আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি কাপ্তান। সেটা আপনাকেও ভেবে দেখতে বলি।
বলুন।
এই ছোট্ট ঘরে না হয়ে খোলা ডেকে ভালো হয় না?
কাপ্তান এবারও একটু ইতস্তত করল।— আপনি সব জাহাজিদের এ আনন্দে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন?
মন্দ কী! আমার কিন্তু মনে হয় সেই ভালো হবে। ডেকে সুন্দর জ্যোৎস্না উঠেছে। সমুদ্রে ঢেউ নেই। এমন সুন্দর দিন…।
তাই হবে।
সুতরাং চার নম্বর এনজিনিয়ার দৌড়ে গেল ডেকে। ডেকের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়, ড্যারিকে, মাস্টে সবুজ—লাল—নীল আলো জ্বেলে দিল। সতরঞ্চ পেতে সকল জাহাজিদের বসতে বলা হল। তারপর কাপ্তান নিজেই বলতে থাকলেন, আমাদের মাননীয়া অতিথি মিস টুপাতি চেরির সম্মানার্থে এই আনন্দের আয়োজন। আমাদের সমুদ্রের দিনগুলো ভয়ানক নিঃসঙ্গ। সুতরাং সকলেই আজ খোলা মনে আনন্দ করব। এবং এই সম্মানীয়া অতিথির প্রতি নিশ্চয়ই অশালীন হব না।
অফিসারদের জন্য কিছু চেয়ার, কাপ্তান একপাশে এবং তার ডাইনে রেলিংয়ের ধারে চেরি বসল। সমুদ্রে ঢেউ নেই বলে জাহাজ বিশেষ দুলছে না। একটু একটু শীত লাগছে। সকল জাহাজিরা চারপাশে বসে আছে। চেরি সহজ হয়ে দাঁড়াল, প্রার্থনার ভঙ্গিতে বলল, আমরা আজ সকলে পরস্পরের বন্ধু। আসুন, আমরা আজ সকলে একসঙ্গে ঈশ্বরের প্রার্থনা করি। এই কথায় সকলে উঠে দাঁড়াল। ওরা প্রার্থনার ভঙ্গিতে আকাশ দেখতে থাকল।
তারপর ছোট মালোম চেরির অনুমতি নিয়ে গান গাইলেন, লেটস লাভ মাই গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড কিস হার…।
মেজ মিস্ত্রি তাঁর ছোট্ট ক্যানারি পাখিটা খাঁচাসহ টেবিলের উপর রাখলেন। শিস দিয়ে পাখিটাকে নানা রকমের অঙ্গভঙ্গিতে নাচালেন। সকলে হেসে গড়াগড়ি দিল।
কাপ্তান কীটসের একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন সকলকে।
একটু বাদে এলেন জাহাজের মার্কনি সাব। মুখোশ পরে চারিধারে বিজ্ঞ ব্যক্তির মতো ঘুরে বেড়ালেন কিছুক্ষণ। হাতের লাঠিটা মাঝে মাঝে ঘোরাচ্ছেন, তিনি যেন কী খুঁজছেন, অথবা কী যেন তাঁর হারিয়ে গেছে। শেষে কাপ্তানের কাছে এসে বললেন, দিস ম্যান, মাই ফ্রেন্ড, দিস ম্যান ইজ দি রুট অফ অল ইভলস। সুতরাং আসুন, ওকে খতম করে জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে দেশে ফিরে যাই। বলে তিনি তাঁর লাঠিটা কাপ্তানের মাথায় তুলে ফের নামিয়ে আনলেন, না, মারব না। নোবেল কমিটির শান্তি পুরস্কারটা আমার ভাগ্যে ফসকে যাক—সেটা আমি চাই না। এবং দুঃখে দুটো বড় হ্যাঁচ্চো দেওয়া যাক। তিনি বড় রকমের দুটো হ্যাঁচ্চো দিলেন। লাঠিটা আপনারা নিয়ে নিন, বলে ক্লাউনের কায়দায় লাঠিটা ছুড়ে মেরে ফের ধরে ফেললেন। এবারও সকলে না হেসে পারল না।
এনজিন—রুমে যাদের ওয়াচ ছিল, তারা উপরে উঠে মাঝে মাঝে উঁকি মেরে যাচ্ছে। সুমিত্র সকলের পিছনে বসে আছে। ব্রিজে ঘণ্টা বাজল। এখন সাতটা বাজে। সুতরাং আর আধঘণ্টা এখানে বসে থাকা যাবে। সুমিত্র উঠি—উঠি করছিল, এ সময় চেরি বলল, এবার সুমিত্র আমাদের একটু আনন্দ দিক।
কাপ্তান বললেন, সুমিত্র গান গাইবে।
স্যার, আমাদের গান আপনাদের ভালো লাগবে না।
না সুমিত্র, ঠিক কথা বলছ না। আমরা এখানে কেউ সংগীতজ্ঞ নই। শুধু একটু আনন্দ—সে যেমন করে হোক। একটু আনন্দ, আনন্দ কর।
সুমিত্র একটি সাধারণ রকমের বাংলা গান গেয়ে শোনাল।
এ সময় ডেক—অ্যাপ্রেন্টিস এল পায়ে খড়খড়ি লাগিয়ে। সে লাফিয়ে লাফিয়ে অথবা শুয়ে বসে নাচল। এবং শেষে চেরি ওর দীর্ঘদিনের অভ্যাসকে বেহালার তারে মূর্ত করে তুলে সকলকে আনন্দ দিল।
তারপর রাত নামছে, ডাইনিং—হলে কাঁটা—চামচের শব্দ। সেখানে বাটলার এবং অন্যান্য বয়সকল ছুটোছুটি করে পরিবেশন করল। সকলে মদ খেল অল্পবিস্তর। চেরি মদ খেয়ে মাতাল হল আজ।
রাত দশটা বেজে গেছে। চেরি নেশাগ্রস্ত শরীরে কেবিনের ভিতর ডেকচেয়ারে বসে আছে। সুমিত্র সকলের পিছনে চুপচাপ বসে ছিল। উইংস থেকে একটি আলোর তির্যক রেখা এসে ওর চোখে পড়েছে। চেরি ক্ষণে ক্ষণে সুমিত্রকে দেখছিল। দুটি পরস্পর গোপনীয় দৃষ্টি ঘনিষ্ঠ হতে হতে এক সময় লজ্জায় আনত হল। সে কেবিনে ঢুকে পোর্টহোলের পর্দা সরিয়ে দিল। ঘুম আসছে না। এ সময় সুমিত্রকে ডেকে পাঠালে হত।
বয়, বয়! দরজায় পায়ের শব্দে চেরি উঠে গেল এবং দরজা খুলে দিল! শরীর টলছে।— বয়, আজ সুন্দর রাত। বয়, তোমার বাড়িতে কে কে আছে? মাদাম, অনেক রাত হয়েছে। শুয়ে পড়ুন। গেলাসে জল রেখে গেছি।
বয়, তুমি জানো আমি ভারতীয়?
জী, না।
জেনে রাখো আমি ভারতীয়। বড় দুঃখ হয়, আমরা আর সে দেশে যেতে পারব না। বয়, একটা কথা বলব তোমাকে। কিন্তু সাবধান, কাউকে বলবে না।
মাদাম, আপনার শরীর ভালো নেই। শুয়ে পড়ুন।
বয়, সুমিত্র কিন্তু রাজপুত্র হতে পারত। ওর চোখ, মুখ, শরীর সব সুন্দর।
মাদাম, সুমিত্র যে রাজার ঘরের ছেলে। ভাগ্য দোষে—
চেরি এবার কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে উঠে পোর্টহোলে মুখ রাখল।—তুমি যাও, বয়।
মাদাম, দরজাটা বন্ধ করে দিন। কাপ্তান—বয় বের হয়ে যাবার সময় এই কথাগুলো বলল।
চেরি পোর্টহোল থেকে যখন দেখল কাপ্তান—বয় ঘরে নেই, ওর পায়ের শব্দ অ্যালওয়েতে মিশে গেছে এবং যখন মনের উপর শুধু সুমিত্রই একমাত্র দৃশ্যমান তখন দরজা বন্ধ না করে নিচে এনজিন রুমে নেমে সুমিত্রর পাশে গিয়ে দাঁড়ানোই ভালো। চেরি দরজা খুলে বাইরে বের হল। এনজিন—রুমে নামার মুখেই দেখল সুমিত্র তেলের ক্যান নিয়ে উপরে উঠে আসছে।
