এবার সব ডেক—জাহাজিরা দু’ভাগ হয়ে আগিলা—পিছিলা চলে গেল। উইঞ্চ হাড়িয়া—হাপিজ করল হাসিল। ড্যারিক নামানো হল। যুবতীর বাপকে দেখা গেল কাপ্তানের ঘরে। কিছু কিছু জেটির লোক ডেকে উঠে এসেছিল। ওরা সিঁড়ি তোলার আগে নেমে গেল। যুবতীর বাবা নেমে গেলেন। তারপর জাহাজ ধীরে ধীরে তীর থেকে সরতে থাকল। রুমাল উড়ল অনেক জেটিতে, যুবতী কেবিনে ফিরে যাওয়ার আগে সন্ধ্যার গাঢ় রঙের গভীরতায় ওই দ্বীপের ছবি দেখতে দেখতে কেমন তন্ময় হয়ে গেল। এই তার দেশ, এত সুন্দর এবং রমণীয়।
কেবিনে ঢুকে যুবতী টুপাতি চেরি দেখল কাপ্তান—বয় সবকিছু সযত্নে সাজিয়ে রেখেছে। চেরি আয়নায় মুখ দেখল, তারপর লকার খুলে রাতের পোশাক পরে বোট ডেকে উঠে যাবার জন্য দরজা অতিক্রম করতেই মনে হল জাহাজটা দুলছে এবং মাথাটা কেমন গুলিয়ে উঠছে। চেরি আর উপরে উঠল না। সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল। নরম সাদা বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে পোর্টহোলের কাচ খুলে দিল। চেরি এখন সমুদ্র এবং আকাশ দেখছে।
দরজায় খুব ধীরে ধীরে কড়া—নাড়ার শব্দে চেরি প্রশ্ন করল, কে?
আমি কাপ্তান—বয়।
এসো।
আপনার খাবার, বলে সযত্নে টেবিল সাজাল।
চেরি বলল, এক পেয়ালা দুধ, দুটো আপেল।
আর কিছু?
না।
আপনার কষ্ট হচ্ছে মাদাম?
না।
উপরে উঠবেন না? বেশ জ্যোৎস্না রাত। বোট—ডেকে আপনার জন্য আসন ঠিক করা আছে।
না, উপরে উঠব না।
বয় চলে যাচ্ছিল, চেরি ডেকে বলল, শোন!
কাপ্তান—বয় কাছে এল। বলল, তুমি কাপ্তানকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবে।
জী, আচ্ছা। কাপ্তান—বয় দরজা টেনে চলে গেল।
তখন ফোকসালে জাহাজিরা চেরিকে কেন্দ্র করে মশগুল হচ্ছিল। সকলে ওর চোখমুখ দর্শনে সজীব। এবং চেরি যেন এই নিষ্ঠুর জাহাজে সকল জাহাজিদের নিঃসঙ্গ মনে সমুদ্রযাত্রাকে সুখী ঘরণির ঘরকন্নার মতো করে রাখছে। আর এমন সময় ডেক—সারেং এলেন, এনজিন—সারেং এলেন। তাঁরা দরজায় দরজায় উঁকি দিয়ে বললেন, তোমরা উপরে যাও, বোট—ডেকে মাস্তার দাও।
জাহাজিরা সিঁড়ি ধরে উপরে উঠল সকলে। ওরা বোট—ডেকে পশ্চিমমুখো হয়ে দাঁড়াল। ডেক—সারেং ওদের পাশ দিয়ে গেলেন এবং বললেন, তোমরা, বাপুরা, ওঁর সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করতে যাবে না। কাপ্তানের বারণ আছে। জেনানা মানুষ, কাঁচা বয়েস, তার উপর আবার শুনছি রাজার মেয়ে এবং তিনি নাকি আমাদের কোম্পানির একজন কর্তাব্যক্তি।
সুমিত্র হাসল। —কী যেন বলেন চাচা! উনি তো কাকাতিয়া দ্বীপের প্রেসিডেন্টের মেয়ে।
সারেং বললেন, ওই হল। যে রাজা, সেই—ই প্রেসিডেন্ট।
এখন রাতের প্রথম প্রহর। অল্প জ্যোৎস্না সমুদ্রে এবং জাহাজ—ডেকে। জাহাজিরা গরম বলে সকলে ফোকসালে গিয়ে বসল না। ওরা ফল্কার উপর বসে ভিন্ন রকমের সব কথাবার্তা বলল। দু—একজন জাহাজি অভদ্র রকমের ইঙ্গিত করতেও ছাড়ছে না। এ ধরনের কথাবার্তা শুনে অভ্যস্ত বলে সুমিত্র রাগ করল না। বরং হাসল। দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রা সুমিত্রকে বিরক্ত করছে।
সুমিত্র ভাবল, সেই মেয়ে, হ্রদের তীরে বসে বেহালা বাজাত, পাথরের আড়ালে বসে হ্রদে প্রতিবিম্ব দেখে যার রহস্য আবিষ্কারে সে মত্ত থাকত, যার প্রতিবিম্ব সমুদ্রের কোনো রাজপুত্রের ইচ্ছাকে সকরুণ করে রাখত, অথবা সেই প্রাসাদের ছায়া, ঘন বন, সমুদ্রের পাঁচিল এবং উঁচু পাথরের সব দৃশ্য সুমিত্রকে ঠাকুমার গল্প মনে পড়িয়ে দিত….যেন রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে….যাচ্ছে….শুধু পাতালপুরীতে ভোজ্যদ্রব্য, যেন প্রাসাদের পর প্রাসাদ, কোনো জন—মনিষ্যির গন্ধ নেই, ফুলেরা, গাছেরা, পাখিরা এবং পতঙ্গসকল পাথর হয়ে আছে। হ্রদের তীরে খুব নিচু উপত্যকা থেকে সুমিত্র যতদিন চেরিকে দেখেছে, ততদিন পাতালপুরীর দৃশ্যসকল কাকাতিয়া দ্বীপের সকল দৃশ্যমান বস্তুসকলের উপর এক ক্লান্ত ইচ্ছার ঘর তৈরি করে চলে গেছে।
এখন জাহাজিরা সকলে বাংকে শুয়ে পড়েছে। সুমিত্রও দরজা বন্ধ করে কম্বল টেনে শুয়ে পড়ল। সুমিত্র এই বাংকে শুয়ে পর্যন্ত চেরির কথা ভাবছে—চেরি হয়তো শুয়ে পড়েছে। সিঁড়ি ধরে গ্যাংওয়েতে যখন উঠে আসছিল চেরি, সুমিত্র তাকে স্পষ্টভাবে দেখেছিল। বড় বড় চোখ মেয়েটির—বাদামি রঙ শরীরে, চোখের রঙ ঘন গভীর এবং সমস্ত শরীরে প্রজাপতির মতন হালকা গড়ন যেন ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছার ঘর সবটুকু যত্ন দিয়ে তৈরি করেছেন।
জাহাজ এখন সমুদ্রে। তীর দেখা যাচ্ছে না, কেবল দ্বীপ অথবা প্রবালবলয়। ভোরের সূর্য উঠেছে সমুদ্রে। সমুদ্রটাকে দু—ফাঁক করে সহসা যেন সূর্যটা আকাশে উঠে গেল। ডেক—জাহাজিরা এ সময় জাহাজে জল মারছে। এবং অন্য অনেক জাহাজি ইতস্তত রঙের টব নিয়ে মাস্টে, ড্যারিকে রঙ দেবার জন্য ফল্কায় ফল্কায় হাঁটছে। সুমিত্র ভোরে উঠে ওয়াচে যাবার আগে গ্যাংওয়েতে চোখ তুলে দিল। চেরি সেখানে নেই। বোট—ডেক খালি। ব্রিজে ছোট মালোম দূরবিন চোখে লাগিয়ে দূরের আকাশ দেখছে।
সুমিত্র এনজিন—রুমে নেমে যাবার আগে দুখানা ভাঙা চাঁদের মতো রুটি খেল, জল খেল। চা খেল। অন্যান্য জাহাজির মতো প্রশ্ন করে জানতে চাইল, গত রাতে চেরি কেবিনে শুয়ে সারারাত ঘুমিয়েছিল, না, গরমে কেবিনের দরজা খুলে রাতে ডেকে বসে সমুদ্র এবং আকাশের নিরাময় ভাবটুকু লক্ষ্য করে শরীর নিরাময় করেছিল!
