সেলিমের শরীরে এখনও রক্ত দেওয়া হচ্ছে। সেলিম এত দুর্বল যে, কথা বলতে পারছে না। ওরা ওর পাশে বসল এবং বেঁচে থাকার জন্য উৎসাহিত করল।
বন্দরে বিজন এলবিকে এড়িয়ে বাঁচতে চাইল। সামনে পড়লেই ধরা পড়বে অথবা কলিন স্ট্রিট ধরে হাঁটলেই সাক্ষাতের সম্ভাবনা। সে সেজন্য জাহাজ থেকে কম নামল, বন্দর ধরে শহরে উঠল না এবং বড় বড় পথ ধরে পায়চারি করল না। সে শুধু বিকেলে হাসপাতালে গেল। এবং একদিন সেলিম বলল, সেলিম তখন ভালো হয়ে উঠছে, সেলিম তখন কথা বলতে পারছে—বলল, এলবি রোজ ভোরে আসেন।
জাহাজে সারাদিন কাজের পর যখন ক্লান্ত হয়ে বিজন রেলিংয়ে এসে ভর করে দাঁড়াত তখন ওর মনে পড়ত নটিংহিলের সেই ছোট্ট কাঠের ঘর, সেই ছোট অক্ষরে লেখা ‘শান্তির নীড়’, সেই ইজিচেয়ারটা এবং পাশের ভাঙা ঈজেলটার কথা। মনে পড়ত ওর কবিতা—আবৃত্তির কথা। এলবি ‘গীতাঞ্জলি’র সব কবিতা যেন ওকে বারবার শুনিয়েছে। সে যেন এখন এই রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে সব কবিতাই স্পষ্ট মনে করতে পারছে। ওর একান্ত ইচ্ছা—এলবি যদি আসত, যদি সে ওর সামনে দাঁড়িয়ে সব অভিযোগ করত, যদি বলত, তুমি কবিতার মতো না বেঁচে জাহাজির মতো বাঁচলে! অথচ সে এল না। একদিন গেল, দু’দিন গেল, দু’সপ্তাহ গেল, অথচ সে এল না। পাইন গাছগুলো তখন পাতা মেলতে শুরু করেছে। পাখিরা সব আবার ফিরে এসেছে, গাছে গাছে তারা কোলাহল করছে। বসন্তের আগমনে এই ধরণি যেন উচ্ছল যুবার মতো অথবা গর্ভবতী তরুণীর মতো বয়সি হতে চাইছে। অথচ এলবির আর দেখা নেই।
বন্দরে যতদিন যেতে থাকল তত বিজন এলবির কাছে নিজেকে অপরাধী সাব্যস্ত করল। তত সে ভেঙে পড়ল। তত সে নিঃসঙ্গবোধে পীড়িত হতে থাকল। জাহাজ ছেড়ে দেবে ক’দিন পর। সেলিম ভালো হয়ে উঠছে। যে সেতুবন্ধটি গড়ে উঠেছিল সেলিমকে কেন্দ্র করে, সেলিম জাহাজে ফিরে এলে সেটুকুও শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু কোনো এক ভোরে জাহাজে খবর এল, কাপ্তান হাসপাতালের সঙ্গে সংযোগ—রক্ষা করছেন—ডেক—এ ফের উদ্বেগ উত্তেজনা, সারেং ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যান্য জাহাজিরাও ব্রিজের নিচে অপেক্ষা করছে—জাহাজের সবাই বোটডেকে মাস্তারে দাঁড়িয়ে আছে—তখন কাপ্তান বলছেন ব্রিজ থেকে, সেলিম ইজ ডেড—সেলিম মৃত।
বিকালে সব জাহাজিরা জাহাজ থেকে নেমে গেল। ওরা হাসপাতালের দরজায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মৃত নাবিকের শরীর নিয়ে যাত্রার ইচ্ছায় উন্মুখ হয়ে থাকল। ওদের অবয়বের ইচ্ছা যেন এই আমরা এই সন্ধ্যায় সকলে কবরভূমিতে নেমে যাচ্ছি। আমরা নেমে যাচ্ছি, আমরা নেমে যাব। আমরা মরে যাচ্ছি, আমরা মরে যাব।
শহরবাসীরা নাবিকের শবযাত্রার পথে ভিড় করল। একদল বিদেশি লোক জাহাজি পোশাকে কোনো নাবিকের মৃতদেহ নিয়ে সৈনিকের মতো পা ফেলে হাঁটছে। জানালায় যুবতী আর্শির আলোতে সেই শবযাত্রীদের দেখে মুখ ঘোরাল। কিছু স্বজাতীয় দেখল সেই শবানুগমন—এলবি কফিনের বাঁপাশে পথ দেখিয়ে চলছে। মিঃ ট্রয় এবং কিছু জাহাজি শ্রমিক কফিনের আগে আগে চলছে। ভারতীয় নাবিকেরা পিছনে। বিজন সকলের পিছনে। ওরা নিঃশব্দে পথ অতিক্রম করছে। ওরা সকলে শহর অতিক্রম করে ক্রমে পাহাড়ের উৎরাইয়ে নেমে গেল। ওরা সকলে আজ কোনো কথা বলল না। কত নিঃসঙ্গ, কত নিঃশব্দ এই যাত্রা! ওরা পরস্পর অপরিচিতের মতো ব্যবহার করল, যেন অথবা, এই শোকাবহ ঘটনায় ওরা পরস্পর সাময়িক বেদনায় আত্মনিষ্ঠ। এলবি পর্যন্ত কোনো কথা বলে বিজনকে কিংবা অন্যান্য জাহাজিদের সমবেদনা জানাল না। এলবি চোখ তুলে বিজনকে দেখল না। অথবা না—দেখার ইচ্ছায় সর্বদা কফিনের আগে আগে পথ দেখিয়ে চলেছে। অথবা এলবির প্রত্যয় এমনভাবে ভেঙে গেছে যে, সে বিজনকে ফের উৎসাহ দিয়ে বলতে পারল না, সেলিম দেখবে ভালো হয়ে উঠবে।
কবরভূমির সদর দরজা দিয়ে ওরা ভিতরে ঢুকে গেল। বিজন ছোট বড় সব বেদি দেখতে পেল। গির্জার মতো ছোট—বড় কবরের দেয়াল দেখতে পেল। অনেক সুখ—দুঃখর এপিটাফ চোখে পড়ল। সেলিম এখন কফিনে শুয়ে আছে। সেলিমের স্ত্রী এখন হয়তো দরজায় বসে মেয়েটাকে আদর করছে। অথবা মেয়েকে খসমের খবর দিয়ে সুখ পাচ্ছে। সেলিমের কবর এখানেই হল। সে বিবির কোলে মাথা রেখে মরতে পারল না। এইসব ভেবে বিজনের অশেষ দুঃখ। তবু একবার এলবিকে বলার ইচ্ছা—কিছু, বলার ইচ্ছা—শোকাবহ ঘটনার কথা বলে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করার ইচ্ছা—ওর সেই কবিতা—আবৃত্তির ইচ্ছা—পিস ওয়াজ অন হিজ ফোরহেড।
সেলিমের কবরের উপর প্রথম এলবিই মাটি দিল। সকলের শেষে বিজন মাটি দিতে গিয়ে অসহায় মানুষের মতো কেঁদে উঠল। এই মাটিটুকু দিয়ে সে আজ কত অসহায়, কত নিঃসঙ্গ এমতভাব প্রকাশ করল। এলবি পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বিজন শেষ মাটিটুকু কবরের উপর চাপড়ে চাপড়ে দিচ্ছে এবং কাঁদছে। সে যেন এই মাটির স্পর্শ ছেড়ে উঠতে পারছে না। উপরে আলো জ্বলছে। শীতের কুয়াশা আলোর ডুমটাকে অস্পষ্ট করে রেখেছে। সকলে একে একে কবর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সকলেই যেন এই মৃত্যুতে দুঃসহ এক যাতনায় পরস্পর কথা বলতে পারছে না। পরস্পর সান্ত্বনা দিতে পারছে না। সকলেই মাথা নিচু করে পাহাড়ের ঢাল ধরে চড়াইয়ে উঠে যাচ্ছে।
এলবি ডাকল, বিজন, ওঠ। সেলিমকে বহু চেষ্টায়ও বাঁচানো গেল না। মৃত্যুরই জয় হল। প্রভুকে ওর কথা বল। ওর আত্মার শান্তি কামনা কর।
