সুমিত্র ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর কাপ্তানের কথামতো যখন ব্রিজ পার হয়ে সিঁড়ি ধরে বোট—ডেকে নেমে এল, যখন দেখল সকল জাহাজিরা নেমে যাচ্ছে স্টোকহোলডে, তখন উত্তেজনায় অধীর হতে হতে সে বাংলায় অশ্লীল সব কথাবার্তা বলল চেরিকে উদ্দেশ্য করে এবং এসময় তার একটু মদ খাবার শখ জাগল।
বিকেলবেলা চেরির ঘরে ডাক পড়তেই সুমিত্র তাড়াতাড়ি ছুটে গেল। এক মুহূর্ত দেরি করল না, অথবা সাজগোজের জন্য আয়নার সামনে দাঁড়াল না। সে অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখল চেরি ভয়ানক ভাবে সাজগোজ করে বসে আছে। কোলের উপর ভায়োলিন। প্রসাধনের তীব্র তীক্ষ্ন ভাব সুমিত্রকে যেন সুচতুর যৌনবিলাসী হতে বলছে। চেরিকে সে দেখল। মখমলের পোশাক দেখল এবং নগ্ন ভঙ্গিতে বসে ঠোঁটে বিদ্যুৎ খেলতে দেখল। চিবুকে ভাঁজ পড়েছে—পায়ের ভাঁজে ভাঁজে কেমন আড়ষ্ট ভঙ্গি।
সুমিত্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল, কোনো কথা বলল না।
এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোস।
সুমিত্র কোথায় বসবে ঠিক করতে পারল না।
ডেক—চেয়ারটাতে বোস সুমিত্র।
সুমিত্র খুব আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বসল।
অমন পুতুল—পুতুল ভাব কেন? কোনো সজীবতা নেই চলাফেরাতে। কেবিনে ঢোকবার আগে পোর্টহোলের চোখ দুটো কোথায় রেখে আসো?
আমাকে ক্ষমা করবেন মাদাম। সেই চোখ দুটো কিছুতেই আর সংগ্রহ করতে পারছি না।
কেন, কেন পারছ না?
আজ্ঞে, কাপ্তান অযথা ধমকালেন।
চেরি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অযথা হো হো করে হেসে উঠল, আচ্ছা কাপ্তানের পাল্লায় পড়েছ।
ইয়েস মাদাম। আপনি কিন্তু ও—কথা আবার কাপ্তানকে বলবেন না।
কাপ্তানকে তুমিও কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিতে পারলে না?
সুমিত্র জিভ কাটল।— তা হয় না মাদাম। আমাদের কাপ্তান খুব ভালো লোক। অন্য জাহাজের কাপ্তান ভারতীয় জাহাজিদের সঙ্গে সাধারণত কোনো কথাই বলেন না। সব সারেঙের সঙ্গে কথাবার্তা হয়। অথচ আমাদের প্রিয় কাপ্তান সকল জাহাজিদের নাম জানেন। তাছাড়া নাম ধরে ডেকে ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করেন। আমি কিছু ইংরেজি জানি বলে তিনি খুব খুশি আমার উপর। এই জাহাজে কোলবয় হয়ে উঠেছি, তাঁর দয়ায় এখন আমি গ্রিজার। জাহাজিদের এর চেয়ে বড় উন্নতি এত অল্প সময়ে হয় না।
তবে বলতে হয় কাপ্তান তোমাকে খুব ভালোবাসেন?
হ্যাঁ মাদাম।
আমি ভায়োলিন বাজাই, কই, কোনোদিন তো বললে না আপনার বাজনা শুনতে ইচ্ছা হয়, ভালো লাগে?
কথার আকস্মিক পরিবর্তনে সুমিত্র ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, সাহসে কুলায় না মাদাম।
সাহসে কুলায় না, না ইচ্ছা হয় না?
সুমিত্র এবার জিভ কাটল। চোখে পোর্টহোলের প্রতিবিম্ব ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠেই ফের মিলিয়ে গেল।—যদি অভয় দেন তো বলি।
সুমিত্র আবার ভাবল কোনো বেয়াদপি করে ফেলছে না তো? সে বলল, না থাক মাদাম।
কেন থাকবে? তুমি বলো। অভয় দিচ্ছি।
সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় আপনার বাজনা শুনেছি, দিঘির পারে উইলোগাছের ছায়ায় বসে রোজ বিকেলে ভায়োলিন বাজাতেন।
তুমি লুকিয়ে এতসব করতে?
কিছু মনে করবেন না মাদাম। আমরা সেলার। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর বন্দরে এলেই একটু বৈচিত্র্য খুঁজি। কেউ মদ খায়… কেউ…। চুপ করে গেল সহসা।—না থাক।
চেরি খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বলল, ডাইনিং—হলে নাচগান হবে। তুমি এসো।
সুমিত্র জবাব দিল, সে হয় না, মাদাম। জাহাজিদের অতদূর যাবার সাধ্য নেই।
চেরি বলল, আমি যদি কাপ্তানকে অনুরোধ করি?
মাদাম, আপনি জাহাজে আর চার—পাঁচ দিন আছেন। আপনি নেমে গেলে সব জাহাজিরা, সব অফিসাররা আমাকে ঠাট্টা—বিদ্রুপ করবে।
চেরি চুপ করে থাকল। অন্যমনস্কভাবেই ছড় চালাল ভায়োলিনের তারে। এই সুর সুমিত্রর সেই পরম অপার্থিব চোখ দুটিকে যেন খুঁজছে।
ছোট মালোম এলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সেই শব্দে সুমিত্র উঠে দাঁড়াল।—আমি তবে আসি মাদাম।
বোস। ছোট মালোমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি যাচ্ছি। একটু দেরি হবে। চেরি এবার সুমিত্রকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুমি রোজ এই পথ ধরে নামবে সুমিত্র, কথা দাও।
আপনি দুঃখ পাবেন মাদাম। আমার চোখ দুটো ফের বেইমানি করতে পারে।
না, কথা দাও।
এই পথ ধরেই নামব। কথা দিলাম।
চেরি বসে ছিল চুপচাপ। সুমিত্র চলে গেছে। ছোট মালোমও চলে গেছেন। সে ঘড়ি দেখল। ছ’টা বাজার দেরি নেই। সে বাংক থেকে নেমে জামাকাপড় বদলাল। সে তার দামি ইভনিং—পোশাক পরে আয়নায় প্রতিবিম্ব ফেলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। এ—সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। চেরি প্রশ্ন করল, কে?
আমি, ক্যাপ্টেন স্মিথ।
হয়ে গেছে আমার। আমি যাচ্ছি। বলে চেরি বেহালা হাতে বের হল। কাপ্তানের সঙ্গে চলতে থাকল। ওরা ডাইনিং—হলের দিকে যাচ্ছে। যে সকল অফিসারদের, এনজিনিয়ারদের ওয়াচ নেই তারা পূর্বেই নির্দিষ্ট স্থানে বসে আছে। চেরি ঢুকলে সকলে উঠে সম্মান দেখাল চেরিকে। মালবাহী জাহাজের ছোট ডাইনিং—হল, অল্প পরিসরে কয়েকজন মাত্র পুরুষ। ঘরে নীল আলো। বাটলার, কাপ্তানের আদেশমতো এই ছোট্ট ঘরটিকে বিচিত্র সব রঙিন কাগজে এবং বিভিন্ন রকমের চেয়ার—টেবিলের জেল্লায় জৌলুস বাড়াবার চেষ্টা করেছে। চেরি কেমন খুঁতখুঁত করতে থাকল।
কাপ্তান একটু ইতস্তত করে বলল, সমুদ্রের দিনগুলোতে কোনো আনন্দ নেই। মাদাম। সুতরাং স্বল্প আয়োজন থেকেই যতটা আনন্দ নিতে পারি।
