সুমিত্র যেখানে কাজ করছে, সেটা এনজিনের তৃতীয় স্তর। দ্বিতীয় স্তরে চেরি এবং কাপ্তান। চেরি এনজিনটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। সুতরাং অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুমিত্র একবার চেরিকে গোপনে দেখে ফেলল। চেরি সিলিন্ডার পরিদর্শন করে সিঁড়ি ধরে ক্রমশ নিচে নামছে। ওরা সুমিত্রের পাশ দিয়ে যথাক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে। সুমিত্র নিজের পোশাকের দিকে তাকাল—নীল কোর্তা ওকে মোল্লা মৌলভি বানিয়ে রেখেছে। চেরি নিচে নেমে যাচ্ছে। মেশিনের হাওয়ায় ওর চুলগুলো উড়ছে। গায়ে সাদা সিল্কের ফ্রকোট। পরনে নেভি ব্লু স্কার্ট। সুমিত্র নিজেকে আড়াল দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল, বড় মিস্ত্রি এবং কাপ্তান চেরিকে এনজিনের মতো দ্রষ্টব্য বস্তু হিসাবে সুমিত্রর দিকে হাত তুলে দেখাচ্ছে—এরা ইন্ডিয়ান। কোম্পানি ওদের কলকাতা অথবা বোম্বাই বন্দর থেকে তুলে নেয়। খুব কম পয়সায় ওরা বেশি কাজ দেয়।
বড় মিস্ত্রি অনেকটা পাদরিসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, বেচারা!
সুমিত্র লজ্জায় মেশিনের ভিতর আরও ঝুঁকে পড়ল। চেরি ওর মুখ না দেখে ফেলে এমত ইচ্ছা এখন সুমিত্রর।
সুমিত্রর এখন কত কাজ। সে ঘুরে ঘুরে এনজিনের সকল স্থানে তেল দিল। চেরি হেঁটে যাচ্ছে, চেরি ফিরেও তাকাচ্ছে না, চেরি পোর্ট—সাইডের বয়লার ককের সামনে দাঁড়াল। বড় মিস্ত্রি বলল, এটা কনডেনসার। সার্কুলেটিং পাম্পের সাহায্যে জল ফের বয়লারে চলে যায়। ফের চেরি এবং বড় মিস্ত্রি ওর পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। ওরা গল্প করছে। সে তাকাল না। লজ্জায় সংকোচে সে টানেলের ভিতর ঢুকে গেল। কিন্তু চেরির চোখ দুটো বড় গভীর এবং ঘন। সুমিত্র টানেলের মুখে এসে প্রপেলার শ্যাফটের একপাশে দাঁড়িয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে চেরিকে আড়াল থেকে দেখতে থাকল। চেরি ওকে দেখতে পাচ্ছে না, ওর শরীরের বাদামি রঙ, হালকা পোশাক—প্রজাপতির মতো যেন এনজিনে ও উড়ে বেড়াচ্ছে।
চেরি ইভাপোরেটারের পাশ দিয়ে যেতেই সেই গোপনীয় চোখ দুটোকে আবিষ্কার করে ফেলল। চেরি দেখল দুটো ডাগর চোখ (ঠিক যেন ঠাকুমার গল্পের রাজপুত্রের মতো) রাক্ষসের দেশে চেরিকে কেউ চুরি করে দেখছে। এইসব ভেবে একটু অন্যমনস্কতায় ভুগে যখন আবার চোখ তুলল চেরি, তখন দেখতে পেল চোখ দুটো সেখানে নেই, অন্যত্র কোথায় সরে গেছে।
ভয়ে সুমিত্র একপাশে সরে দাঁড়াল। সে তেল দিল ইতস্তত এবং কাপ্তানকে টুপাতি নালিশ দিলেও যেন বলতে পারে, না মাস্টার, আমি শুধু এনজিনেই তেল দিচ্ছি। টুপাতি এ সময়ে সামনে এসে দাঁড়াল। লজ্জায়, সংকোচে সুমিত্র চোখ তুলতে পারছে না। সে পেটের সঙ্গে অথবা এইসব যন্ত্রের সঙ্গে যেন মিশে যাচ্ছে। চেরি এখন সুমিত্রর কোঁকড়ানো চুল শরীরের বাদামি রঙ দেখছে। ঘাড়ের নরম মাংসগুলো দেখল। তারপর সিঁড়ি ধরে স্টিয়ারিং—এনজিনে তেল দিতে যাবার সময় সুমিত্র শুনল টুপাতি যেন ওর সম্বন্ধে কী বলছে।
সুমিত্র ফোকসালে এসে কাপড় ছাড়ল—কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলল না। উপরে উঠে স্নান করল, কোনো কথা বলল না। খেতে বসে চুপচাপ খেয়ে উঠল। অন্য তেলয়ালা বলল, কী হয়েছে রে? মুখটা খুব ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
অনেকে এমত প্রশ্ন করলেও সুমিত্র জবাব দিচ্ছে না। সে বাংকে বসে অযথা সিগারেট খেল, অযথা কতকগুলি ইংরেজি পত্রিকার সস্তা অশ্লীল ছবি দেখল এবং কোনো আতঙ্কে সে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। এনজিনের ভিতর থেকে সেই চোখ দুটো যেন এখনও ওকে তাড়া করছে। বারবার মনে হচ্ছে চেরির প্রতি চোখের এই স্পর্শকাতরতা সুখকর নয়। পোর্টহোলে সুমিত্রকে উঁকি দিতে দেখেছে এবং সেজন্য নিশ্চয়ই বিরক্ত হয়েছে চেরি। কাপ্তানকে নালিশ দিয়েছে হয়তো।
আর বিকাল বেলাতেই বুড়ো কাপ্তান—বয় এল পিছিলে। প্রায় ছুটতে ছুটতে এল। সুমিত্র বাংকে শুয়ে ছিল, ঘুম আসছে না। সেই চোখ কেবল ওকে অনুসরণ করছে। কাপ্তান—বয় সারেংয়ের ঘরে উঁকি দিয়ে বলল, সারেংসাব, বাড়িয়ালার ঘরে সুমিত্রর ডাক পড়েছে।
সুমিত্র শুনল, কাপ্তান—বয় এইসব কথা বলে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে যাচ্ছে। সে শুনল, সারেং সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে আসছে এবং ওর ঘরের ভিতরও সেই শব্দ। সুমিত্র ভয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকল।
সারেং ডাকল, এই সুমিত্র ওঠ। বাড়িয়ালা তোকে ডাকছে।
সুমিত্র উঠে বসল, আমাকে যেতে হবে সারেংসাব?
কী করি বল? বাড়িয়ালা যে যেতেই বলল।
আমি কিছুই করিনি সারেংসাব। সুমিত্র অপরাধবোধে পীড়িত হতে থাকল। বার বার নামতে উঠতে পোর্টহোলে সহসা কখনও চোখ রেখেছে এবং এক তীব্র কৌতূহল ওকে বারবার এই বৃত্তিতে প্রলুব্ধ করেছে।
সুমিত্র লকার খুলে সাদা জিনের প্যান্ট পরল, জ্যাকেট গায়ে দিল, তারপর পায়ে জুতো গলিয়ে সারেংসাবকে বলল, চলুন। সে সিঁড়ি ধরে উঠবার সময় দৃঢ় হবার চেষ্টা করল। কেউ প্রশ্ন করলে না। কারণ, বাড়িয়ালা একমাত্র জাহাজিদের অপরাধের জন্য তাঁর ঘরে অথবা ডাইনিং—হলে ডেকে থাকেন। সুতরাং সকল জাহাজিরা সুমিত্রকে দেখল সিঁড়ি ধরে নেমে যেতে। সুমিত্র যেন ওর অপরাধ সম্বন্ধে সচেতন, সে সেজন্য চোখ তুলল না। সে এখন অন্য কোনো জাহাজিকেই দেখছে না। জাহাজটা যে চলছে এ—বোধও এখন সুমিত্রর নেই। উষ্ণমণ্ডলের গরম কমে যাচ্ছে, বিকেল হতেই ঠান্ডা—ঠান্ডা ভাব ডেকে, সুমিত্র ডেক ধরে যাবার সময় তাও অনুভব করতে পারল না। সে সারেংয়ের সঙ্গে বোট—ডেক পার হয়ে ব্রিজে উঠে যাবার সিঁড়ি ধরে কাপ্তানের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
