সুমিত্রর দৃঢ়তাটুকু কেন জানি চেরির ভালো লাগল না। যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও এনজিনে ঘাড় গুঁজে কাজ করছিল, যার চোখ দুটো ভয়ে বিব্রত ছিল, সে সহসা এমত দৃঢ় ইচ্ছায় প্রকট হবে, অথচ চোখে কোনো করুণার চিহ্ন থাকবে না, অবাধ্য যুবকের মুখভঙ্গিতে বসে থাকবে চেরি এমত ভাব সহ্য করতে পারছে না। সে ফের প্রশ্ন করল, পোর্টহোলে উঁকি দিয়ে কী দেখার চেষ্টা করতে বল।
মাদাম, আমার সম্বন্ধে আপনি খুব বেশি ভাবছেন।
একবার নয়, দুবার নয়, অনেকবার পোর্টেহোলে উঁকি দিয়েছ তুমি। ভেবেছ, পোর্টহোলের কাচ মোটা বলে আমি কিছু দেখতে পাইনি? সি—সিকনেসে ভুগছিলাম, নতুবা কাপ্তানকে দিয়ে তক্ষুনি ডেকে পাঠাতাম।
সুমিত্র মাথা নিচু করে আগের মতো বসে থাকল।
পরে জেনেছি তুমি ইন্ডিয়ান সুমিত্র। টুপাতি একটা বালিশ টেনে কোলের উপর চেপে বলল, কফি ঠান্ডা হচ্ছে, খেয়ে নাও।
সুমিত্র ভয়ে ভয়ে কফিতে চুমুক দিল। খুব আদর—যত্নে এই মেয়েটি প্রতিপালিত—সে তাও ধরতে পারছে। সে একবার ভাবল, কাপ্তানকে বলে দেয়নি তো; সুমিত্র কেমন শুকনো মুখে কফি গিলতে থাকল। বলল, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি এই পথ ধরেই আর এনজিন—রুমে আসব না। আপনি দয়া করে কাপ্তানকে শুধু কিছু বলবেন না। আমি সব করব। আপনি যা বলবেন সব করব। সে কেমন আড়ষ্ট গলায় এইসব বলে দরজা খুলে বের হয়ে গেল। কারও দিকে তাকাল না। সোজা ফোকসালে গিয়ে বাংকে শুয়ে ভয়ংকর অপমানবোধে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকল।
চেরি বাংকেই চুপ করে বসে থাকল। সুমিত্রর পায়ের শব্দও একসময় মিলিয়ে গেছে। পোর্টহোলের কাচে এখন আর কোনো প্রতিবিম্ব ভাসছে না। এতক্ষণ এই কেবিনে সুমিত্রর চোখ মৃত এবং সাদা ছিল, এতক্ষণ চোখ দুটোতে যেন নিঃসঙ্গ ভূতের আতঙ্ক—এইসব ভেবে চেরি নিজের উপরই বিরূপ হতে থাকল। সে সুমিত্রকে কোনো কৌশলেই যেন আয়ত্তে আনতে পারছে না। অথচ দু’দিনের দেওয়ানি চেরিকে যখন এই কেবিনে মৃত্যুর মতো আতঙ্কিত করে রেখেছিল, তখন পোর্টহোলের কাচে কোনো এক যুবকের চঞ্চল চোখ, জীবনের প্রতীক যেন… যেন দর্পণ—তাকে নিয়ত রাজকন্যার মতো করে রেখেছে। ঠাকুরমার গল্পের স্মৃতি এই কেবিনে কোনো এক যুবকের শরীরে রূপ পাচ্ছিল—রাজপুত্র, কোটালপুত্র ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে, এক রাজ্য আক্রমণ করে অন্য রাজ্যে, কত গাছ, কত পাখ—পাখালি কত বন—বাদাড় অতিক্রম করে যাচ্ছে—আহা, ভারতবর্ষের রাজপুত্রেরা ঘোড়ায় চড়ে একদা রাজকন্যা খুঁজতে বের হত, গল্পে রাজপুত্রের চোখ যেমত এই বয়স পর্যন্ত অনুসরণ করেছে চেরিকে—এই কেবিনে সেই চোখ, সেই রাজপুত্র এতক্ষণ ক্লান্ত ঘোড়ার মতো পা ঠুকে ঠুকে নিঃশেষ হয়ে গেল। চেরি উচ্চারণ করল—বেচারি!
বস্তুত টুপাতি চেরি শৈশবের রূপকথার রাজপুত্রের চোখকেই যেন পোর্টহোলে প্রত্যক্ষ করেছিল। দেওয়ানিতে মাথা তুলতে পারছে না, শরীরে ভীষণ ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং সারাদিন বাংকে পড়ে থাকা, সে—সময় পোর্টহোলের ঘন কাচে সুমিত্রর চোখ দুটোই এক অসামান্য রূপকথার রাজত্ব, সুখ এবং আনন্দ এই কেবিনে পৌঁছে দিয়ে গেছে। ঠাকুরমার কোলে শুয়ে রাজপুত্রের গল্প শুনতে শুনতে চেরি ঘুমিয়ে পড়ত, যে রাজপুত্রের চোখ দুটো জীবনের এতদিন পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করে আসছে, পোর্টহোলে সহসা সেই চোখ দুটোকে যেন আবিষ্কার করেছে চেরি এবং প্রত্যক্ষ করেছে।
রাত্রিবেলায় সুমিত্র ওয়াচে নামার সময় অন্য পথ ধরে গেল।
ওয়াচ থেকে উঠে আসবার সময় কসপ বলল, কাজ রাজকন্যা তোমাকে কী বলল সুমিত্র?
সুমিত্র জবাব দিল, আমার দেশ কোথায়, কী নাম—এইসব নানারকমের কথা। সব মনে নেই।
সাহেবদের ফেলে তোমার দিকে এমন নজর!
কী করি! রাজকন্যার মর্জি বোঝা দায়।
বিকাল বেলায় সুমিত্র দেখল চেরি বোট ডেকে বসে আছে। কাঁটা দিয়ে উল বুনছে। পাশে ছোট মালোম বসে—নিশ্চয়ই গল্প করছেন। ডেক—অ্যাপ্রেন্টিসরাও সেখানে আছে। বেশ গুলজার বলতে হবে। সে পিছিলের ছাদের নিচ থেকে সব দেখল। রঙিন কাগজের মতো মখমলের পোশাক চেরির সমস্ত শরীরে জড়ানো। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত গাউনের শেষ প্রান্ত ঝুলছে। চুলের গুচ্ছ বুফা কায়দায় জড়ানো। ঘাড়ের মসৃণ ত্বক, কমলা রঙের রোদ, কালো মেঘবরণ চুল এই সমুদ্রের নীল নির্জনতাকে ভেঙে দিচ্ছে। সুমিত্র গ্যালিতে ঢুকে, গ্যালির জানালা দিয়ে আড়ালে চেরিকে দেখতে থাকল। অন্যান্য জাহাজিরাও সেখানে এসে ভিড় করছে। ওর এই ভিড় ভালো লাগছে না। ওর মনে হল ফের জাহাজি নিঃসঙ্গতা ওকে জড়িয়ে ধরছে। এই মনোরম বিকেল, কমলা রঙের রোদ এবং ছোট মালোমের উপস্থিতি কেন জানি তাকে কেবল পীড়া দিচ্ছে। সে গ্যালি থেকে বের হয়ে সিঁড়ি ধরে নেমে ফোকসালে ঢুকে বাংকে শুয়ে পড়ল। এক অহেতুক ঈর্ষার জন্ম হচ্ছে মনে। সে বাংকে শুয়ে চেরির অসামান্য রূপে দগ্ধ হতে থাকল।
কাপ্তান—বয় ছুটতে ছুটতে এসে বলল, সুমিত্র, আবার যে ডাক পড়েছে পাঁচ নম্বর কেবিনে।
সুমিত্র বলল, কেন, চেরি তো বোট—ডেকে বসে আছে দেখে এলাম।
এখন আর নেই। কেবিনে ঢুকেই বলছে, সুমিত্রকে আসতে বল।
কী ফ্যাসাদে পড়া গেল চাচা!
কোনো ফ্যাসাদ নেই। আল্লাতায়লায় ভরসা রাখ। খুশি হয়ে চলে যাও।
কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে সুমিত্র প্রথমে অনুমতি নিল, পরে ঘরে ঢুকে ডানদিকের বাংকে বসল। চেরি সুমিত্রর জন্য প্রতীক্ষা করছিল এমন ভাব চোখে—মুখে। সে—ও সুমিত্রর পাশে বসে পড়ল এবং বলল, জাহাজে কত দিন ধরে কাজ করছ?
