বস্তুত বিজন এক অহেতুক ঈর্ষায় পীড়িত হচ্ছে। মিঃ ট্রয়কে কেন্দ্র করে এই ঈর্ষার জন্ম। বিজন প্রতি মুহূর্তে নিঃসঙ্গ জাহাজি যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল। এলবির অনুপস্থিতি যন্ত্রণার গ্রাসকে কঠোর করে তুলল। নিদারুণ জাহাজি যন্ত্রণায় সে দেবনাথের সঙ্গে গোপনে সস্তায় একটু মদ এবং সস্তায় একটু যৌন সংযোগ—রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর হল। কিন্তু মুখের ভাবটুকু সকল সময়ের জন্য সরল নিঃস্বার্থ এবং যৌন জীবনে নিষ্পাপ, যেন এই মহৎ পৃথিবীতে অশ্লীল হবার মতো কিছুই নেই। বিজন দেবনাথের সঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে বলল, আর কত দূর তোমার রাতের আস্তানা?
অথচ বিজন রাতের আস্তানায় দর করতে গিয়ে দেখল যুবতী সব সময়ের জন্য চোখ দুটো কোটরাগত করে রেখেছে। প্রতিদিনের যৌন অত্যাচারে গালে অশ্লীল টোল। নগ্ন চেহারাতে জাদুকরের লাঠির মতো ভেল্কি। এবং সমস্ত শরীরে কীসের যেন দাগ! যেন অত্যাচারের অশ্লীল উল্কি পরে নিত্য জাহাজি যন্ত্রণার সাক্ষী থেকেছে। পাশাপাশি দুটো চোখ—এলবির চোখ, এলবির প্রীতিপূর্ণ চোখ……সে পারল না। সে নগ্ন হয়ে নাচতে পারল না রাতের আস্তানায়। মদের গোলাপি নেশা ছুটে গেলে সে যথাসম্ভব সত্বর ছুটে পালাল।
সে জাহাজে ফিরে দেখল ডেক খালি। কোনো জাহাজির সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ডেকের উপর ইতস্তত কিছু আলো জ্বলছে। একটা বেড়াল এ শীতে অফিসার—গ্যালিতে খাবার খুঁজছে। বিড়ালটা শীতে কষ্ট পাচ্ছে এবং ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছে। সে আরও এগিয়ে গেল। সে শুনল ডেক—ভাণ্ডারী মদ খেয়ে নিচে হল্লা করছে। নিচে নেমে দেখল সকল জাহাজিদের দরজা বন্ধ। যে দু—একজন জাহাজি এখনও ফেরেনি তারা আর এ—রাতে ফিরবে না। সে ধীরে ধীরে নিজের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেবনাথ আগে ফিরে এসেছে। ফোকসালের ভিতরে লকারের শব্দ। বুঝি দেবনাথ লকার খুলছে। বুঝি দেবনাথ বাংকে বসে খাচ্ছে। বিজন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বলল, আমি পারিনি, দেবনাথ—আমি পারিনি। মেয়েটির শরীর দেখে আমার করুণা হল।
এই করুণার কথা ভেবে যখন সে ক্ষতবিক্ষত তখন দেবনাথ খেতে খেতে বলছে—এলবি এসে এই বাংকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে গেছে তোমার জন্য।
তুমি কী বললে?
বললুম রাতের আস্তানায় গেছে।
দেবনাথ! সে চিৎকার করে উঠল। ইচ্ছা হল দেবনাথের গলা টিপে ধরতে। বিজন লক্ষ্য করল, দেবনাথ দুজনের ভাত একাই গিলছে। ওর নেশা এখনও প্রকট। সেজন্য দেবনাথের হাত কাঁপছে। এবং গোল গোল চোখে সে বিজনকে দেখছে।
বললাম তুমি এলবিকে ঠকিয়েছ। তুমি রবীন্দ্রনাথের নামে ‘পাখী সব করে রব’ শুনিয়েছ। বললাম তুমি পূর্ববঙ্গের ছেলে, বললাম দেশ বিভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে এসেছ। কোনো এক কলোনিতে পিসিমার বাড়িতে থাক। তোমার বাড়ি বটতলায় নয়। সুতরাং বটতলা থেকে নিমতলা কাছেও নয়। আর কিছু বলল না দেবনাথ। ফের ভাত খাচ্ছে। অথবা বললে যেন এরকম শোনাত—বিজন, আমি ঈর্ষার তাড়নায় ভুগছি। তুমি এমন প্রীতিপূর্ণ চোখের স্নেহচ্ছায়ায় বন্দরের দিনগুলো কাটাবে, তুমি বস্তুত রবীন্দ্রনাথের মতো বাঁচতে চাইবে, সে আমার সহ্য নয়। সে বলল, কবির প্রতীকী হয়ে তুমি এলবির কাছে বেঁচে আছ, আর আমি কোটরাগত চোখে জাহাজি হয়ে বেঁচে আছি, আমি ঈর্ষার তাড়নায় ভুগছি—আমি পারিনি, আমি পারিনি। ঈর্ষার তাড়নায় আমি একটু বেফাঁস হয়েছি।
বিজন বাংকে শুয়ে পড়ল। কোট—প্যান্ট পরেই শুয়ে আজ যথার্থ জাহাজি কায়দায় রাত যাপন করল।
সকালে জাহাজের কাজ বলতে তার, দেয়াল রঙ করা, দেয়াল সাবান—জলে পরিষ্কার করা—সে সব কাজগুলো আজ নিখুঁতভাবে করল। সে ইচ্ছা করেই এলবিকে ভাবল না। সে ইচ্ছা করেই কাঁচা খিস্তি করল আজ। ভোরবেলায় দেবনাথ ওর পাশে দাঁড়ালে, বলল, আমাকে ছোট করে কী লাভ হল, দেবনাথ?
দেবনাথ ওর দুটো হাত ধরে বলল, বিজন, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার বড় ভুল হয়েছে। গত রাতে টাকার অভাবে মেয়েটাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারিনি। মাথা গরম। বাধ্য হয়ে সস্তায় গলা পর্যন্ত মদ গিলে জাহাজে ফিরেছিলাম।
মাতাল হয়ে জাহাজে ফিরেছি। তোমার বাংকে এলবিকে দেখেই ধৈর্য ধরতে পারিনি। আমি ওকে টেনে তুলেছিলুম। এলবি বিরক্ত হয়ে তাকাতেই তোমাকে দুশমন বলে ভেবেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর, বিজন। বলে দেবনাথ যথার্থই ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে ওর পাশে দাঁড়াল।
বিকেলে বিজন হাসপাতালে গেল। সেলিমের অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে। সেলিম ভালো হয়ে উঠছে। সেলিম ফের জাহাজের জাহাজি হয়ে একই সঙ্গে হয়তো ঘরে ফিরতে পারবে। এইসব ভাবনায় দেবনাথ এবং বিজন পথ চলছিল। দেবনাথ বলল, এলবির কাছে তোর একবার যাওয়া উচিত।
কোন মুখে যাব, বল।
আমার বড় ভুল হয়ে গেল, বিজন।
ওরা পরস্পর তাকাল। ওরা পরস্পর হাত ধরে হাসপাতালে উঠে গেল।
সিঁড়ি ধরে উঠবার সময় ভাবল, এলবি যদি আসে, এই হাসপাতালে এলবি যদি ওর জন্য অপেক্ষা করে, যদি বলে—বিজন, তুমি কি যথার্থই রবীন্দ্রনাথের নামে ‘পাখী সব করে রব’ শুনিয়েছ, তুমি কি যথার্থই কবিকে নিয়ে তামাসা করেছ তখন, তখন সে কী উত্তর দেবে! এইসব ভেবে বিজন, হাসপাতালে ভয়ে ভয়ে, সিঁড়ি ধরে উঠতে থাকল। এবং যখন দেখল সেলিমের বিছানার পাশে কেউ বসে নেই তখন সে এক অহেতুক আনন্দে কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা পেল।
