ডেকসারেং দৌড়ে এলে চেরি বলল, সুমিত্র কোথায়? সে তো এখনও নিচে নামেনি। ওর তো আটটা—বারেটা ওয়াচ।
সারেং জবাব দিল, মাদাম, ওর অসুখ হয়েছে।
চেরি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলল, যাঃ!
জী মাদাম। আপনাকে আমি মিথ্যা বলতে পারি?
ওকে কে দেখাশুনা করছে?
কে করবে মাদাম? কেউ তো বসে নেই। সকলেই কাজ করছে। ও জ্বরে কাতরাচ্ছে।
তোমরা ওকে দেখতে পারো না! জ্বর হয়েছে… একলা ফেলে…
তা দেখি, মাদাম। সারেং নিজের দোষ কাটাবার জন্য বলে গেল, সব ব্যবস্থা করা হয়েছে মাদাম। এনজিন—সারেং মেজ মালোমের কাছ থেকে ওষুধ এনেছে।
তারপর চেরির মনে পড়ল এই মালবাহী জাহাজে সেবা—শুশ্রূষার কোনো ব্যবস্থা নেই। জাহাজিদের জন্য ভালো ওষুধ নেই। কোনো ডাক্তার নেই। সাধারণ রকমের অসুখে মেজ মালোমই ওষুধ দেন। সাধারণ রকমের অসুখে প্রয়োগ করার মতো কিছু ওষুধপত্র এই জাহাজের কোনো এক প্রকোষ্ঠে সঞ্চিত আছে। কাপ্তানের উপর কোম্পানির উপর চেরির রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকল। অথচ চেরি ফোকসলের দিকে হেঁটে যেতে পারছে না। গত রাতের ঘটনাসকল চেরিকে সংকুচিত করছে। যেন এই মুখ সুমিত্রকে দেখানো চলে না। যেন সুমিত্রর ফোকসালে ঢুকলে সে অপমানিত হতে পারে। গত রাতের দুঃসহ অপমানের কথা নিশ্চয়ই সে ভুলে যায়নি। সুতরাং, কী ভেবে চেরি নিজের কেবিনে ঢুকে কিছু ফল তুলে নিল হাতে এবং কাপ্তান—বয়কে ডেকে বলল, যাও সুমিত্রর কেবিনে এই ফলগুলি রেখে এসো। কিছু বললে বলবে বাটলার দিয়েছে। আমার কথা বলবে না।
কাপ্তান—বয় দরজার চৌকাঠ পার হলে চেরি বলল, জ্বর কত এবং কেমন আছে দেখে আসবে।
কাপ্তান—বয় আলওয়েতে হাঁটছিল এবং শুনতে পাচ্ছে, ওকে বেশি নড়াচড়া করতে বারণ করবে। মনে থাকে যেন, আমার কথা বলবে না।
কাপ্তান—বয় খুব ধীরে ধীরে হাঁটছে। কারণ তখনও চেরি নানারকমের নির্দেশ দিচ্ছে।—কম্বল গায়ে না থাকলে দিয়ে দেবে। কাপ্তান—বয় সব শুনে হাসল। বস্তুত চেরি আভিজাত্য বোধে ফোকসালের দিকে হেঁটে যেতে পারছে না। কাপ্তান—বয় বুঝল, চেরির ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে। ডেকছাদের নিচে দাঁড়িয়ে একবার পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল—দূরে কেবিনের দরজাতে ভর করে চেরি অপলক চোখে কাপ্তান—বয়ের কাছে কোনো খবরের প্রতীক্ষায় আছে। কাপ্তান—বয় এবার সত্বর ছুটে গেল। কারণ ওরও চেরির দুঃখবোধে মনের কোণে এক স্নেহসুলভ ইচ্ছার রঙ করুণ হয়ে উঠেছে।
সিঁড়ি ধরে নামছিল কাপ্তান—বয়। নিচের ফোকসালগুলি সবই প্রায় খালি। কিছু কিছু জাহাজি ডেকে হল্লা করছে। ওরা দেশের গল্পে, বিবিদের গল্পে মশগুল। প্রতিদিনের মতো ফলঞ্চা বেঁধে কেউ কেউ জাহাজে রঙ করছে। কাপ্তান—বয় প্রতিদিনের এইসব একঘেয়েমি দৃশ্য দেখতে দেখতে নিচে নেমে গেল। সুমিত্রর শিয়রে দাঁড়িয়ে কপালে হাত রাখল। ডাকল, সুমিত্র, ওঠ বাবা।
এই সময় কে কপালে হাত রাখল! ডাকল! সুমিত্রর মনে হল বড় প্রীতময় এই জাহাজিদের সংসার। দীর্ঘদিনের সফরে কাপ্তান—বয়কে আপনজনের মতো করে ভাবতে গিয়ে চোখে জল এল। সে ডাকল, চাচা!
কেমন আছ?
শরীরটা বড় ব্যথা করছে।
একটু নুনজল এনে দেব? গরম জল?
গরম জল ভাণ্ডারী দিয়েছে।
কী খেলে।
কিছু না। ভাবছি ভাত খাব না। শরীরটা খুব ঘামছে। মনে হয় ভালো করে ঘাম হলে শরীরটা খুব ঝরঝরে হবে।
যখন কাপ্তান—বয় দেখল শরীরে কোনো উত্তাপ নেই এবং যখন বুঝল ফ্লু—গোছের কিছু হয়েছে তখন আর বেশি দেরি করল না। পকেট থেকে আপেলগুলো বের করে দিয়ে বলল, নাও খাও। খাবে। কী খেতে ভালো লাগে বলবে। বিকেলে এনে দেব। তারপর সুমিত্রকে একটু বিস্মিত হতে দেখে বলল, বাটলার দিয়েছে। বড় বড় চোখে তাকাবার মতো কিছু হয়নি।
সুমিত্রর শরীরে কম্বল টেনে দিয়ে কাপ্তান—বয় বাইরে বের হয়ে গেল। সিঁড়ি ধরে উঠছে। সুমিত্র শুয়ে শুয়ে উপরে কাপ্তান—বয়ের জুতোর শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে শুনতে পেল। ওর পোর্টহোলটা খোলা নেই। খোলা থাকলেও সে আকাশ দেখতে পেত না। মালবোঝাই জাহাজ। সমুদ্রের জলে মাঝে মাঝে পোর্টহোলটাকে ঢেকে ফেলছে। সমুদ্রের এই জল দেখে গতরাতের কিছু কিছু ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারছে সুমিত্র। চেরির যৌন ইচ্ছা এবং প্রগলভতা ওর মনে এখনও কামনার জন্ম দিচ্ছে। অথচ সে পারছে না। বারবার এই আত্মঘাতী ইচ্ছা ওকে নিদারুণ যন্ত্রণায় দগ্ধ করছে, রাতে চেরির কেবিন থেকে ফিরে এসে এই ফোকসালে দীর্ঘ সময় পায়চারি করেছে এবং সকল দগ্ধ যৌন ইচ্ছার প্রতি উষ্মা প্রকাশের জন্য বার বার জাহাজিসুলভ খিস্তি করে আত্মতৃপ্তি লাভ করতে চেয়েছে।
বিকালে সুমিত্রর জ্বরটা থাকল না। বাংকে বসে সে—শরীর তার এখন হালকা, নিরন্তর এই বোধে খুশি। সে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে একটি বেঞ্চিতে বসল। সমুদ্রের হাওয়ায় ওর শরীর প্রাণ যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। সে এবার ধীরে ধীরে চার নম্বর ফল্কা অতিক্রম করে ডেক—ছাদের নিচ দিয়ে এলওয়ে পথটাকে দেখল—সেখানে কোনো পরিচিত মুখ ভেসে উঠছে না। সেই মুখ, নরম ঘাড় আর তার কোমল মন সুমিত্রর নিঃসঙ্গ এবং পীড়িত শরীরের জন্য বড় প্রয়োজন। এবং গত রাতের ‘বেশ্যা’ এই শব্দটি গ্লানিকর সুতরাং উচ্চারণে কিঞ্চিৎ সংযত হওয়া প্রয়োজন। তারপর এই মুহূর্তে নিজেকে ছোটলোক ভেবে ক্ষোভ থেকে কিঞ্চিৎ প্রশমিত হওয়া গেলে মন্দ কী? চেরির মাতাল যৌনেচ্ছাতে সমুদ্রের নেশা ছিল। ওর ঘরে দ্বীপের আভিজাত্য অনেক দূরের স্মৃতির মতো এবং এইজন্যই বুঝি সমুদ্রের ঢেউ অথবা আকাশ দেখতে দেখতে একটু প্রেম করা চলে—ভালোবাসলে ক্ষতি নেই, তারপর রাত যদি ঘন ঘন শরীরের রমণীয়তায় তন্ময় করে রাখে, যুক্ত করে রাখে তবে বিঘ্নকারী জানোয়ারের মতো ইতর হবার প্রয়োজন কোথায়! সে ভাবল, সুতরাং আজ রাতে চেরির দরজার পাশ দিয়ে একবার হেঁটে যাবে। এবং গৃহপ্রবেশের দিনে গিন্নিমার মতো একবার যৌনসংযোগ ঘটাবে—এই নিরন্তর ইচ্ছার জন্য সে এবার ডাকল— ভাণ্ডারী—চাচা, আমাকে একমগ চা দিন।
