চেরি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পোর্টহোলের কাচ খুলে দিল। পর্দা তুলে দিল, অথচ সেই চোখ দুটোকে আর খুঁজে পেল না। যতক্ষণ সুমিত্র এই বাংকে বসে ছিল, যতক্ষণ গল্প হল, পোর্টহোলের চঞ্চল চোখ দুটোর গোপনীয় ভাব সুমিত্রর চোখে—মুখে ফিরে এল না। কেমন নিষ্প্রভ, কেমন পাথরের মতো চোখ নিয়ে এতক্ষণ ওর কেবিনে বসে থাকল সুমিত্র। সুতরাং সকল দুঃখকে ভুলে থাকবার জন্য পোর্টহোলের পাশে দাঁড়িয়ে ভায়োলিনটা বাজাতে থাকল চেরি। উপরে নিচে, সামনে পিছনে শুধু নিরবচ্ছিন্ন আকাশ, শুধু নীল সমুদ্র এবং মনে হল সমুদ্রে রূপকথার রাজপুত্রেরা ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে। এবং সেই সব দ্বীপপুঞ্জের অনেক সম্ভ্রান্তবংশীয় যুবকদের চেরি পোর্টহোলে দাঁড়িয়ে দেখল ঘোড়ায় চড়ে সমুদ্রে সুমিত্রর সমানে সমানে ছুটতে পারছে না। জীবনের প্রথম লগ্নে ভারতবর্ষের এক সুপুরুষ যুবাকে, যুবার কোমল চোখ দুটোকে পরম অপার্থিব বস্তু ভেবে চেরি কেমন প্রীত হতে থাকল। চেরি সেই দিঘির (ঠাকুমার বর্ণিত রূপকথা) সিঁড়িতে সুমিত্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। যেন রাজপুত্র কোটালপুত্র নামছে, নামছে। মানিকের আলোয় দিঘির সিঁড়ি ধরে রাজকন্যার দেশে নামছে। নিঝুম পুরী, কোনো শব্দ নেই। লোক নেই, প্রাণী নেই, পাখি নেই, নিঃশব্দ ভাব। সোনার গাছ। গাছে হীরা—পান্নার ফল। সোনার ঝরনা, সোনার পাখি। একই গাছের ডালে নাচ এবং গান। রাজপুত্র গান শুনতে শুনতে নাচ দেখতে দেখতে সদর দেউড়ি পার হয়ে সাত দরজা ডাইনে ফেলে অন্দরের চাবিকাঠিতে হাত বুলাল। এখানে ছোট নদী বইছে—সুবর্ণরেখা নদী। নদী ধরে পদ্ম ভাসছে—কখনও হীরা, কখনও মাণিক্যের। এবং রাজপুত্র চন্দনকাঠের পালঙ্কে রাজকন্যাকে দেখল। এইসব গল্প শুনে টুপাতি চেরি বলত, আমরা কোনোদিন ইন্ডিয়ায় যাব না ঠাকমা?
ঠাকুমা বলতেন, বড় হলে, যাবে। দেখবে তখন কত রাজপুত্র তোমাদের খুঁজতে বের হয়েছে।
চেরি যেন এই বয়স পর্যন্ত কোনো রাজপুত্রকে অনুসন্ধান করতে করতে সহসা পোর্টহোলের কাচে তাকে আবিষ্কার করেছে।
ছোট বড় ঢেউ উঠছে সমুদ্রে। দূরে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডলফিনরা, ফ্লাইং—ফিসের ঝাঁক বর্শার মতো ছুটে আসছে জাহাজের দিকে। দুটো—একটা দ্বীপ, দুটো একটা আগ্নেয়গিরি আকাশ লাল করছে। দ্বীপে ছোট ছোট পাখিরা ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। জলে, লাল নীল হলুদ রঙের মাছ। তখন সূর্য উঠছে।
আবার বিকাল। সূর্য পাটে বসেছে। পোর্টেহোলের ঘন কাচে কোনো চোখ ধরা দিচ্ছে না। টুপাতি দেখল, সুমিত্র আর অ্যালওয়ে ধরে এনজিনে নামছে না। অথবা এনজিন—রুম থেকে উঠে আসছে না। অভিমানে টুপাতির চোখে জল আসতে চাইল।
সেই বিকালে ছোট মালোম এসে বললেন, আসুন, আমরা একসঙ্গে চা খাই।
চেরি বলল, ক্ষমা করবেন মিস্টার। আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
পরদিন ডিনার—পার্টিতে নিমন্ত্রণ করলেন কাপ্তান। বললেন, আজ আপনি আমাদের গেস্ট। আমরা সকলে একসঙ্গে ডাইনিং—হলে খাব।
চেরি বলল, বেশ হবে।
বুড়ো কাপ্তান উঠলেন। চেরি ফের প্রশ্ন করল, আর ক’দিন বাদে বন্দর ধরবে ক্যাপ্টেন?
তিনি কী হিসাব করে একটি তারিখের উল্লেখ করলেন এবং কাপ্তান কী ভেবে ফের বললেন, সন্ধ্যায় ডাইনিং—হলে, একটু নাচ—গান হোক—এই আমার ইচ্ছা।
বেশ হবে।
আপনি অংশগ্রহণ করলে বাধিত থাকব।
অংশগ্রহণ করব।
ভারতীয় জাহাজিটি নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করছে? কাপ্তান কথাপ্রসঙ্গে যেন এই কথাগুলো বললেন।
কোথায় করছে! চেরি এই বলে বড়ো বড়ো হাই তুলল।
ছোঁড়া ভারী বেয়াদপ দেখছি!
ভয়ানক। আবার হাই তুলল চেরি।
দাঁড়ান, ঠিক ব্যবস্থা করছি।
তা করুন। সে কেবল হাই তুলতে থাকল।
এবার আমি আসি।
আচ্ছা।
তখন ঘড়িতে সাতটা বাজল। আটটা—বারোটা ওয়াচের জাহাজিরা বোট—ডেকে উঠে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ওরা ফানেলের পাশ দিয়ে স্টোকহোলডে নেমে যাবে এমন সময়ে কাপ্তান—বয় ছুটে এল। বলল, সুমিত্রকে বাড়িয়ালা তাঁর কেবিনে ডাকছে।
সুমিত্র এই ডাকে ভীত অথবা সন্ত্রস্ত নয়। চেরির চোখে যে স্নেহ দেখেছিল, নিশ্চয়ই তা বেইমানি করতে পারে না। অন্য কোনো কারণ অথবা সারেঙের কানভারী কথা—এমন সব ভেবে সে অ্যাকোমোডেশান ল্যাডার ধরে ব্রিজ অতিক্রম করে কাপ্তানের ঘরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলা ছিল বলে কাপ্তান তাকে দেখতে পাচ্ছে। কাপ্তান যে চার্ট—রুমে কোনো মানচিত্র দেখছে এমন চোখে সুমিত্রকে দেখে দেখে একসময় বলল, তুমি এই জাহাজে কোল—বয়ের চাকরি করতে?
ইয়েস মাস্টার।
আমি তোমাকে ফায়ারম্যান করেছি?
ইয়েস স্যার।
তারপর ইফাতুলা কার্ডিফে নেমে গেল বলে তুমি গ্রিজার হলে?
ইয়েস স্যার।
ইয়েস, স্যার, ইয়েস স্যার! বেয়াদপ পাজি, ন্যাস্টি হেল! কাপ্তান চিৎকার করতে থাকলেন।
সুমিত্র নিচের দিকে মুখ রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। সুমিত্র বুঝতে পারছে না। ওর বেয়াদপি কোথায় এবং কখন ঘটেছে। তবু স্বীকার করাই ভালো। নতুবা কাপ্তান এখনই লগ—বুক এনে খচ খচ করে হয়তো লিখবেন—সুমিত্র, অ্যান ইন্ডিয়ান সেলর ডাজ নট ক্যারি আউট হিজ জব। সে বলল, ইয়েস মাস্টার, আর কোনোদিন বেয়াদপি হবে না।
তাহলে কোনোদিন বেয়াদপি করবে না বলছ?
না মাস্টার, কোনোদিন করব না।
ফের কোল—বয় হবার যদি ইচ্ছা না থাকে, চেরিকে যথাযথ সম্মান দেখাবে।
