এই যে, মাদাম!
সুমিত্র, তোমার ওয়াচ শেষ?
না মাদাম, পিছিলে যাচ্ছি, স্টিয়ারিং—এনজিনে তেল দিতে।
রাত এখন কত?
এগারোটা বেজে গেছে, মাদাম।
জাহাজে আর কারা এখন জেগে থাকে সুমিত্র?
অনেকে মাদাম। অনেকে। ব্রিজে ছোট মালোম, এনজিন—রুমে তিন নম্বর মিস্ত্রি, স্টোকহোলডে চারজন ফায়ারম্যান, তিনজন কোল—বয়, কম্পাস ঘরে কোয়ার্টার—মাস্টার, ফরোয়ার্ড পিকে কোনো ডেকজাহাজি।
তুমি এত কষ্ট করতে পারো সুমিত্র!
এখন তো কোনো কষ্টই নেই মাদাম। যখন কোল—বয় অথবা ফায়ারম্যান ছিলাম সে কী কষ্ট!
তুমি আমার ঘরে আসবে সুমিত্র?
আপনার শরীর ভালো নেই মাদাম। আমি আপনাকে ঘরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করছি। কারণ চেরির এই উচ্ছৃঙ্খল ভাবটুকু ভালো লাগছে না সুমিত্রর। সে চেরির অন্য কোনো অনুরোধ রাখল না। সে চেরিকে ধরে বলল, আসুন।
কোথায় সুমিত্র?
কেবিনে।
আমার ভালো লাগছে না।
ভালো না লাগলে তো চলবে না মাদাম।
তুমি কেবিনে বসবে, বলো?
বসব।
তোমার ফের ওয়াচ ক’টায়?
ভোর আটটায়।
চেরি কেবিনের দিকে না গিয়ে ডেকের দিকে পা বাড়ালে সুমিত্র বলল, এ তো আচ্ছা বিপদে পড়া গেল দেখছি। রাতদুপুরে জাহাজিরা দেখলে বলবে কী?
কী বলবে সুমিত্র?
কী আর বলবে! আসুন। ধমকের সুরে কথাগুলো বলল সুমিত্র। তারপর জোর করে চেরিকে কেবিনে ঠেলে দিতেই শুনতে পেল—চেরি বলছে—ভালো হচ্ছে না সুমিত্র। আমি মাতাল বলে কিছুই বুঝতে পারছি না ভাবছ। কাল ঠিক কাপ্তানকে নালিশ করে দেব দেখ। আমার উপর জোর খাটালে ঈশ্বর সহ্য করবেন না।
ফের সুমিত্র নিজের অবস্থা বুঝে খানিক বিব্রত বোধ করছে। এমত ঘটনার কথা কাপ্তানকে বললে—তিনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন না। অথবা মনে হল বৃদ্ধ কাপ্তানকে খবর দেওয়া যায়—চেরি ডেকের অলিগলিতে ঘুরতে চাইছে। চেরি মদ খেয়ে মাতাল এবং চেরির এই সময় যৌনেচ্ছার বড় ভয়ানক শখ। কিন্তু দেখল যে রাত গভীর। ফরোয়ার্ড পিক থেকে ওয়াচ করে ডেক—জাহাজি হামিদুল ফিরছে। ওয়াচের ঘণ্টা বাজছে ব্রিজে। সুতরাং বৃদ্ধ কাপ্তানকে এ সময় ডেকে তোলা নিশ্চয়ই সুখকর হবে না। বরং কাপ্তান—বয়ের খোঁজে গেলে হয়, যথার্থ উপকার এসময় তবে হতে পারে। সে আরও কিছু ভাবছিল তখন চেরি ওর হাতটা পিছন থেকে খপ করে ধরে ফেলল। বলল, দোহাই সুমিত্র, আমাকে একা ফেলে যেও না। খুব ভয় করছে।
সুমিত্র ছোট মালোমের কথা মনে করতে পারল। প্রতিদিন ওয়াচের শেষে অথবা রাতের নিঃসঙ্গতায় ভুগে ভুগে এই দরজার ফাঁকে চোখ রাখার জন্য উপস্থিত ছোট মালোম। এই দরজায় হাত রেখে বলত, বোট ডেকে বড় সুন্দর রাত।
চেরি বলত, আমার শরীরটা যে ভালো যাচ্ছে না থার্ড।
আমরা এখন একটা নির্জন দ্বীপের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, মাদাম।
সেটা আমার দ্বীপের চেয়ে নিশ্চয় বেশি সুন্দর হবে না থার্ড।
চেরি কতদিন এমন সব কথা বলে প্রাণ খুলে হাসত।—তোমাদের থার্ড আচ্ছা বেহায়া! চেরি ভয়ানক টলছিল। সে এখন এক হাত বাংকে রেখে অন্য হাতে সুমিত্রের কলার চেপে বলছে, মাই প্রিন্স।
মাদাম, আপনি কীসব বলছেন!
আমি ঠিক বলছি সুমিত্র। আমি ঠিক বলছি। তুমি দরজা বন্ধ করে দাও সুমিত্র, নতুবা আমি জোরে জোরে চিৎকার করব। বলব, প্রিন্স প্রিন্স। একশোবার বলব। সকলকে শুনিয়ে বলব। তুমি কী করবে? কী করতে পারছ?
ভয়ে সুমিত্র কাঠ হয়ে থাকল। সে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে বলল, চুপ করুন মাদাম চুপ করুন। আপনার ঈশ্বরের দোহাই।
সুমিত্র দেখল কেবিনের পোর্টহোল খোলা। ফরোয়ার্ড পিকে কোনো জাহাজি যদি এখন এই সময় ওয়াচে যায়, চোখ তুলে দেখলে ওদের দুজনকে স্পষ্ট দেখতে পাবে। সে তাড়াতাড়ি পোর্টহোলের কাচ বন্ধ করতে গিয়ে দেখল—ক্যালেন্ডারটা উড়ছে। সে সন্তর্পণে পোর্টহোল দিয়ে কিঞ্চিৎ মুখ বার করে যখন দেখল কেউ এ—পথে আসছে না, বারোটা—চারটের পরীদাররা সব এনজিন রুমে নেমে গেছে এবং শেষ ওয়াচের পরীদারদের চিৎকার স্টোকহোল্ড থেকে উঠে আসছে তখন দ্রুত পোর্টহোলে কাচ এবং লোহার প্লেট উভয়ই বন্ধ করে দিয়ে চেরির মুখের উপর ঝুঁকে পড়ল এবং বাংলায় বলল, বেশ্যা! তারপরের খিস্তি উচ্চারণ না করে মনে মনে হজম করে ফেলল। তবে অভ্যস্ত ইংরেজিতে উচ্চারণ করল, মাদাম, আমাকে বিপদে ফেলবেন না।
বোস সুমিত্র।
সুমিত্র পূর্বে এ—কেবিনে যে সংকোচ নিয়ে যে ভয় এবং মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বসত আজও তেমন দু’হাতের তালুতে মাথাটা রেখে কেমন অসহায় ভঙ্গিতে বসে থাকল। সে এ—মুহূর্তে কিছুই ভাবতে পারছে না। চার ঘণ্টা ওয়াচের পর ক্লান্ত শরীরটাকে যখন ফোকসালে নিয়ে যাবে ভাবছিল, যখন স্নান সেরে শরীরের সকল ক্লান্তি উত্তাপ দূর করবে ভাবছিল তখন চেরির এই মাতাল ইচ্ছা ব্যাধিগ্রস্ত শরীরের মতো ক্রমশ ওকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
চেরি বলল, তুমি ইচ্ছা করলে স্নান সেরে নিতে পারো সুমিত্র।
সুমিত্র যেহেতু একদা এইসব কেবিনের দেয়াল সাবান—জল দিয়ে পরিষ্কার করেছে, যেহেতু ওর সব জানা… সুমিত্র সুতরাং উত্তর করছে না।
চেরি বাংক থেকে উঠে ওর পাশে বসল। বলল, মাই প্রিন্স। বলে সুমিত্রর কপালে চুমু দেবার জন্য ঝুঁকে পড়ল।
সুমিত্র উঠে দাঁড়াল এবং বলল, মাদাম, আপনি পাগল।
চেরির পা দুটো টলছে এবং চোখ দুটো তেমনি মায়াময়।
সুমিত্রর এই অপমানসূচক কথায় চোখ দুটো কেমন সজল হয়ে উঠল। নিচে এনজিনের শব্দ। আরও নিচে সমুদ্র অতল থেকে যেন ফুঁসছে। চেরি বলল, আমি ভারতবর্ষে যাব সুমিত্র। তুমি নিয়ে চলো। তুমি আমাকে ঘোড়ার পিছনে নিয়ে কেবল ছুটবে, ছুটবে—কোথাও পালিয়ে যাবে।
