এই নিয়ে দু’সফর।
যাত্রী—জাহাজে কোনোদিন চড়নি?
না মাদাম।
তাই তুমি জানতে না অন্যের কেবিনে কখনও উঁকি দিতে নেই।
পোর্টহোল দিয়ে কেবিন অস্পষ্ট বলে আমিও আপনার কাছে অস্পষ্ট—এই ভেবেছি। আপনি ঘরের অন্ধকারে পড়ে থাকতেন, আমি বাইরের আলোতে থাকতাম। সে কথাটা তখন আমার কিন্তু একবারও মনে হয়নি।
তবে বল আমাকে দেখার জন্য চুরি করে উঁকি দিতে?
সুমিত্র মাথা নিচু করে রাখল আগের মতো।
হুঁ এ তো ভালো কথা নয়, সুমিত্র।
সুমিত্র মাথা তুলছে না। সুমিত্রর চোখে—মুখে ফের অপরাধবোধ জেগে উঠছে।
এইসব জাহাজে তোমার কাজ করতে ভালো লাগে?
না মাদাম। কাজ করতে ভালো লাগে না।
তোমার দেশ ভারতবর্ষ, কত বিরাট আর কত অসামান্য দেশ!
আজ্ঞে, মাদাম।
ঠাকুমার কাছে তোমার দেশের রাজপুত্রদের গল্প শুনেছি। সমুদ্রের ধারে ঠাকুমা আমাদের তোমার দেশের রূপকথার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। এইসব কথা বলে চেরি উত্তেজিত হল অথবা কেমন উত্তেজিত দেখাল চেরিকে। চেরি বলল, চিফ—এনজিনিয়ারের কথায় তোমার কিন্তু প্রতিবাদ করা উচিত ছিল।
কোন কথায় মাদাম?
তোমাদের সস্তায় নেওয়া হয়। যেন অনেকটা গোরু—ভেড়ার মতো ভাব।
ওঁরা তো ঠিকই বলেছেন মাদাম। আমরা তাঁদের কাছে—
এইসব লোকদের আমি ঘৃণা করি।
সুমিত্র এবার কথা বলল না। সবকিছুই রহস্যময় মনে হচ্ছে। চেরির সকল কথাই কেমন অসংলগ্ন। সুমিত্র বুঝল না চেরি যথার্থ কাকে ঘৃণা করছে। সুতরাং সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল এবং চেরির অসামান্য রূপে বিহ্বল হতে থাকল।
আমি কাপ্তানকে ধমক দিতে পারতাম। কিন্তু দিইনি। এতে তোমাদের আরও বেশি অপমান করা হবে। একটু থেমে চেরি ফের বলতে থাকল, কাপ্তান এবং চিফ—এনজিনিয়ার আমাকে এনজিন—রুমের সবকিছু দেখালেন। তোমাদের দেখালেন, যেন তোমাদের বাদ দিলে এনজিনের নাট বল্টু বাদ যেত।
মাদাম, আমরা নাবিক। এর চেয়ে বড় অস্তিত্বের কথা ভেবে আপনি অযথা কষ্ট পাবেন না।
তার চেয়ে বড় কথা তুমি ভারতবর্ষের ছেলে। গৌতম বুদ্ধ, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ তোমাদের দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন।
আপনি দেখছি ভারতবর্ষের প্রতি খুব অনুরক্ত।
আমি একটি মহান জাতির প্রতি অনুরক্ত। এখন চেরিকে দেখে মনে হচ্ছে সে এই মুহূর্তে জাহাজে বিপ্লব শুরু করে দিতে পারে।
আমি উঠি মাদাম। ওয়াচের সময় হতে বেশি দেরি নেই।
যেন চেরি শুনতে পেল না, যেন খুব অন্যমনস্ক। চেরি আবেগের সঙ্গে বলতে থাকল, সুমিত্র, আমিও ভারতবাসী। আমার পূর্বপুরুষ ভারতবর্ষ থেকে বাণিজ্য করতে এসে এই সকল দ্বীপে থেকে গেল। আর ফিরল না। তোমাকে দেখে আমি তবে খুশি হব না, তোমার অপমানে আমি আমার অপমান ভাবব না?
সুমিত্র ফের স্মরণ করিয়ে দিল তার ওয়াচের সময় হয়ে গেছে। অথচ চেরি এতটুকু কর্ণপাত করছে না কথায়। এবং সেজন্য সুমিত্র চেরির সকল কথারû ভিতর নষ্ট—চরিত্রের লক্ষণ খুঁজে পাচ্ছে। এই বিষণ্ণ আলাপ সুমিত্রকে চেরি সম্বন্ধে আদৌ কোনো কৌতূহলী করছে না। সুমিত্র মৃত চোখ নিয়ে বসে থেকে সকল কিছুকে বিরক্তিকর ভেবে পোর্টহোলের কাচে ঠান্ডা হাওয়ার গন্ধ নিতে সহসা উঠে দাঁড়াল।
সুমিত্র চলে যাচ্ছে। দরজায় এক পা রেখে দেখল চেরি কথাবার্তায় এখন নরম এবং সহজ হয়ে উঠছে। চেরির মুখ প্রসন্নতায় ভরা। যেন প্রগাঢ় স্নেহ এই জাহাজি মানুষটির জন্য সে লালন করছে। সুমিত্র নির্ভয়ে দরজা টেনে দিতে শুনল, চেরি ভিতর থেকে বলছে, ঠাকুমা আমাদের সকলকে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে নিয়ে যেতেন। ভারতবর্ষের রাজপুত্রদের গল্প করতেন। ভয় অথবা বিষণ্ণতা এ—কদিন ধরে সুমিত্রকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, চেরির শেষ আলাপ, প্রগাঢ় স্নেহবোধ সুমিত্রকে নূতন জীবন দান করছে। সে ডেকের উপর দিয়ে প্রায় ছুটে এল। হালকা শিস দিল ফোকসালে নামার সময়।
চেরি বাংকে বসে থাকল। ভয়ানক একঘেয়ে এই সমুদ্রযাত্রা—চেরি ঠাকুমার স্মৃতি মনে করল। সেই সব রাজপুত্রদের ঘোড়াসকলকে মনে করল। অথবা রাক্ষসের প্রাণ রুপোর কৌটায় সোনার ভ্রমরে… যেন পা ছিঁড়ছে হাত ছিঁড়ছে—রাক্ষসটা গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে… চেরি এই কেবিনে উঠে দাঁড়াল। অথবা নির্জন দ্বীপে রাজকন্যা নিদ্রিত, রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে ছুটছে… চেরি ঠাকুমাকে স্মরণ করতে পেরে এইসব ভাবল। সেইসব মনোরম বিকেলের কথা তার মনে হল। যেন সুমিত্রকে দেখেই সে তার কৈশোর—জীবনের কথা মনে করতে পারছে। বিকালের সমুদ্র পাহাড়ের ধারে, ছোট ছোট মাছেরা খেলছে। সমুদ্রের ধারে ওরা ছুটোছুটি করছে। নারকেল গাছের ছায়ায় ঠাকুমা ভারতবর্ষের দিকে মুখ করে বসে আছেন, যেন যথার্থই তিনি ভারতবর্ষকে, তাঁর পিতৃপুরুষের দেশকে, দেখছেন। তখন অ্যান্টনি নারকেল গাছ থেকে ডাব কেটে দিচ্ছে সকলকে। ওরা বালিয়াড়িতে ছুটে ছুটে ক্লান্ত। ওরা ডাবের জল খেতে খেতে ঠাকুমার পাশে বালির উপর শুয়ে পড়ল। তখন সমুদ্রে সূর্য ডুবছে। নির্জন পাহাড়ি দ্বীপে কচ্ছপেরা ডিম পেড়ে গেল এবং ঠাকুমা তাঁর ঠাকুমার—মতো—রূপকথার গল্প আরম্ভ করে চেরির মুখ টিপে বলতেন, তোর জন্য ভারতবর্ষ থেকে এক টুকটুকে রাজপুত্র ধরে আনব। চেরির সেই কৈশোর মন ঠাকুমার কথা যথার্থই বিশ্বাস করে এক রঙিন স্বপ্নে ঠাকুমার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ত।
