিচেয়ারে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল চেরি। তারপর ধীরে সুস্থে বাংকে বসে বলল, এত রাতে!
সুমিত্র চেরির কণ্ঠে গত রাতের কোনো ইশারাকেই খুঁজে পেল না। একেবারে স্বাভাবিক।
মাদাম!
কিছু বলবে?
চেরি দেখল সুমিত্রর চোখ দুটো জ্বলছে। সমস্ত শরীর থেকে কামনার আবেগ গলে গলে পড়ছে। স্থিরভারে তাকাতে পারছে না—যেন অবসন্ন সৈনিক কুয়াশার অন্ধকার থেকে পথ খুঁজে খুঁজে অবিরাম হেঁটে হেঁটে কোনো আশ্রমে উপস্থিত। পানীয় জলের মতো যুবতীর চোখ মুখ শরীর তার তৃষ্ণা দূর করার জন্য যেন অপেক্ষা করছে। সে শুধু বলল, আপনি ফুল ভালোবাসেন মাদাম?
ভালোবাসি সুমিত্র।
পাখি?
পাখি ভালোবাসি।
আমার ফুল, পাখি কিছুই ভালো লাগছে না মাদাম।
কেন, কেন?
কী জানি। এই জাহাজ কেবল উচ্ছৃঙ্খল হতে বলছে।
সুমিত্র! খুব দূর থেকে যেন চেরির গলা ভেসে আসছে। গলা আবেগে কাঁপতে থাকল।
আমাকে কিছু বলবেন মাদাম?
তুমি উচ্ছৃঙ্খল হলে আমার যে কিছু থাকল না। নিজের সতীত্ব প্রমাণে চেরি যেন মরিয়া হয়ে উঠল।
না না। আপনি ভুল বুঝবেন না মাদাম। আমি যত্নের সঙ্গে সব পরিহার করে চলেছি মাদাম। অথবা বলতে পারেন, চলার চেষ্টা করছি।
সুমিত্র, কখনও যদি সময় অথবা সুযোগ পাই আমি ভারতবর্ষে যাবই।
ভয়ানক গরিবের দেশ। রাজপুত্রেরা এখন ফুটপাতে হেঁটে বেড়াচ্ছে মাদাম।
চেরি নিজেও তার ইচ্ছার কথা যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারছে না। এক কৃত্রিম আদর্শ উভয়কে সংকুচিত করে রাখছে। অথবা এও বলা যেতে পারে, চেরির ব্যবহার কেবলই মাতৃসুলভ হয়ে উঠছে। সে সুমিত্রর কপালে হাত রেখে বলল, সারাটা দিন আমার কী যে গেছে!
সুমিত্র আর পারছে না। সুতরাং মাথাটা ইজিচেয়ারের উপর আরাম করার জন্যে স্থাপন করল। যেন ঘুমোচ্ছে সুমিত্র এবং দেখলে মনে হবে মৃত। শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অসাড়। সে যেন আর দাঁড়াতে পারছে না। সে হেঁটে যেতে পারছে না ফোকসালে—দেখলে এমনই মনে হবে সুমিত্রকে। দীর্ঘ সময় ধরে চেরিও চুপ করে শুয়ে থাকল বাংকে। এখন ওরা উভয়ে পরস্পর আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করার জন্যে প্রথম শহীদ কে হবে, কে প্রথম যৌন বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্যে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করবে এমতই কোনো এক প্রতিযোগিতায় মত্ত। চেরি শুয়ে শুয়ে সুমিত্রর অবয়বে সেই রাজপুত্রের প্রতিবিম্ব দর্শনে আর স্থির থাকতে পারল না। সে যিশুর নাম স্মরণ করে ডাকল, এসো সুমিত্র।
চেরি আবার ডাকল, সুমিত্র এসো। নীল আলো জ্বলছে, দেখ।
সুমিত্র জবাব দিচ্ছে না। এমনকি ওর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নড়ল না। যেমন শিথিল শরীর নিয়ে পড়ে ছিল তেমনি পড়ে থাকল।
সুমিত্র, সুমিত্র। চেরি বাংকে থেকে নেমে সুমিত্রর ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে দেখল, সুমিত্র যথার্থই ঘুমিয়ে পড়েছে। যে আবেগ এবং যৌনেচ্ছা এতক্ষণ ধরে বাজিকরের মতো আবির্ভূত করে রেখেছিল, সুমিত্রর অসহায় মুখ দেখে সেই রঙ জলের মতো নির্মল হল। চেরি সন্তর্পণে কাছে গিয়ে কম্বলে পা শরীর ঢেকে দিয়ে কেবিনের নীল আলোর ছায়ায় ভারতবর্ষের রাজপুত্রের মুখ দেখতে দেখতে রাত ভোর করে দিল। বাইরে আলো ফুটে উঠছে। পোর্টহোলের কাচ খুলে দিতেই বাইরের ঠান্ডা হাওয়া এই কেবিনের সকল ঘটনাকে প্রীতিময় করে তুলছে। চেরি বাংক থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকে পোশাক পালটাল। শেষে কাপ্তান—বয়ের খোঁজে ডেকে বের হয়ে গেল। ডেক—ছাদের নিচে এসে দাঁড়াতেই দেখল দুটো নির্জন দ্বীপের পাশ দিয়ে জাহাজ যাচ্ছে। সবুজ এক প্রান্তর, এই ভোরের মিষ্টি আলো, এবং দিগন্তের ফাঁকে সূর্য উঠছে, শুধু রক্তিম আকাশ, কেবিনে সুমিত্র ঘুমোচ্ছে, চেরির বুক ঠেলে কেমন এক কান্নার চিহ্ন ঠোঁটে মুখে ফুটে উঠল। দূরের দ্বীপ থেকে মাটির গন্ধ ভেসে আসছে, সবুজের গন্ধ এই জাহাজের ফাঁকফোকরে যত অন্ধকার আছে সব নির্মল করে দিচ্ছে। দ্বীপের পাখি সকল জাহাজটাকে দেখে চক্রাকারে উড়তে থাকল। নীল রঙের পাখিরা ডাকল আর আকাশের চারধারে সাদা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ এবং তার ফাঁকে ফাঁকে দ্বীপের সকল পাখিরা কোনো এক নিরুদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছে। চেরি ভাবল, এই দ্বীপের কোনো গুহায় তার এবং সুমিত্রর জন্য একটু আশ্রয় কি মিলতে পারে না! একটু আশ্রয়ের জন্য মাটির কাছে তার প্রার্থনা, ঈশ্বর আমার কী হবে!
