ভাণ্ডারী উঁকি দিল গ্যালি থেকে। জাহাজিরা ঘরে ফেরার মতো একে একে সকলে পিছিলে জমছে। ওদের হাতে রঙের টব ছিল। ওরা হাতের রঙ কেরোসিন তেলে মুছে নিচ্ছে। ওরা এবার স্নান করবে। নামাজ পড়বে এবং আহার করবে। তারপর সমুদয় কাজ সেরে ওরা গিয়ে বেঞ্চিতে বসে ন্যক্কারজনক কথাবার্তায় ডুবে ডুবে জল খাবে। সুমিত্র ওদের সকলকে দেখল। ওরা সকলে ওকে এক প্রশ্ন করল, তোমার শরীরটা ক্যামন আছেরে বা? এইসব বলে ওরা ফোকসালে নেমে গেলে ভাণ্ডারী বলল, চা কড়া করে দেব?
তাই দাও।
সুমিত্রর এখন আর কিছু করণীয় নেই। সুতরাং পা ঝুলিয়ে বসে থাকল। শরীরে সমস্ত দিনের সঞ্চিত গ্লানি এই সমুদ্র এবং এক কাপ চা দূর করে দিল। সে এবার জাহাজের অলিগলি না খুঁজে সোজা দিগন্তে নিজের দৃষ্টিতে নিযুক্ত করে তার দেশ বাড়ির চিন্তা—সেখানে কী মাস, কী ফুল ফুটছে অথবা কোন ঋতু হতে পারে, দুর্গাপুজোর সময় হতে কত দেরি, শেফালি ফুল ছড়ানো উঠোন অথবা বৃষ্টি বৃষ্টি… এবং জাহাজে থেকে থেকে বাংলাদেশের মাস কালের হিসাব ভুলে গেল সুমিত্র। অথবা এইসব চিন্তার দ্বারা দেশের আকাশকে উপলব্ধি করার জন্য আঁকু—পাঁকু করতে থাকল সুমিত্র।
ডেক—সারেং বলল, তবিয়ত কেমন?
ভালো চাচা। জ্বরটা মনে হয় সেরে গেছে।
কী খেয়েছিলে?
চাপাটি খেলাম চাচা।
ভালো করেছ।
রাত্রে দেখি বাটলারকে বলে একটা পাঁউরুটি সংগ্রহ করতে পারি কি না।
অনাদি উঠে এল। সে বলল, এখানে বসে শরীরে ঠান্ডা লাগানো হচ্ছে? এক্ষুনি নেমে পড়! বলে, সুমিত্র অনাদিকে অনুসরণ করে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গেল। সারেংয়ের ঘরটা অতিক্রম করে স্টোর রুমের পাশের নির্জন জায়গাটুকুতে দাঁড়িয়ে সুমিত্র ডাকল, অনাদি!
কিছু বলবি!
তুই তো সারাদিন পাঁচ নম্বরের সঙ্গে ডেকে কাজ করছিলি?
হ্যাঁ, তা করছিলাম।
চেরিকে ডেকে বের হতে দেখলি না?
না। তবে এলওয়ে ধরে আসবার সময় দেখলাম চেরি বিছানায় শুয়ে আছে।
কিছু করছে না।
ঘরটা অন্ধকার। দরজা জানলা সব বন্ধ করে রেখেছে।
সুতরাং ভালোমতো দেখিসনি।
না।
সুমিত্রকে দেখে মনে হচ্ছে খুব আশাহত। অনাদি নিজের ফোকসালে চলে গেল এবং পিছনে এসে এ সময় কাপ্তান—বয় ডাকল, সুমিত্র, এই নাও তোমার বিকেল এবং রাতের খাবার। বাটলার দিয়েছে।
চাচা, বাটলার এত সদয় কেন আমার প্রতি?
তা আমাকে বললে কী হবে! বরং বাটলারকে জিজ্ঞেস কর। একটু থেমে বলল, তোমার শরীর এখন কেমন?
ভালো চাচা।
বেশি নড়বে না। এ—জ্বর কিন্তু খুব খারাপ। আবার হলে অনেক ভোগান্তি হবে। বলে চলে যাবার জন্য উদ্যোগ করতেই সুমিত্র কেমন যেন সংকোচের সঙ্গে ডাকল, চাচা।
কাপ্তান—বয় মুখ ফিরিয়ে বলল, কী!
আমার যে শরীরটা খারাপ করেছিল, চেরি জানে?
তা আমি কী করে জানব বাপু।
তোমাকে কীছু জিজ্ঞেস করেনি?
না। আমি কতক্ষণ থাকি ওর কাছে? কাপ্তান—বয় আর দাঁড়াল না। সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সুমিত্র ফোকসালে ঢুকে ফের বাংকে শুয়ে পড়ল। শরীরটা বেশ দুর্বল মনে হচ্ছে। গত রাতের ঘটনাগুলো ওকে এখনও যেন যন্ত্রণা দিচ্ছে। অথচ একবার চেরির কেবিনে যেতে পারলে সব দুর্ঘটনার যেন অবসান হত। তবু সে নিজের শরীরে কম্বল টেনে পাশ ফিরে শুয়ে থাকল। নির্জনতায় ভুগে কেমন বিস্বাদ বিস্বাদ সব। অনাদি পাশের বাংকে শুয়ে বকবক করছে ছোট ট্যান্ডলের সঙ্গে। এইসব কথা এবং যৌন আলাপ শুনতে ভালো লাগছে না। ফোকসালের সর্বত্র একই জৈব ঘটনার পুনরাবৃত্তি। মুসলমান বৃদ্ধ পুরুষসকল অযথা বদনা নিয়ে বারবার এই ঠান্ডা দিনেও গোসলখানায় ঢুকে স্নান করছে এবং আল্লা আল্লা করছে।
ফোকসালে ফোকসালে এখন অন্ধকার। এবং সন্ধ্যা অতিক্রম করছে বলে সকলে আলো জ্বলে দিল। কিন্তু সুমিত্রর এই আলো ভালো লাগছে না। আলোটা ওর চোখে লাগছে। সে আলোটা নিভিয়ে দিতে বলল। এবং এই অন্ধকার এখন ওকে গ্রাস করছে। রাত বাড়ছে। ফোকসালে ফোকসালে জাহাজিরা ভিড় করে আছে। ওরা এবার উপরে উঠবে। ওরা রাতের আহার শেষ করে আবার নিচে নেমে আসবে।
সুতরাং সুমিত্র দীর্ঘ সময় এই বাংকে একা আর পড়ে থাকতে পারছে না। রাত যত বাড়ছিল, ঘন হচ্ছিল, তত শরীরের দুর্বলতা যৌনক্ষুধাকে আবেগমথিত করছে। এবং যখন দেখল ফোকসালে ফোকসালে ডেক—জাহাজিরা ঘুমিয়ে পড়েছে, এনজিন অথবা ডেকসারেং—এর ঘরে আলো জ্বলছে না তখন ধীরে ধীরে সে সিঁড়ি ধরে চোরের মতো পা টিপে টিপে উপরে উঠতে থাকল।
ডেকে উঠতেই শীত শীত অনুভব করল সুমিত্র। অস্ট্রেলীয় উপকূলের যত নিকটবর্তী হচ্ছে তত শীতটা যেন বাড়ছে। তত সমুদ্র যেন শান্ত হয়ে আসছে। আজও সে ডেকে এসে দেখল কেউ কোথাও নেই। মাস্টের আলোগুলি ভূতের মতো রাতের আঁধারে দুলে দুলে ভয় দেখাচ্ছে। ব্রিজে ছোট মালোমও পায়চারি করছেন; ওঁর এখন ওয়াচ নিশ্চয়ই। সুমিত্র আড়াল থেকে দেখল সব এবং খুশি হল। ছোট মালোম কেবিনে থাকেন। সুতরাং চেরির কেবিনে কোনো শব্দ হলে পোর্টহোল দিয়ে উঁকি মারতে পারেন। সে উত্তেজনায় দাঁড়াতে পারছিল না, চুলোয় যাক ছোট মালোম—সে ছুটে এলওয়ে পথে ঢুকে গেল। এবং চেরির দরজার উপর ভর করে সতর্ক গলায় ডাকতে থাকল, মাদাম, মাদাম! আমি এসেছি দরজা খুলুন, যেন বলার ইচ্ছা, আমি যথার্থই কাপুরুষ নই। আপনাকে বেশ্যা বলে নিরন্তর আমি দগ্ধ। আমরা সকলেই উনুনের তাপ চুরি করে শরীর গরম করছি। আপনি দরজা খুলুন মাদাম।
