সুমিত্র এনজিন—রুমে নেমে যাওয়ার সময় দেখল ডেক—অ্যাপ্রেন্টিস চুরি করে টুপাতি চেরির পোর্টহোলে উঁকি দিচ্ছে। সুমিত্ররও এমন একটা ইচ্ছা যে না হচ্ছে, তা নয়। তারও না—দেখি না—দেখি করে পোর্টহোলের কাচ অতিক্রম করে চেরির অবয়ব দর্শনে খুশি হবার ইচ্ছা। কিন্তু পোর্টহোলের মুখোমুখি হতে কেমন যেন বিব্রত বোধ করল। সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ধরে এনজিন—রুমে নেমে কসপের ঘর থেকে তেল মেপে এনজিনের পিস্টনগুলোতে এবং অন্যান্য যুক্তস্থানে তেল ঢালতে লাগল। ওয়াচ শেষে উপরে উঠবে তখন নিশ্চয়ই চেরি কেবিনে পড়ে থাকবে না, সমুদ্র এবং আকাশ দেখার জন্য নিশ্চয়ই বোট—ডেকে উঠে পায়চারি করবে, সে এমত চিন্তাও করল।
ওয়াচ শেষে অন্য পীরদারদের ডেকে দিল সুমিত্র। এনজিন—রুম থেকে সোজা না উঠে, স্টোকহোলড দিয়ে ফানেলের গুঁড়ি ধরে উপরে উঠে গেল, প্রত্যাশা চেরি যদি ব্রিজের ছায়ায় বোট—ডেকে বসে থাকে। সে ওর পাশ দিয়ে হেঁটে যাবে এই ইচ্ছায় যথার্থই বোট—ডেকে উঠে গেল। যখন দেখল ব্রিজের ছায়ায় কেউ নেই, তখন সুমিত্র কেমন বিচিত্র এক অপমানবোধে পীড়িত হতে থাকল।
সুমিত্র স্নান করার সময় ভাণ্ডারীকে বলল, মানুষের কত রকমের যে শখ জাগে চাচা!
ভাতিজার হ্যান মনের দশা ক্যান?
এই কিছু না। সুমিত্র মনে করতে পারল, এনজিন—রুমে সে যতক্ষণ ছিল, সব সময়টা উপরে ওঠার জন্য মনটা ছটফট করেছে। সে চেরির সঙ্গে কী এক আত্মীয় সম্পর্কে যেন ঘনিষ্ঠ। সে মনে মনে এই বোধের জন্য না হেসে পারল না।
এ—ছাড়া সুমিত্র পর পর দু’দিনের জন্য একবারও চেরিকে বোট—ডেকে অথবা গ্যাঙওয়েতে এমনকি ডাইনিং—হলেও দেখল না। যুবতী এই জাহাজে উঠেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। দশদিনের সমুদ্রযাত্রা। এ—দু’দিন চেরি জাহাজ—ডেকে একবারও বের হল না। সুতরাং সুমিত্র যতবার এনজিন—রুমে নেমেছে, ততবার কেবিনের পাশে এসে একবার থেমেছে। সে পোর্টহোলের ঘন কাচের ভেতর দিয়ে চেরির কেবিন প্রত্যক্ষ করতে চেষ্টা করত। কিন্তু পোর্টহোলের ঘন কাচের ভিতর দিয়ে চেরির কেবিন সবসময় অস্পষ্ট থাকছে। কেবিনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। মেস—রুম মেট অথবা মেস—রুম বয় এদিকে আসছে না। বুড়ো কাপ্তান—বয় চেরিকে দেখাশোনা করছে। অফিসাররা পর্যন্ত জাহাজে চুপ মেরে গেছেন। যত জাহাজটা চলছে তত যেন নাবিকরা সব ঝিমিয়ে পড়ছে। চেরি দরজা খুলল না, ডেকে বের হল না, পায়চারি করল না। অফিসারসকল প্রতিদিন ডেক—চেয়ারে সাজগোজ করে বসে থাকলেন, অবসর সময় একটু আলাপ অথবা উদ্বিগ্ন হবার ভঙ্গিতে কৃত্রিম ইচ্ছা প্রকাশের জন্য। কখনও কখনও ছোট মালেম দরজা পর্যন্ত হেঁটে আসতেন। তারপর সমুদ্রের নির্জনতা ভোগ করে একসময় কেবিনে ঢুকে সস্তা সব ক্যালেন্ডারের ছবি দেখে ভয়ানক অশ্লীল আবেগে ভুগতেন।
সমুদ্রে নীল নোনা জল, আকাশে ইতস্তত নক্ষত্র জ্বলছে। খুব গরম পড়েছে—উষ্ণমণ্ডলের এই আবহাওয়া জাহাজিদের ফোকসালে বসতে দিচ্ছে না, ওরা শুতে পারছে না গরমে। ওরা উপরে উঠে ফল্কাতে মাদুর বিছিয়ে সেজন্য অধিক রাত পর্যন্ত তাস খেলছে। কেউ জাল বুনছে মাস্টের আলোতে। জাহাজটা চলছে, জ্যোৎস্না রাত। সমুদ্রে অকিঞ্চিৎকর তরঙ্গ এবং সহসা সমুদ্র থেকে ঠান্ডা হাওয়া উঠে এসে জাহাজিদের সুখ দিচ্ছে। এবং প্রপেলারটা অনবরত ঝিঁ ঝিঁ পোকার করুণ আর্তনাদের মতো যেন কাঁদছে। বিশেষ নির্দিষ্ট গতিতে জাহাজটা চলছে, দৃশ্যমান বস্তু বলতে এই নক্ষত্রের আকাশ এবং সমুদ্র। গরমে কাপ্তান ব্রিজে পায়চারি করছেন। দুটো একটা আলো দেখা যাচ্ছে সমুদ্রে। দ্বীপপুঞ্জের জেলেরা এখন হয়তো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরছে।
সুমিত্র জাহাজিদের বলল, আচ্ছা ব্যাপার তো! দু’দিনের ভেতর একবারও যুবতীকে ডেকে দেখা গেল না! এ যে দেখছি চাচারা তোমাদের বিবিদেরও হার মানাচ্ছে!
ডেকের বড় ট্যান্ডল বলল, তোমাদের ভয়েই বার হচ্ছে না।
আমরা খেয়ে ফেলব নাকি?
বড় বাকি রাখবে না।
সুমিত্র দেখল তখন বুড়ো কাপ্তান—বয় এদিকেই আসছে। সে এসে ওদের পাশেই তাস খেলা দেখতে বসে গেল।
সুমিত্র বলল, রাজকন্যার খবর কী চাচা?
আর বলবেন না দাদা। রাজকন্যাকে দেওয়ানিতে ধরছে। মাথা তুলতেই পারছে না। শুধু বিছানায় পড়ে থাকছে।
রাজকন্যা কিছু বলছে না তোমাকে?
আমি বুড়োমানুষ, আমাকে কী বলবে দাদা!
অন্য জাহাজি প্রশ্ন করল, মাথা একেবারেই তুলতে পারছে না?
কাপ্তান—বয় বলল, পারছে। বিকেলে দেখছি কেবিনেই পায়চারি করছে। মনে হয়, কালতক ডেকে ঘুরে বেড়াতে পারবে।
জাহাজটা তখন তেমন দুলছে না। ওরা ফল্কার উপর বসে গল্প করছে। জ্যোৎস্নার আলোতে ওদের মুখ বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। গ্যালিতে মাংস সিদ্ধ করছে ভাণ্ডারী। উইন্ডসহোল ধরে নিচ থেকে জাহাজিদের কথা ভেসে আসছে। এবং সেখানেও চেরি—সংক্রান্ত কথাবার্তাতে ওরা নিজেদের কঠিন মেহনতের দুঃখকে ভুলতে চাইছে।
সুমিত্রই সকল জাহাজিদের খবরটা দিল—কাল টুপাতি চেরি ডেকে বের হবে। পরদিন আটটা—বারোটার ওয়াচে সুমিত্র এনজিন—রুমে নেমে কসপের ঘর থেকে তেল মেপে নিল। ক্যানে ভর্তি তেল সে এনজিনের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে দিচ্ছে। একটু নুয়ে মেসিনের ভিতর ঝুঁকে পড়ল। তারপর ক্যানের তেল উঠাল, নামাল এবং সে ঘুরে ঘুরে একই কাজের পুনরাবৃত্তি করছে….সে ক্যান উঠাল, নামাল। অন্য কোনো দিকে তাকাতে পারছে না। সে যেন বুঝতে পারছে উপর থেকে সিঁড়ি ধরে কারা নামছে। সে চিফ ইনজিনিয়ার এবং কাপ্তানের গলা শুনতে পাচ্ছে। সুতরাং এ সময়ে কোনো অন্যমনস্কতা রাখতে নেই। এ সময়ে সে তেলয়ালা সুমিত্র। তাকে ক্রমশ উপরে উঠতে হবে। তাকে ছোট ট্যান্ডল থেকে বড় ট্যান্ডল হতে হবে। বড় মিস্ত্রির চোখে যেন কোনো অন্যমনস্কতা ধরা না পড়ে এবং সে যেন জীবনের ঋণ অনাদায়ে পরিশ্রমী তেলয়ালা সুমিত্র। সুতরাং সে ভীষণভাবে রড ধরে মেশিনের ভিতর ঝুঁকে কাজ করতে থাকল। থামের মতো সব মোটা পিস্টন রডগুলো উঠছে নামছে, ক্রাঙ্কওয়েভগুলো ঘুরছে অনবরত এবং এইসব ভয়ংকর শব্দে উপরের কণ্ঠসকল ঢেকে যাচ্ছে। তবু সে এ—সময়ে কোনো রমণীর কণ্ঠ শুনতে পেল এবং চোখ না তুলেই বুঝল বড় মিস্ত্রি আর কাপ্তান চেরিকে নিয়ে এনজিন—রুমে নেমে আসছে। সিলিন্ডারের পাশে দাঁড়িয়ে রেসিপ্রকেটিং এনজিনের কার্যকারিতা সম্বন্ধে বড় মিস্ত্রি তাকে বিস্তারিত বলছেন।
