ওরা এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল। সারেং ঘরে ঢুকতে ইতস্তত করছে এবং কোনোরকমে গলা সাফ করতেই কাপ্তান দরজা খুলে বের হলেন। তিনি ওদের দেখে বললেন, সারেং, তুমি কেন? তোমাকে তো ডাকিনি!
হুজুর, কাপ্তান—বয় যে বলল—
আরে না না, সুমিত্র হলেই চলবে। আমাদের সম্মানীয়া যে যাত্রীটি যাচ্ছেন, তিনি একবার ওকে ডেকে পাঠিয়েছেন।
এতক্ষণ সুমিত্র শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বাড়িয়ালার এইসব কথায় সে কিঞ্চিৎ সাহস সঞ্চয় করতে পারছে। সে বলল, মাস্টার, আমি যাব?
তুমি একবার পাঁচ নম্বর কেবিনে যাবে। যখন ডেকে পাঠিয়েছেন, তখন যেতেই হবে।
সুমিত্র ইচ্ছা করলে বোট—ডেক অতিক্রম করে টুইন—ডেকে নেমে অফিসার গ্যালি ডাইনে ফেলে পাঁচ নম্বর কেবিনে হাজির হতে পারে, অথবা অ্যাকোমোডেশান ল্যাডারেরই একটা অংশ ডাইনিং হলে নেমে গেছে—সেই সিঁড়ি ধরে নামলেও চেরির দরজা। একটু ঘোরা পথ অথবা খুব কাছের পথ—কোনটা ধরে যাবে ভাবছিল, ভাবছিল চেরির সহসা এই ইচ্ছা কেন? পাথরের আড়াল থেকে চেরি ওকে নিশ্চয়ই দেখেনি, কারণ সেখানে সুমিত্রর অবয়ব স্পষ্ট ছিল না। সে অন্যমনস্কভাবেই হাঁটছিল। সে সিঁড়ি ধরে টুইন—ডেকে নেমে দেখল কমলা রঙের রোদ ডেকে, কিছু নীল তরঙ্গ জাহাজের চারপাশটায়। পিছিলে জাহাজিরা অনেকে নামাজ পড়ছে। সে নেমে আসার সময় তাদেরও দেখল।
ডেক—কসপ বলল, কিরে সুমিত্র, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস? কাপ্তান তোকে কিছু বলেছে?
সুমিত্র কোনো উত্তর না দিয়ে আলওয়েতে ঢুকে দেখল কেবিনের দরজা বন্ধ। সে ধীরে ধীরে কড়া নাড়তে থাকল।
ভিতর থেকে কাপ্তান—বয় বলল, কে?
আমি চাচা, সুমিত্র।
ভিতরে এসো। ভিতরে এসো।
সে পা টিপে টিপে কেবিনে ঢুকল। সে দেখল, কাপ্তান—বয় লকার, টিপয় এবং অন্য সব বাংকের বিছানা ঝেড়ে দিচ্ছে। চেরির বাদামি রঙের ঘাড় আঙুরফলের মতো রঙ ধরেছে। চেরি ঘাড় গোঁজ করে বাক্সের ভিতর কী যেন খুঁজছে।
কাপ্তান—বয় বলল, সুমিত্র এসেছে মাদাম।
সুমিত্র দেখল সেই আঙুলফলের মতো ঘাড় খুব সন্তর্পণে যেন নড়ছে। যেন বেশি চঞ্চল হতে নেই, উচ্ছল হতে নেই। সে দেখল সুমিত্রকে ঘাড় ঘুরিয়ে এবং যত ধীরে ঘাড় ঘুরিয়েছিল তার চেয়েও ধীরে ঘাড় ফেরাল।—ওকে বসতে বল।
সুমিত্র পাশের ছোট্ট ডেক—চেয়ারে বসল।
চেরি তখনও বাক্সের ভিতর কী যেন খুঁজছে। সে বলল, বয়, তুমি যেতে পারো।
সুমিত্র বাংলায় বলল চাচা, আপনি চলে যাচ্ছেন!
মেয়েমানুষকে এত ভয় দাদা, ফোকসালে তো খুব হইচই করতে।
সুমিত্র জবাব দিতে পারল না। সে চুপ করে বসে থাকল। কাপ্তান—বয় দরজা বন্ধ করে চলে গেল। সুমিত্র এ সময় উঠল এবং দরজা কিঞ্চিৎ খুলে দিল। সে নিচে এনজিনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে অথবা সুমিত্রর মুখে উষ্ণবলয়ের শেষ উত্তাপ—চিহ্ন… সে চুপ করে বসে পড়ল ফের। পোর্টহোলের কাচ খোলা, উপরে পাখা ঘুরছে এবং দরজা দিয়েও কিছু হাওয়া প্রবেশ করতে পারছে, তবু সুমিত্র ঘেমে নেয়ে উঠল। যত সে দৃঢ় হবার চেষ্টা করছে, তত যেন ওর মুখে আসন্ন সন্ধ্যার বিষণ্ণতার ছোপ লাগছে। তত সে অসহায় বোধ করল নিজেকে।
এতক্ষণ পর চেরি মুখ ফেরাল। শরীরে হালকা গাউন, ব্রেসিয়ার স্পষ্ট। চেরি দু’হাঁটু ভাঁজ করে বাংকে বসল। সুমিত্রর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করল, পোর্টহোলে রোজ উঁকি মারতে কেন?
আর উঁকি মারব না মাদাম।
কেন উঁকি দিতে তাই বল।
দীর্ঘদিন সফর করছি। দেশে জাহাজ ফিরছে না, কেবল জল আর জল।
একটু বৈচিত্র্য চাইছ?
আজ্ঞে।…. সুমিত্র আর কিছু প্রকাশ করতে পারল না। ভয়ে এবং বিষণ্ণতায় আড়ষ্ট বোধ করতে থাকল। ওর পায়ে সুন্দর জুতো, নেলপালিশ নখে, সুগোল হাঁটু পর্যন্ত পা… সে নিচু করে রেখেছে মুখ, তবু ওর সব যেন দেখতে পাচ্ছে সুমিত্র। গাউনের শেষ প্রান্তে লতার গুচ্ছ, পায়ের কোমল ত্বকে কেবিনের আলো… সে আর পারছে না, সে বলল, মাদাম, আর হবে না। আমাকে ক্ষমা করুন।
তুমি তো ভারতবর্ষের লোক সুমিত্র?
সুমিত্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, এবং চোখ তুলে এই প্রথম চেরির চোখ দুটো খুব কাছে থেকে দেখল, এত উজ্জ্বল, এত প্রাণবন্ত চোখ সে যেন ওই প্রথম দেখল। শালীনতার তীব্র তীক্ষ্ন ভাব চেরিকে, চেরির চোখ দুটোকে কঠিন করে তুলেছে। সুমিত্র চেরিকে সহ্য করতে পারছে না। সে বলল, আমি উঠি।
চেরি এবার না হেসে পারল না,—তুমি ভয়ানক ভীতু সুমিত্র। শুনেছি সম্রাট অশোক দিগবিজয়ে বের হয়েছিলেন। তিনি তাঁর ছেলে এবং মেয়েকে এইসব দ্বীপে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। সেই ভারতবর্ষের ছেলে তুমি!
সুমিত্র এবার একটু হালকা বোধ করল এবং ভালো করে কেবিনের চারপাশটা দেখে নিল। এতক্ষণ পরে সে ধরতে পারছে এই কেবিনে ফুলেল তেলের গন্দ, বিদেশি দামি সেন্টে অথবা কোথাও ধূপ দীপ অনবরত জ্বলে জ্বলে চেরিকে, ওর পোশাককে রূপময় করেছে। বাংকের উপর ভায়োলিন। দেয়ালে সুন্দর ক্যালেন্ডার। সমুদ্রে ঢেউ। বাইরে ঢেউ ভাঙার শব্দ। নিচে এনজিন—ঘরের আওয়াজ এবং চেরির চোখ দুটোতে দ্বীপপুঞ্জের কমলালেবুর গন্ধ। চোখ দুটো কমলালেবুর মতোই সজল।
চেরি কাপ্তান—বয়কে দিয়ে দু’কাপ কফি আনাল। চেরি ইচ্ছা করেই দূরত্ব ভেঙে দেবার চেষ্টাতে এক কাপ কফি খেতে অনুরোধ করল। সুমিত্র এরপর ভারতবর্ষের কোনো রাজপুত্রের মতোই দৃঢ় হল এবং বলল, আপনি আমায় কেন ডেকেছেন মাদাম?
