এরপর এলবি বিজন এবং দেবনাথকে নিয়ে হাসপাতালে গেল। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ওরা তিনজন যখন গাড়িতে উঠতে যাবে তখন দেবনাথ বলল, এবার আমি যাই। জাহাজে আমার একটু দরকার আছে।
গাড়ির ভিতর এলবিকে আজ একটু উচ্ছল বলে মনে হল। এলবি বলল, দেখবে সেলিম ভালো হয়ে উঠবে। ওকে আজকে খুব ভালো দেখাচ্ছিল। সে নিজে এখন হাঁটাচলা করছে। এখন অপারেশন হলে বাঁচি।
বিজন বলল, আমিও আশা করছি আমরা একসঙ্গে দেশে ফিরতে পারব। একসঙ্গে ফিরতে পারলে খুবই আনন্দের ব্যাপার ঘটবে।
এলবি কথা বলল না। এলবি সন্তর্পণে ওর মুখ দেখল। বিজনের মুখে যেন এখন আর কোনো যন্ত্রণার ছবি নেই। যেন সে এমত ঘটনায় যথার্থই আনন্দিত হবে। এলবি স্টিয়ারিং—এ বসে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।
ওরা আবার জাফরি—কাটা আলো এবং পাতার ছায়ায় এসে বসল। বিকেল থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে না। ওরা আজ পাশাপাশি বসল না। ওরা মুখোমুখি বসল। এলবি আজ ইচ্ছা করেই পর পর চার—পাঁচটি কবিতা শোনাল বিজনকে। আর বিজনকে বাংলা কবিতা আবৃত্তি করার জন্য কোনো অনুরোধ করল না, এমনকী বিজন কতটা আগ্রহ নিয়ে শুনছে তাও লক্ষ্য করল না। এবং এই কবিতা আবৃত্তির সময়েই এলবির একটু মদ খেতে ইচ্ছে হল। বলল, তুমি একটু মদ খাবে, বিজন?
সে রাতে উভয়ে মদ খেয়েছিল। অথচ পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়নি। পরস্পর গোলাপি নেশায় উন্মত্ত হয়নি। তবু কেন জানি বিজন ঘাস থেকে উঠতে পারছিল না। সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওর দস্তানা খুলে যাচ্ছে। পেটের ভিতর এক দুরন্ত যন্ত্রণায় সে অস্থির হয়ে উঠেছে। সে বলল, এলবি, আমি আর পারছি না।
এলবি সমস্ত শক্তি দিয়ে বিজনকে তুলে ধরল এবং ধীরে ধীরে মোটরের ভিতর এনে শুইয়ে দিল। তারপর বাড়ি ফিরে বিজনকে নিজের খাটে শুইয়ে দিল এবং ফোন তুলে ডায়াল করল। বলল, ক্যারল আছেন? ডঃ ক্যারল। প্লিজ ফাইভ বাই এইট নটিংহিল। পেশেন্ট সিরিয়াস।
ডাক্তার বিজনকে দেখেছিলেন এবং বলেছিলেন, কনস্টিপেশনের জন্য এমন হয়েছে। ভয়ের কিছু নেই। দু’দিনেই ভালো হয়ে উঠবে। দু’রকমের পিল থাকল। এখন একটা খাইয়ে দিলেই ব্যথাটা কমে আসবে। পেটে একটু গরম জলের সেঁক দিতে পারেন।
ডাক্তারবাবু চলে গেছেন। এলবি বিজনকে বলে দু’মিনিটের জন্য বাইরে গেছে। বিজন যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দেয়ালের সব ছবি দেখল। বড় বড় সব ক্যানভাসে নানা রঙের ছবি। কবির ছবি দেয়ালে। হলুদ রঙের দেয়াল। এলবির হাতে আঁকা কবির এই ছবি যেন বিজনকে বিদ্রুপ করছে। যেন বলছে বাহবা, যা হোক তোমরা আমাকে নিয়ে তামাসা করলে। বিজন এই যন্ত্রণার ভিতরও প্রথম দিনের কথা ভেবে অনুতপ্ত। বস্তুত সে সঙ্গসুখে অধীর হয়ে ওর প্রথম দিনের ইচ্ছাকৃত তামাসার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিল।
এলবি ঘরে ফিরেই বিজনের কপালে হাত রেখে উত্তাপ দেখল। তারপর জল এনে পিল খাইয়ে দিয়ে হট—ওয়াটার ব্যাগে পেটে সেঁক দিতে থাকল। অধীর আগ্রহে সারারাত জেগে ওর পাশে বসে থাকল। ভোর রাতের দিকে যন্ত্রণা থেকে বিজন যেন মুক্তি পেল। বিজন পাশ ফিরে এলবির সেই আন্তরিক এবং প্রীতিপূর্ণ চোখের দিকে চেয়ে বলল, এলবি, তোমাকে খুব কষ্ট দিলাম।
এলবি ওর কপালে হাত রাখল শুধু। কোনো কথা বলল না। বিজন ওর চোখ দেখেই বুঝল, বুঝতে পারছে এ মুহূর্তে ওকে নিরাময় করে তোলার কী আকুল ইচ্ছা এলবির চোখে।
ভোরের দিকে বিজন ঘুমিয়ে পড়েছে। সুতরাং ঘুম ভাঙতে ওর দেরি হল। জানালার রোদ ওর বিছানায় এসে নেমেছে। এলবি বাইরের ঘরে আছে। কাকে যেন ফোন করল এইমাত্র। বিজন বিছানায় শুয়ে সব ধরতে পারছে—এলবি জাহাজে ফোন করে কাপ্তানের সঙ্গে কথা বলছে, ওর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর দিচ্ছে এবং সঙ্গে চার—পাঁচদিনের ছুটি মঞ্জুর করার জন্য ফোনে আবেদন পেশ করছে। এলবি এ—ঘরে এসে দাঁড়ালে বিজন ভাবল, কী দরকার আর থেকে। শরীর আমার ভালো হয়ে গেছে। বেশ সুস্থ বোধ করছি। বরং আজ জাহাজে চলি। কিন্তু এলবির মুখের দিকে চেয়ে বলতে পারল না কথাগুলো। চোখে ওর সারারাত অনিদ্রার অবসাদ। শরীরে ক্লান্তি। এলবি ওর কপালে হাত রেখে বলল, খুব ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলে যাহোক।
তাই নাকি!
তা নয়তো কী! একটু মদ খেলে তো, অমনি ঘাসে লুটিয়ে পড়লে।
তুমি তো জানো এলবি, ওটা মদের জন্য হয়নি। ওটা জাহাজে কাজ করার পর থেকেই হচ্ছে। মাঝে মাঝেই হত, কিন্তু এমন কঠিন হত না।
একটু থেমে বিজন বলল, বরং এখন জাহাজে চলি।
তুমি কি পাগল, বিজন। ক্যারল তোমাকে পুরা পাঁচদিন বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কাপ্তানকে এইমাত্র খবর দিলাম। তিনি খুব ভালো মানুষের মতো বললেন, সেজন্য কী আছে। নিশ্চয়ই ও চার—পাঁচদিন ছুটি পাবে।
তুমি তো ছুটি নিলে। কিন্তু এখানে থাকার অর্থই হচ্ছে তোমাকে অসুবিধায় ফেলা।
আমার কোনো অসুবিধা হবে না। পাশের ঘরে আমি থাকব। যখন যা দরকার আমাকে বলবে।
বিজন পুরো পাঁচ রাতই ওই ঘরে থাকল।
পাঁচ রাত ওরা পাশাপাশি ভিন্ন ঘরে শুয়ে জানালায় রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখতে দেখতে অথবা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ত। অথবা ঘুমিয়ে পড়ার ভান করত। এলবি বালিশের নিচে দুটো হাত সন্তর্পণে ঢুকিয়ে কী যেন বারবার খুঁজত। কী যেন বালিশের নিচে ওর হারিয়ে গেছে। কখনও এলবি রাতের প্রজাপতিদের বিছানার চারপাশে দেখত। ওর প্রতীক্ষার জগতে সেইসব প্রজাপতিরা উড়ে উড়ে একদা অবসন্ন হত এবং সকালের দিকে ওরা ঘুমিয়ে পড়ত। কোনো কোনো রাতে এলবি এই শীতেও জানালা খুলে রাতের প্রজাপতিদের শরীর থেকে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। এই ঘন রাতে এবং শীতের রাতেও ওর শরীর মধুর এক উত্তেজনায় অধীর হয়েছে। বাঙালি এক নাবিকের শরীরে কবির যুবা শরীরী বৃত্তিকে স্পর্শ করার ইচ্ছায় এলবি সহসা কাতর হত। আর বিজন নিজেকে রবীন্দ্রনাথের অনুগামী ভেবে মেকি সাধুর অভিনয় করে গেল। পর্দার আড়ালটুকু ওদের দুজনকে সেজন্য পরস্পর মহৎ করে রাখল। জাহাজে ফিরে এসে বিজন প্রথম রাতে অনিদ্রায়, দ্বিতীয় রাতে অসহিষ্ণুতায় ভুগে সারাদিন কাজ করার অজুহাতে ডেক—এ পড়ে থাকল। দু’দিন এলবি ইউনিয়নের কাজে শহর ছেড়ে অন্যত্র থাকছে মিঃ ট্রয়ের সঙ্গে। দুদিন দেখাসাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। বিকেল কাটছে হাসপাতালে। পরবর্তী সময়টুকু আর কিছুতেই কাটতে চাইছে না। খুব নিঃসঙ্গ ভাব জাহাজে। কেউ থাকছে না। বন্দরে নেমে সকলে গলির আঁধারে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এইসব দেখে সে আর পারছে না; সংযম না আত্মরক্ষায় সে তাও বুঝতে পারছে না।
